ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪৩ মিনিট আগে
১৮ মার্চ, ২০১৮ ১২:২৯

ওষুধ কিনতে গিয়ে গরিব হচ্ছে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ!

ওষুধ কিনতে গিয়ে গরিব হচ্ছে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ!

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট সবচেয়ে কম, যা মোট জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। গবেষণা রিপোর্ট অনুসারে, বাজেট কম থাকায় ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্রতা বরণ করছে। দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়েছে ২০ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এটা দেশের মোট বাজেটের ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে যা ছিল ১৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা এবং এটাও ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ মাত্র।

প্রতিবেশী ভারতের প্রসঙ্গ বাদ দিলে শ্রীলঙ্কা ও নেপালও বাংলাদেশের চেয়ে স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়। শ্রীলঙ্কার ২ কোটি ৩ লাখ ৫৯ হাজার (২০১২ আদমশুমারি) মানুষের জন্য ২০১৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (২৮৫ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি)। এটা ছিল শ্রীলঙ্কার জিডিপির ৩ শতাংশ। আগের বছর শ্রীলঙ্কায় জিডিপির ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য বাজেট দেয়া হয়েছে। অপর দিকে নেপালে ২ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার জন্য ২০১৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য বাজেট ছিল চার হাজার ৫৬ কোটি নেপালি রুপি।

এটা আগের বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি এবং এই বাজেট নেপালি মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ভারত চলতি ২০১৮-১৯ সালের জন্য ৫২ হাজার ৮০০ কোটি রুপি বাজেট বরাদ্দ রেখেছে। এটা ভারতের জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছরের বাজেটের চেয়ে এটা ৫ শতাংশ বেশি।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. শাকিল জানান, অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বাজেটে খুব কম অর্থই খরচ করে। যদিও স্বাস্থ্যে বাংলাদেশ গত দুই বছর আগের বছরগুলোর চেয়ে বেশি টাকা বরাদ্দ করেছে। কিন্তু তা মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম।

চিকিৎসা ব্যয় কোন খাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং ওই ব্যয়ের কত অংশ কে বহন করছে এ বিষয়ে ২০১২ সালে একটি গবেষণা হয়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। গবেষণা অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৩ শতাংশ রোগীকে বহন করতে হয় (২০১২ সালের পর গত পাঁচ বছরে এটা ৬৭ শতাংশে উন্নীত)। ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ সরকার, ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ দাতব্য সংস্থা বহন করে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্যয়কৃত ৬৩ শতাংশের মধ্যে ৬৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় ওষুধের জন্য।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুসারে চিকিৎসা খাতে দেশে প্রতি বছর মাথাপিছু খরচ হয় গড়ে ৩০ মার্কিন ডলার। এই খরচের মাত্র তিন শতাংশ সরকার বহন করে, ২৪ শতাংশ আসে অন্যান্য সূত্র থেকে। অবশিষ্ট অর্থ রোগীকেই বহন করতে হয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশে চিকিৎসা করাতে গেলে ব্যয়ের বেশির ভাগ রোগীকেই বহন করতে হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় মানুষের সামর্থ্যরে বাইরে চলে যাচ্ছে। অতি দরিদ্র মানুষেরা অর্থের সংস্থান করতে না পেরে বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসাসেবা থেকে। তিনি গবেষণা উদ্ধৃত করে বলেন, চিকিৎসা খাতে ব্যয় করতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য আমাদের পাশের দেশেও বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন নেপালে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে হৃৎপিণ্ডের ভাল্ব প্রতিস্থাপান বিনা মূল্যে করে দেয়া হয়। ক্যান্সার রোগী হলেই সরকার তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেয়। একই সাথে কিডনি বিকল রোগীদের ডায়ালাইসিস করতে কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। এভাবে নেপালে স্বাস্থ্যের মান বেড়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, সম্প্রতি ভারতে বয়োবৃদ্ধ নাগরিকদের ১৫ লাখ রুপির একটি ফিক্সড ডিপোজিট করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। হতদরিদ্র মানুষ সরকার থেকে পাবে পাঁচ লাখ টাকা। সরকারের এ উদ্যোগের ফলে সেখানে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হবে না কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হচ্ছে এবং মধ্যবিত্তরাও পরিণত হচ্ছে দরিদ্রে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ জানান, এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে হলে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বীমার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। হতদরিদ্রদের বীমার প্রিমিয়াম সরকার দেবে। ড. হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান আরো বৃদ্ধির জন্য সরকার আইনের মাধ্যমে ‘ন্যাশনাল হেলথ প্রটেকশন অথরিটি’ নামে প্রতিষ্ঠান গড়তে পারে। এ প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে স্বাস্থ্য দেখাশোনা করা। তারা বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মানুষের জন্য সেবা কিনে নেবে এবং হাসপাতালগুলো স্বাস্থ্যসেবা বিক্রি করে তাদের ব্যয় নির্বাহ করবে। এতে করে বেসরকারি তো বটেই সরকারি হাসপাতালের সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে। এভাবে সরকারি হাসপাতালের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং কমে যাবে অব্যবস্থাপনা।


অধ্যাপক আব্দুল হামিদ বলেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরার ধারণায় ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে ও সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুসারে নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় ৩০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারলে তা সহনীয় পর্যায়ে আসবে। তিনি বলেন, এমন হলেই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষ আর দরিদ্র হবে না এবং এর জন্য বীমা পলিসি সহায়তা করতে পারে। তিনি এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ৪২০ টাকায় একটি বীমার কথা উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ভর্তি হলে দৈনিক তিন হাজার টাকা হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পাবেন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখানো হলেও বীমার আওতায় একজন শিক্ষার্থী বছরে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা পাবেন।

নয়া দিগন্ত 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত