ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৮ - ৫, আশ্বিন, ১৪২৫ - হিজরী

এই অকালমৃত্যুর দায় কার?

শহীদ মুনসুর আলী মেডিকেল কলেজের তানহা রহমান (২২) নামের এক আপু আত্মহত্যা করেছেন। এর দায় খোঁজার আগে একটু বলা ভালো- মেডিকেলে পাস বলতে ৩৩ নম্বরে পাস নয় । এখানে প্রতি সাবজেক্টে পাঁচটা পার্ট- অবজেক্টিভ, রিটেন, ভাইভা (দুই বোর্ড), অস্পি এবং প্রাক্টিক্যাল। পাস করতে হলে প্রতিটি পার্টে আলাদা আলাদাভাবে ৬০% মার্কস পেতে হবে।

যিনি আত্মহত্যা করেছেন তার নিজের দায় অবশ্যই সবার আগে। কারণ, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, যত খারাপই হোক, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয় । একটু ধৈর্য ধরলেই কোন না কোনোভাবে মুক্তি মিলবেই । Time is the bestHealer.

এরপরেই দায় নিতে হবে বাবা-মাকে । ছেলেমেয়েকে ডাক্তার বানানোর বাবা-মায়ের তথাকথিত ‘স্বপ্ন’ আর জেদের বলি হয়ে কতজনকে যে নিজের স্বপ্ন, ভালো লাগা বিসর্জন দিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাবা মা তাঁদের সন্তানকে জোর করে মেডিকেলে ভর্তি করে দিয়েই খালাস। ছেলে আমার ডাক্তারি পড়ছে, তাধিন তাধিন!

এখানে যে একটা ছেলেমেয়েকে কী পরিমাণ স্ট্রেস সহ্য করতে হয় তার ধারণা তাদের অনেকেরই নেই।

শিক্ষকদের দায় সবচেয়ে বেশি। একটা ছেলে আইটেম পরীক্ষা কেন দিতে আসছে না, অথবা ক্লাসে আসছে না। কোন শিক্ষক তার খবর রাখেন? কেন আসে না? কেন পরীক্ষা দিচ্ছে না? বরং কয়েকদিন পর যখন সে ক্লাসে আসে, হয়তো পেছনের দিকে গুটিয়ে বসে আছে।

তখনই শিক্ষক মহোদয় মনে মনে বলেন, ‘আইজকা পাইছি তোরে’। সবার সামনে এনে বকাঝকা করে চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার করেন । অনেকে টিচারের বকাঝকার ভয়ে আরো পিছিয়ে যায়। ক্লাসে আসে না । ক্লাসে সবার সামনে জিজ্ঞেস করলে সব সমস্যা বলা যায় না। এইটুকু বোঝার মত জ্ঞানও অনেক শিক্ষক মহোদয়ের নেই।

সিনিয়র অনেকের কথা জানি, যারা শুধুমাত্র শিক্ষকদের দুর্ব্যবহারের কারণে ইয়ার লস দিয়েছে। যে ছেলেটা ডিপ্রেশনে ভুগছে তাকে আপনি ক্লাসে পাওয়ামাত্রই সবার সামনে ডেকে বকাঝকা করলে সে কীভাবে এগিয়ে আসবে? যে পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না, তাকে আপনি বারবার আইটেম-কার্ড পেন্ডিং দিচ্ছেন, বকাবকি করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন- সে এগিয়ে যাবে কীভাবে?

পরীক্ষার পর যারা ফেল করেছে- কোন শিক্ষক কি খোঁজ নেন, এই ছেলেগুলো কেন ফেল করলো? না । তাঁরা নিজেদের কোন দোষ দেখেন না, সিস্টেমের কোন দোষ দেখেন না, তাঁরা কোন বাস্তব সমস্যার ধার ধারেন না। তাঁদের কাছে উত্তর রেডি আছে- ‘পড়ালেখা করে না। খালি হোস্টেলে ঘুমায়।’ গার্ডিয়ানকে চিঠি দিতে হবে।

অভিভাবককে চিঠি দেয়ার হয়তো দরকার হতে পারে, কিন্তু তার আগে কী যথাযথ মোটিভেশান দেয়া হয়? স্টুডেন্টের প্রবলেম সলভ করার চেষ্টা করা হয়, সাহায্য করা হয়?

Being a teacher not just reading, explaining & questioning from text, it’s something more than that.একেকটা প্রফেশনাল পরীক্ষাকে আমি তুলনা করি লেবার পেইনের সাথে। লেবার পেইন নাকি অনেক অনেক বেশি। সাধারণভাবে কেউ এতটা পেইন সহ্য করার কথা না। মা ছাড়া অন্য কেউ যেমন সেই কষ্ট বোঝে না, মেডিকেল স্টুডেন্ট ছাড়া অন্য কেউ প্রফ পরীক্ষার স্ট্রেস বুঝতে পারবে না।

প্রসবের বেদনা খুব তীব্র হলেও যেমন পৃথিবীতে মানুষের জন্ম থেমে নেই, যত কঠিনই হোক- ডাক্তার হওয়াও থেমে থাকবে না। কিন্তু সবারই নরমাল ডেলিভারি হয় না, কারো কারো কমপ্লিকেশান থাকে। সিজারিয়ান সেকশন করতে হয়। কারো কারো এসিস্টেড ডেলিভারি করতে হয়। পরীক্ষার পর যারা খারাপ করেছে-কেউ কি তাঁদের ডেকে একটু আদর দিয়ে বলে, একবার ফেল করলে জীবনে বেশি কিছু আসে যায় না।

যারা খারাপ করে তাদের নিয়ে আলাদাভাবে সাইকোলজিক্যাল মোটিভেশন দেয়া দরকার। তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া দরকার। এটি কোথাও চোখে পড়ে না।

পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও ভাবা দরকার। সবগুলো সাবজেক্টের সবগুলো পরীক্ষা একটানা তিন চার মাস ধরে নিতে হবে কেন? বিভিন্ন সময়ে ভাগ ভাগ করে বেশি বেশি সময় দিয়ে নেয়া যায় না? 

বাবা-মায়ের ইচ্ছামত ধরে বেঁধে মেডিকেলে ভর্তি করাতে থাকলে, আর সম্মানিত টিচারদের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এভাবেই প্রতিবছর আমাদের বন্ধুদের কাউকে না কাউকে হারাতে হবে।

আমরা আমাদের কোনো মেধাবী বন্ধুকে হারাতে চাই না। বিষয়টি নিয়ে সম্মানিত শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র এখনই ভাবতে হবে।

লেখক: আরাবি হোসেন, ঢাকা

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমি পড়ি ঠিকই কিন্তু আইটেমের সময় সব ভুলে যাই

আমি পড়ি ঠিকই কিন্তু আইটেমের সময় সব ভুলে যাই

স্যার, আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস করেছি।…

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভয়াবহতা!

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভয়াবহতা!

সার্জারিতে ইন্টার্নশিপ প্রায় শেষ দিকে। এক ব্যাচমেট রিকুয়েস্ট করলো মেডিসিনে তার একটি নন-এডমিশন…

‘ডাক্তার সাব, আপনি স্টেথোস্কোপ কানে লাগাননি’

‘ডাক্তার সাব, আপনি স্টেথোস্কোপ কানে লাগাননি’

১৯৮৫ সনে যখন আমরা এমবিবিএস পাস করার পর ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করতাম তখন প্রতি…

বাংলাদেশি ডাক্তারদের সেবার কথা এখনো ভুলেনি ইরানিরা! 

বাংলাদেশি ডাক্তারদের সেবার কথা এখনো ভুলেনি ইরানিরা! 

ইরানের ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিহাদে সালামাত’ নামক একটি সংস্থার উদ্যোগে ইরানের পাহাড়ি…

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

শুভ্র মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে তখন। হঠাৎ এক সকালে বাবা তাকে ফোন…

একটা ভুত আমার সামনে দিয়ে কবরখানায় ঢুকে পড়লো!

একটা ভুত আমার সামনে দিয়ে কবরখানায় ঢুকে পড়লো!

খুব সম্ভব ১৯৮২ সনের কথা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ি। এল…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর