২৮ মার্চ, ২০১৮ ০১:১৭ এএম

ডাক্তারের হাতে নবজাতক দ্বিখন্ডিত? জেনে নিন মূল ঘটনা

ডাক্তারের হাতে নবজাতক দ্বিখন্ডিত? জেনে নিন মূল ঘটনা

৩৩ সপ্তাহের গর্ভবতী জুলেখার জরায়ুর পানি (Amniotic fluid) ভেঙে যাওয়ার পর বাচ্চার নড়াচড়া টের না পাওয়ায় পরিবারের লোকেরা তাকে দেবীদ্বারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকবৃন্দ তার যথাযথ চিকিৎসায় অপারগতা প্রকাশ করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে দেন।ভর্তি হন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এটি ছিল জুলেখার চতুর্থবার গর্ভধারণ। এর আগে তিনি দুটি মৃত সন্তান ও একটি জীবিত সন্তান জন্মদান করেছিলেন। 

গত ১৭ মার্চ  রাতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জুলেখা গর্ভকালীন সময়ে হাসপাতালে ভর্তির আগে একবারও কোন হাসপাতালে/ডাক্তারের কাছে চেকআপের জন্য যাননি। ১৭ তারিখে দুপুর বারোটার দিকে তাঁর সমস্যা শুরু হয়। রাত পৌনে ৯টায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসার পর রোগীকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেওয়া হলেও রাত হয়ে যাবার কারণে রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করা সম্ভব হয়নি। রোগীকে স্টেথোস্কোপ এবং ডপলার দিয়ে পরীক্ষা করেও বাচ্চার হার্টবিট পাওয়া যায়নি। তাঁর জরায়ুর উচ্চতা (SFH) ৩৩ সপ্তাহের গর্ভাবস্থায় যতটুকু থাকার কথা ছিল, তার চাইতে কম ছিল। সে সময় রোগীর Vaginal examination এ দেখা যায়, জরায়ুমুখ ৪-৫ সেন্টিমিটার খোলা এবং বাচ্চার হাত ও পা জরায়ুমুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সেসময় বাচ্চার কোন নাড়িস্পন্দনও  (Cord pulsation) পাওয়া যায়নি।

গর্ভের মৃত বাচ্চার হাত-পা জরায়ুমুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেও রোগীর অবস্থা মোটামুটি ভালো থাকায় এবং রোগীর আগের বাচ্চাগুলো নরমাল ডেলিভারিতে হওয়ায় রোগীর সাথে থাকা পরিবারের মানুষদেরকে আশ্বস্ত করা হয় যে, মৃত বাচ্চাটিও সম্ভবত নরমাল ডেলিভারি হয়ে বের হয়ে যাবে।

রোগীকে সারা রাত ফলোআপে রাখা হয় এবং সে সময়ে রোগীকে পেথিড্রিন ও ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণের জন্য এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী দিন সকাল ১০টা পর্যন্ত রোগীর অবস্থা আশংকামুক্ত ছিল। এরপর বাচ্চার হাত-পা সহ সম্পূর্ণ শরীর স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে গেলেও বাচ্চার মাথা জরায়ুতে আটকে যায়। স্বাভাবিকক্ষেত্রে মায়ের জরায়ুতে বাচ্চার মাথা নিচের দিকে এবং পা সহ বাকি অংশ উপরের দিকে থাকে।

মূলত জুলেখার বাচ্চা পুরোপুরি উল্টো অবস্থানে থাকার কারণেই এ সমস্যার উৎপত্তি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয়, Arrest of after coming head. তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বাচ্চার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন ( Decapitation) করে প্রথমে বাচ্চার শরীর এবং পরবর্তীতে বাচ্চার মাথা মায়ের জরায়ুমুখ দিয়েই (Normal vaginal delivery) বের করে আনা হবে। 

‎কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও উপরোক্ত পদ্ধতিতে বাচ্চার মাথা বের করা সম্ভব না হওয়ায় রোগীর স্বামীর অনুমতি নিয়েই পেট কেটে (laparotomy) বাচ্চার মাথা বের করে আনা হয়। কিন্তু অপারেশনের সময় দেখা যায়, রোগীর জরায়ুতে জন্মগত ত্রুটি (Sub-septate) রয়েছে এবং জরায়ুর নিচের দিকে একটি hidden rupture রয়েছে। পরবর্তীতে এখান থেকেই প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার সম্ভাব্য সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্যই রোগীর স্বামীর অনুমতি নিয়ে জরায়ু অপসারণ করা হয়।

আর এই অপারেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অপারেশনে নেতৃত্ব দেন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের স্ত্রীরোগ এবং প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপিকা ডা. করুণা রানী কর্মকার। তাঁর সাথে উক্ত বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। অপারেশনের পর রোগী ভালো আছে। অপারেশনের পর ৭ম দিনে সেলাই কাটা হয় এবং তার সেলাইয়ের জায়গাও ভালো আছে।

উক্ত অপারেশনের এক সপ্তাহ পরে হঠাৎ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই অপারেশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার হতে শুরু করে। প্রথমে বিভিন্ন ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টালে এই খবর আসে। সেই একই খবর বিভিন্ন জাতীয় অনলাইন এবং প্রিন্টেড পত্রিকা কপি পেস্ট করে দেয়া শুরু করে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ভুল সংবাদ কপি-পেস্ট হয়। বাংলাট্রিবিউন থেকে শুরু করে বিবিসি বাংলা পর্যন্ত একই নিউজ, একই ভাষায় কপি পেস্ট করে দিয়ে দেয়। এই ধরণের নীতিবহির্ভূত সংবাদের কারণে বিষয়টি দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভার্চুয়াল জগতে চিকিৎসক সম্প্রদায়কে নিয়ে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ।

এক পর্যায়ে ওই খবরের রেশ ধরে মহামান্য হাইকোর্টও চিকিৎসকদের তলব করেছেন। এ ঘটনায় হতবাক চিকিৎসক সমাজ। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এক তরুণী মায়ের জীবন বাঁচানোর বিনিময়ে এ কোন পুরস্কার চিকিৎসকদের?

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশের প্রখ্যাত ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. রাশিদা বেগম মেডিভয়েসকে বলেন, 'অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‎মৃত বাচ্চার মাথা মায়ের যোনিপথে আটকে গেলে মাকে বাঁচাতে ডাক্তাররা বাচ্চার মাথা কেটে (ডিক্যাপিটেশন), নাড়িভুঁড়ি বের করে (ইভিসারেশন), অথবা মাথা ফুটো করে মগজ ঘুটে বের করে (ক্রেনিওটোমী) বাচ্চার সাইজ ছোট করে বের করে। এইসব কার্যক্রমের সময়ে দীর্ঘসময় ধরে পরিশ্রান্ত দুর্বল জরায়ু ফেটে যেতে পারে কিংবা বাচ্চা বের করার পরে পরিশ্রান্ত জরায়ু থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে সন্তান থাকুক বা না থাকুক মাকে বাঁচানোর জন্য অনেক সময় জরায়ু কেটে ফেলাই একমাত্র উপায়।

আরও পড়ুন

►মাকে বাঁচানো কি চিকিৎসকের অপরাধ?

►বাংলাদেশের চিকিৎসা নিয়ে অপপ্রচার: একজন আইনজীবীর দৃষ্টিতে

►ভবিষ্যৎ ডা. মায়মুনার গল্প

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি