ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৭, জানুয়ারী ২০১৯ - ৪, মাঘ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মনির হোসাইন মুরাদ

এক্সিকিউটিভ মেম্বার, ডিপার্টমেন্ট অব গ্যাসট্রোলজি এন্ড নিউট্রিশন, সেন্টার ফর হেলথ এডুকেশন এন্ড রিসার্চ 


সরকারি হাসপাতালে সব অপারেশনই বিনামূল্যে, অথচ...

হাসপাতালের মসজিদে মাগরিবের নামায পরে বের হচ্ছিলাম। বাইরের গেটে একজন বয়োবৃদ্ধ লোক মুসল্লিদের কাছ থেকে সাহায্য চাইছেন একটা কাগজ হাতে নিয়ে। একটু চেনা চেনা মনে হলো। কাছে গেলাম। চাচা করজোরে আমার কাছে সাহায্য চাইলেন। কাগজ দেখে আমি তো আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। চাচা! আপনি তো আমার রোগী। এখানে এভাবে টাকা সাহায্য চাচ্ছেন কেন? 
জ্বী! চাচা আমি আপনার ডাক্তার! 

চাচা বললেন, ‘স্যার আমাকে একজন বলেছে, আমার রোগীর অপারেশনের জন্য নাকি সাত-আট হাজার টাকা দরকার। এত টাকাতো আমার কাছে নাই স্যার। তাই মসজিদে সবার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি।’

আমি ভীষণ লজ্জায় পরে গেলাম। ইতোমধ্যে আমাদের এই কথাবার্তা শুনে অনেক লোকের সমাগম হয়ে গেছে। একদম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেছি।

চাচার নাম সেকেন্দার আলী। মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ থেকে আজ আমাদের হাসপাতালে এসেছেন ওনার স্ত্রীকে নিয়ে।

আমরা রোগীর হিস্ট্রী এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করে ডায়াগনোসিস কনফার্ম করি 'Genital Prolapse'। ৬২ বছরের এমন পোস্টমেনুপজাল নারীদের সাধারণত চিকিৎসা একটাই Hysterectomy বা জরায়ু পুরোটা কেটে ফেলা। তাই সেভাবেই আমরা তাকে কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্টে রাখি। তার সাথে প্রিএনেস্থেটিক চেকাপের জন্য রুটিন ইনভেস্টিগেশন দিই। সাথে পরামর্শ দিই পরীক্ষাগুলা যেনো আমাদের হাসপাতালেই করান। তাহলে খরচ খুব সামান্যতেই হয়ে যাবে।
সম্ভবত চাচা কোন দালালের খপ্পরে পরে কোন বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে এমন টাকার হিসেব পেয়েছেন।

চাচাকে আশান্বিত করে বললাম চাচা শুনেন-
- এটা আমাদের সরকারি হাসপাতাল। যত বড়ই অপারেশন হোক না কেন আমরা বিনামূল্যে অপারেশন করি। আমরা সার্জনরা এক পয়সাও নিই না।

- হাসপাতালে রোগীর জন্য প্রায় সবধরনের ওষুধ সাপ্লাই দেয়া হয়। সামান্য কিছুই কিনতে হয়। দরকারি সব পরীক্ষা হাসপাতালেই হয়ে থাকে এবং সেটা একেবারেই নামেমাত্র খরচে করা যায়। গরিব রোগীদের ক্ষেত্রে সমপূর্ণ বিনামূল্যে ইনভেস্টিগেশন করানো যায়। এছাড়া আছে ‘রোগী কল্যাণ সমিতি’ নামে সমাজকল্যাণ ভিত্তিক ব্যবস্থা। এতে আমাদের ডাক্তারদের রিকুমেন্ডশন নিয়ে রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা বাবদ টাকাকড়িও পেতে পারেন।

চাচা এতোক্ষণে একটু সাহস পেলেন।

অপারেশনে খরচ বলতে বিশেষ করে শুধু সেলাইয়ের জন্য সুতা কিনতে হয়। আর সাথে কিছু অপারেটিভ সামগ্রী। এগুলার দাম সামান্য। বললাম, চাচা আপনার কাছে কত টাকা আছে বলেনতো!

‘স্যার, অনেক কষ্টে ১৫০০ টাকা যোগাড় করেছি।’

দ্যাটস এনাফ! চাচা যথেষ্ট। আর লাগবে না। আমি ডা. মুরাদ বলছি। আমাকে চিনে রাখেন। আমি গাইনি বিভাগে তিনতলার ৩০৩ নং এ থাকবো। আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। 

‘আপনার স্ত্রীর প্রয়োজনীয় ইনভেস্টিগেশন হাসপাতাল থেকে ফ্রি করার জন্য ম্যাডামের কাছে রিকুয়েস্ট করবো। অতিরিক্ত ওষুধপত্র আমাদের ইউনিটের 'Poor Fund ' থেকে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। তবুও প্লিজ চাচা এভাবে মানুষের কাছ হাত পাতবেন না। এগুলো আল্লাহ পছন্দ করেন না। আপনার সমস্যার কথা ডাক্তারের সাথে খোলাখুলি আলাপ করুন। অন্য কারও কাছে না।’

চাচার চোখ মুখে আশার আলো।

অশ্রুসিক্ত নয়নে চাচা পকেট থেকে একটা ৫ টাকার নোট বের করে বললেন স্যার তাহলে এই ৫ টাকা কী করবো? একজন তো দিলো। 

আমি বললাম টাকাটা যিনি দিয়েছেন তাকেই ফেরত দিন।

চাচা বললেন তাকে তো আর পাওয়া যাবে না।

তাহলে কাজ করেন মসজিদে দিয়ে দেন।

চাচার হাত ধরে এটা সেটা গল্প করতে করতে হাসপাতালে চলে আসলাম।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চার বছর বয়সেই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত!

চার বছর বয়সেই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত!

ইশরাত জাহান, বয়স বর্তমানে ১৫। তার মা-বাবা থেকে জানা গেল যখন তার…

সরকারী স্বাস্থ্য সেবা এখন জনগণের দোরগোড়ায়

সরকারী স্বাস্থ্য সেবা এখন জনগণের দোরগোড়ায়

আমাদের দেশের জনগনের বড় অংশ বসবাস করেন গ্রামে। সুতরাং গ্রামের মানুষের কথা…

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আমার কিছু কথা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আমার কিছু কথা

ওএসডি মেয়াদ শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগ দান করতে গেলাম সেই ফারুক সাহেবের…

বাঁচতে হলে জানতে হবে, জানতে হলে পড়তে হবে

বাঁচতে হলে জানতে হবে, জানতে হলে পড়তে হবে

"পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন" -আল কোরআনের প্রথম আদেশ। কোরআনের…

কত রঙের স্বপ্ন দেখি…

কত রঙের স্বপ্ন দেখি…

হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে শোরগোল পড়েছে। কয়েকজন মানুষ মিলে হৈচৈ করছে। পুরুষের চাইতে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর