ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


২৩ মার্চ, ২০১৮ ১০:০২ এএম

নাইট্রোগ্লিসারিন, আলফ্রেড নোবেল, সাংবাদিক ও আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানী

নাইট্রোগ্লিসারিন, আলফ্রেড নোবেল, সাংবাদিক ও আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানী

এক সাথে অধিক সংখ্যক মানুষ কে দ্রুততম সময়ে হত্যার করার জন্যে আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কার সে সময়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিকট খুব জনপ্রিয় হয়ে যায়। একেকটা আবিষ্কার এর পেটেন্ট কিনতে সে সময় রীতিমত কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। এমনি এক সময় কারখানায় ডিনামাইট আবিষ্কার এর এক পরীক্ষায় আলফ্রেড নোবেলের আপন ভাই সহ আরো ক'জন তার সামনেই জীবন্ত পুড়ে মারা যান।

তিনি বসে থাকেন নি। তার বোধোদয় হয়নি। দ্রুততম সময়ে মানুষ হত্যা করার পদ্ধতি “ডিনামাইট বিস্ফোরক” আবিষ্কার এর নেশা তার বাড়তে থাকে দিনকে দিন।

যদিও বা নাইট্রো গ্লিসারিন এর মুল আবিষ্কারক এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে নোবেল কে এ নিয়ে গবেষণা করতে বারণ করেন, তথাপি তিনি তাতে কর্ণপাত করেন নি। কত নিঁখুত উপায়ে বিস্ফরণ ঘটিয়ে দ্রুততম প্রাণনাশ করা যায় সেই গবেষনা নিয়ে তিনি দিনরাত মগ্ন থাকেন।

এসময় হঠাৎ করে তার আরেক ভাই মারা যান, যিনি ছিলেন এসব নিত্যনতুন বিস্ফোরক আবিষ্কার এর সহযোগী। তার মৃত্যুর পর এক সাংবাদিক দুঃখ করে পত্রিকায় একটা লিড নিউজ করেন 

“মানুষ হত্যার এক ব্যবসায়ীর অবশেষে মৃত্যু”।

নোবেলের গোচরীভূত হয় পত্রিকার এই নিউজ টি। এটা তাকে ব্যাথিত করে। তিনি তার আবিষ্কার এর ভয়াবহতা টের পেতে থাকেন।

কিন্তু অনেক দেরী হয়ে যায় কারন ইতোমধ্যে তিনি বিস্ফোরক গুলোর পেটেন্ট বিক্রি করে দিয়েছেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবসায়ী দের কাছে। কোটি কোটি টাকা কামিয়ে হয়ে গেছেন বিজনেস টাইকুন। পৃথিবীর সেরা ধনী। আর এদিকে এই অস্ত্র দিয়ে দ্রুততম সময়ে লক্ষ লক্ষ মানব হত্যা চলছে নির্বিচারে।

সাংবাদিকের নিউজটির হেডলাইনটি তাকে পীড়া দিয়ে যাচ্ছিলো নীরবে নিভৃতে। তিনি অনুভব করতে পারলেন তার ভুল, অবলোকন করতে লাগলেন এর অমানবিক প্রয়োগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জলন্ত মৃত্যু ।

মনে মনে ভাবলেন, না এ হতে পারে না। ভবিষ্যতে তিনি মানুষের নিকট মানব হত্যাকারী একজন আবিস্কারক হিসেবে বেঁচে থাকতে চান না। তার প্রায়শ্চিত্ত করা উচিৎ। তিনি মানবহীতৈষী একজন বিজ্ঞানী হিসেবে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে চান মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু কিভাবে...?

সিদ্ধান্ত নেন, তার সকল সম্পদ চ্যারিটি অর্গানাইজেশন এ দান করবেন। মৃত্যুর আগে তাই তিনি তার সকল সম্পদ উৎসর্গ করেন আর্তমানবতার সেবায়। সুচনা হয় শান্তিতে নোবেল প্রাইজ প্রবর্তণের। বিশ্বে যারা মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করবে কেবল তারাই পাবে কাংঙ্খিত এই নোবেল শান্তি পুরস্কার।

মহান সাংবাদিক এর কল্যানে নোবেলের বিবেক জাগ্রত হয়েছিলো বটে, কিন্তু তার কর্মের ফল ভোগ করতে হচ্ছে মানব জাতির এবং সেটা পৃথিবী ধ্বংস হবার আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। হয়ত এমন ও হতে পারে তার আবিষ্কার দিয়েই ধ্বংস হবে এপৃথিবী।

অবাক ব্যাপার হলো বিজ্ঞানী নোবেলের ছিলো হৃদরোগ। আজীবন তিনি হৃদরোগের ব্যাথায় (এনজাইনা পেকটোরিস) ভুগেছেন। মাঝেমধ্যে হার্টের তীব্র ব্যাথায় তিনি কুকড়ে পড়ে থাকতেন গবেষনাগারে। হায় তিনি জানতেন না, যে নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে তিনি বিস্ফোরক আবিষ্কার এর গবেষণায় নেশায় মত্ত ছিলেন সেই নাইট্রোগ্লিসারিনেই ছিলো তার আজন্মকাল ভোগা হৃদরোগের (এনজাইনার) উপশম কারী ঔষধ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সেই নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে গবেষনা করে আবিষ্কার করেন হৃদরোগ “নজাইনা পেকটোরিস” এর তড়িৎ উপশমকারী ঔষধ নাইট্রো গ্লিসারিন স্প্রে যা এখন আমরা তীব্র হার্টের ব্যাথা হলে জিহবার নীচে স্প্রে করি।

মৃত্যুকালে আলফ্রেড নোবেল ছিলেন একা বড় একা। ডিপ্রেশন এ জর্জরিত এক নিঃসঙ্গ মানুষ। আপন বলতে তার কেউ ছিলো না। না তিনি কাউকে ভালবাসেন, না তাকে কেউ ভালোবেসে বিয়ে করে। তার সকল ভালোবাসাই ছিলো মানুষ হত্যার বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কার কে ঘিরে।

সম্ভবত “গিলটি ফিলিংস” থেকেই শেষ বয়সে তার মানসিক রোগ বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন টি জেঁকে বসে। তেষট্টি বছর বয়সে কোন এক রজনীতে তার সেই আজন্ম ভোগা হৃদরোগ এনজাইনা পেকটোরিস এর জটিলতা থেকে আচমকা ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি মারা যান।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত