আরণ্যক রিদোয়ান

আরণ্যক রিদোয়ান

৫৪ তম এমবিবিএস, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ। 


১৪ মার্চ, ২০১৮ ০৭:৪০ পিএম
স্টিফেন হকিং এর মহাপ্রয়াণ

রোগটা কী ছিলো স্টিফেন হকিং এর?

  • রোগটা কী ছিলো স্টিফেন হকিং এর?
  • রোগটা কী ছিলো স্টিফেন হকিং এর?

অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রফেসর স্টিফেন হকিং! মহাকাশ বিজ্ঞানকে শত বছর এগিয়ে দেওয়া একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানীর জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে হুইলচেয়ারকে সঙ্গী করে, ৫৫ বছর ধরে তিনি যুদ্ধ করেছেন এমায়োট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (amyotrophic lateral sclerosis- ALS) নামক মোটর নিউরন রোগের সাথে। আসুন জেনে নেই রোগটি সম্পর্কে কিছু কথা।

 

কী এই ALS? 

Amyotrophic Lateral Sclerosis কে Lou Gehrig's disease ও বলা হয়। মোটা দাগে বলা হয় মোটর নিউরন ডিজিজ। মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডের মাঝে মোটর নিউরন নামক বিশেষ স্নায়ুকোষের ক্রমাগত ক্ষয় হয়ে যাওয়াই এই রোগের কারন। এই মোটর স্নায়ুকোষের দ্বারাই আমাদের চলাফেরা, কথা বলা, খাদ্যবস্তু গেলা, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ এবং কোন কিছু মুঠো করে ধরার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। এই রোগের ফলে মাংসপেশীর স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে দুর্বল করতে করতে একসময় বিকল করে দেয় এবং এক পর্যায়ে রোগী শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়ে যায়।

 

কী কারণে হয় ALS?

গবেষণা থেকে দেখা গেছে শতকরা দশভাগ ALS  জীনগত ভাবে হয়ে থাকে। বাকী নব্বইভাগ ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাত্রার সাথে কোনভাবে রোগটি সম্পর্কিত কিনা তাও এখন পর্যন্ত ধারণা করা যায়নি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৩৫০০ ব্যক্তি ALS এ আক্রান্ত।

 

নামকরণ 

বিখ্যাত বেইসবল খেলোয়াড় Lou Gehrig ১৯৩৯ সালে ALS এ আক্রান্ত হয়ে খেলাধুলা হতে অবসর নিতে বাধ্য হন। তখন থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে এ রোগকে Lou Gehrig's disease নামে ডাকা হয়। উল্লেখ্য,  আমাদের দেশের বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব খালেদ খানও মোটর নিউরন ডিজিজ এর রোগী ছিলেন। 

 

ALS এ কী ধরনের লক্ষণ দেখা যায়? 

যত বেশি মোটর নিউরন ধ্বংস হতে থাকে, মাংশপেশী ও তত দ্রুত দুর্বল হতে থাকে। প্রথম দিকের লক্ষণ গুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো, হাটার সময় অনিয়ন্ত্রিত ছন্দ কিংবা মাঝে মাঝেই হাত ফসকে কোন জিনিস পরে যাওয়া। হাত এবং পায়ের পেশীতে twitching এবং  cramping (অনিয়ন্ত্রিত কম্পন) ও দেখা যেতে থাকে। রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে কথা বলতে সমস্যা শুরু হয়, খাবার গলধঃকরণ এ সমস্যা দেখা দেয়, শ্বাস প্রশ্বাস নিতেও সমস্যা শুরু হয়। শতকরা বিশ ভাগ রোগী প্রগ্রেসিভ বালবার পলসি আক্রান্ত হয়। সর্বশেষ পরিণতি হিসেবে রোগী প্যারালাইজড  হয়ে যান। এ রোগের মৃত্যুর প্রধান কারণ শ্বাস প্রশ্বাস সংক্রান্ত পেশির অকার্যকারিতা। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির গড় আয়ুস্কাল সাধারণত লক্ষণ প্রকাশের দুই থেকে পাঁচ বছর ধরা হয়। অর্ধেকের বেশি রোগী রোগ ধরা পড়ার চৌদ্দ মাসের মধ্যেই মারা যান।

এ বার প্রফেসর স্টিফেন হকিং এ ফিরে আসি। তাঁর রোগ ধরা পড়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে। তিনি আশ্চর্যজনক ভাবে এই রোগ নিয়ে আরও পঞ্চান্ন বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি সেই পাঁচভাগ সৌভাগ্যবান দের একজন যারা ALS  এ আক্রান্ত হওয়ার পরেও দশ বছরের অধিক সময় বেচে ছিলেন। 

চিকিৎসা

ALS  এর চিকিৎসার জন্য একমাত্র লাইসেন্সকৃত ঔষধ হচ্ছে Rilutek। যদিও এই ঔষধের কার্যকারিতায় সাধারণত সর্বোচ্চ রোগীকে  তিন থেকে ছয় মাস  বেশি জীবিত রাখা যায়। এ ছাড়া ও শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখার জন্য ভেন্টিলেশন সিস্টেম, গলাধঃকরণ সহজ করতে ফিডিং টিউব,  পেশীর  জড়তা কমাতে মাসল রিলাক্সেন্ট ব্যবহার করা হয়।
 
ALS এর সাথে বসবাস

নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রফেসর হকিং বলেছিলেন,  ALS এ আক্রান্ত হওয়াটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা।  তার ভাষায়, " অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এ তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন আমি লক্ষ্য করলাম চলাফেরা করতে আমার আগের চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। আমি কোন কারণ ছাড়াই দুই তিন বার পড়ে গিয়েছিলাম! এর পরের বছর আমার বাবা বিষয়টি লক্ষ্য করে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। আমার একুশতম জন্মদিনের কিছুদিন পরেই হাসপাতাল থেকে প্রথম পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলো করিয়েছিলাম, যাতে ALS ধরা পড়ে।"

১৯৭৪ সাল পর্যন্ত প্রফেসর স্টিফেন হকিং বাইরের কারো সহায়তা ছাড়াই দৈনন্দিন কাজগুলো করতে পারতেন, কিন্তু এরপর তা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৮০ সাল থেকে স্টিফেন হকিংকে একজন নার্স সকাল সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে সেবা দিয়ে যেতেন।  ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এই ভাবেই চলছিল, সে বছর তিনি নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হন, ফলে এসময় তার  ট্রাকিওস্টোমি করানো হয়। তখন থেকে তিনি চব্বিশ ঘন্টাই নার্সের তত্ত্বাবধানে থাকতে শুরু করেন।ইতোমধ্যেই তার কথায় জড়তা চলে এসেছিল। খুব অল্প মানুষই ওনার কথা বুঝতে পারতেন; অপারেশনের পর তিনি পুরোপুরিভাবে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকে যোগাযোগ এর জন্য তিনি কম্পিউটার ও স্পিচ সিনথেসাইজার এর উপর নির্ভর করেছেন।

আজ ২০১৮ সালেন ১৪ই মার্চ এই মহান বিজ্ঞানী ইংল্যান্ড এর ক্যামব্রিজ এ নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করলেন। সাথে সাথেই ইতি ঘটলো একটি বিশেষ যুগের। যার পুরোধা ছিলেন এই নিভৃতচারী বিজ্ঞানী। যিনি হুইল চেয়ারে বসেই বিজ্ঞানের আধুনিকতম পথ দেখিয়ে গেছেন পুরো বিশ্বকে। শত বছরেও আর কোন স্টিফেন হকিং কে আমরা পাবো কীনা জানি না তবে কামনা করি যাতে দ্রুতই আবিষ্কার হয় এই দূরারোগ্য রোগের যথাযথ চিকিৎসা। যাতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কোন বিস্ময়কে আর আটকে থাকতে নাহয় কোন হুইলচেয়ারে ক্ষুদ্র গন্ডিতে।

 

তথ্যসূত্র :


১. https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.ninds.nih.gov
২.  https://en.m.wikipedia.org/wiki/Stephen_Hawking
৩. http://www.hawking.org.uk/
৪. http://www.bbc.com

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি