ঢাকা      সোমবার ২৩, জুলাই ২০১৮ - ৭, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী

কে জানতো, এ বিদায় হবে অনন্তকালের!

মানুষের প্রতিটি মুহুর্তই শেষ মুহুর্ত। কে কখন চলে যাবে না ফেরার দেশে কেউই বলতে পারে না। সে চিরন্তন সত্য বাণীকে মেনে নিয়ে চলে গেলেন একই মেডিকেল কলেজের ১৩জন শিক্ষার্থীসহ ৫০টি তাজা প্রাণ।

নিজ অভিজ্ঞতা থেকে শেষ বিদায়ের ঘটনা প্রবাহ বর্ণনা করেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী ইমাম হোসাইন মামুন।

১.
বই প্রকাশের সর্বশেষ কাজে শেষবার যখন ঢাকা যাচ্ছি, যাবার আগে রুমমেটকে দেখিয়ে টাকাটা আমার ড্রয়ারে রেখে বললাম- ‘ঢাকা পৌঁছে অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিলে সেখানে টাকাটা পাঠিয়ে দিস। সড়ক দূর্ঘটনায় আমি মারা গেলেও টাকাটা প্রকাশক বরাবর পৌঁছিয়ে দিস। তাতে অন্তত বই প্রকাশ থামবে না। টাকাসহ কিছু হয়ে গেলে হয়তো টাকাটা হারাবো। এমনিতেই এ টাকা আমার না। বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেয়া। আমি মরে গেলেও আমার নামটা ছাপার অক্ষরে বেঁচে থাকবে আমার প্রিয়জনদের হাতে’।

সত্যিকারার্থেই টাকা আমি পকেটে করে নেইনি। ঢাকা পৌঁছে আরেক ছোট ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে নিয়েছি ঊনিশ হাজার টাকা। রুমমেট পাঠিয়েছে নির্দেশনা মোতাবেক।

এভাবে প্রতিবার যখন সিলেট থেকে ঢাকা যাই, হোস্টেল থেকে বের হবার আগে চারিদিক একবার দেখে যাই। হতে পারে এ দেখাই, শেষ দেখা। হোস্টেলের ডাইনিং-ক্যান্টিনে বকেয়া বিল থাকলে তা পরিশোধ করে যাই পাই পাই করে। ক্যান্টিনে আমার বাকি হিসেব খাতায় লিখা হয় না। আমি মুখে যে হিসেব বলি তাই নির্দ্বিধায় মেনে নেন ক্যান্টিন-চালক। কখনো হিসেব সন্দেহভাজন মনে হলে বিশ-ত্রিশ টাকা বেশি দিয়ে বলি- 'ভাই, আমার কেন জানি মনে হয় টাকা একটু বেশ-কম হতে পারে। এই নিন, এই টাকাটাও রাখুন। তবুও আপনার কাছে হিসেবে গড়মিল মনে হলে বলুন, আরো দেবো'। 

আমার কথা শুনে ক্যান্টিন-চালক হাসেন, হাসতে হাসতে বলেন - ‘এমনভাবে বলছেন মনে হয় আর ফিরবেন না সিলেটে! যান মিয়া। কিসের পাওনা? হিসেবের বাইরে দিয়েও আর কিসের দাবি? আমার পক্ষ থেকে আর কোনো দাবি নাই। আপনি বেশি দিছেন। আপনিও কোনো দাবি রাইখেন না। আল্লার হাওলা’। আমি শেষবারের মতো তাকেও একবার দেখে যাই। হতে পারে এ দেনাই শেষ দেনা।

২.
বাবার সাথে আমি যেসব কারণে রাগ দেখাই তার অন্যতম কারণ- বাসে উঠলে কত নাম্বার সিটে বসেছি? জানালার পাশে না ভেতরে সিটে? বাসের নাম্বার কতো? কোর্স নাম্বার কত?  ট্রেনে উঠলে কত নাম্বার বগি, পাশে কে বসেছে? তার বাড়ি কই? তিনি কী করেন? ইত্যাদি প্রশ্নবানে জর্জরিত করেন আমায়। মাঝে মধ্যে বিরক্ত হয়ে বলি- শুধু শুধু এত চিন্তা করবেন না তো! মরে গেলে কফিন পৌঁছে যাবে আমার স্থায়ী ঠিকানায়। অর্ধ্বমৃত থাকলে আহত-শরীর পৌঁছে যাবে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে। পৃথিবী এখনো মানবশূণ্য হয়ে যায়নি যে, আহত কাউকে দেখেও কেউ পাশ কেটে চলে যাবে।

ঢাকা থেকে সিলেট ফেরার পথে একবার আমাদের সামনের বাসটি একটি ইট-বোঝাই স্থির ট্রাকের সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। আহতদের বের করেছে এলাকাবাসীরাই। কেউ লুঙ্গী গিট্টু দিয়ে, কেউ প্যান্ট ভাঁজ করে রক্তাক্ত শরীরগুলো বাস থেকে বের করেছে। রাস্তার পাশের বাড়ির মহিলারা পানি আর পাটি নিয়ে এসেছে আহতদের জন্য। সে বাসে আমার মেডিকেলের এক সহপাঠীও ছিলো। তার কিছু হয়নি। শুধু সামান্য পা কেটেছে কাঁচের আঘাতে। তার জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম। সে বাসে উঠলে আমিও থাকতে পারতাম নিহতের মিছিলে।

৩. 
আমার চাচা দুজন। দুজনই প্রবাসী। আমাদের ওই অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারই স্বচ্ছল জীবন-যাপন করে থাকে বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। কারো ভাই, কারো চাচা, কারো বাপ। প্রতিটি ঘরের কেউ না কেউ প্রবাসে আছেই।

ছোটবেলায় দেখতাম চাচারা ছুটি শেষে দেশ ত্যাগ করতে গিয়ে একধরনের মুমূর্ষ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতেন। কান্না-কাটি করে মূর্ছাগত হতেন দাদি। সকলের কাছে মাফ-শাপ নিয়ে একধরনের আবেগঘণ পরিবেশের সৃষ্টি করতেন সকলেই। ছোট মাথায় তখন ঢুকতো না, প্লেনে করে বিদেশ যাবে এতে কান্নাকাটির কী আছে? এতো আনন্দেরই। অনেকদিন দেখা হবে না এজন্য হয়তো সামান্য মন খারাপ হতে পারে! একটকা সময় যখন বুঝ হয়েছে- সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও বিমান দুর্ঘটনায় ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তখন থেকে আমিও যোগ দিয়েছে আশাহতের মিছিলে। মেঝো চাচাকে আমি বেশি ভয় পেতাম ছোট বেলায়। তিনিও আমায় একটু আধটু শাসন করতেন। সারাদিন তাঁর চোখের আড়ালে থাকতে চাইলেও বিদায়বেলা ঠিকই তাঁর কোলে উঠে কান্না জুড়ে দিতাম। হতে পারে এ কান্নাই শেষ কান্না চাচার চোখে।

বড় ভাই যখন ওমান যাচ্ছেন তখন আমি দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। আঠার পার হওয়া ওই আমি এলিফ্যান্ট রোডে সিএনজি থেকে নেমে ভাইকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিলাম। হতে পারে এ কাঁদাই দুই সহোদরের শেষ কাঁদা।

৪. 
গতকাল বিকেলে ঢাকা থেকে নেপালগামী বিমান দুর্ঘটনার খবর যখন শুনি তখন বুকটা সামান্য ভারী হয়ে ওঠে। আহারে জীবন! কারো না কারো জীবনের চাকা থামবে এ ঘটনায়। বিধাতার ইচ্ছা না হলে কোনো যাত্রীরই ফেরার সম্ভাবনা নেই।

একটু পর যখন শুনি ওই বিমানে ১৩ জন শিক্ষার্থী আছে যারা জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ থেকে এবারের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা শেষ করে মাতৃভূমিতে ফিরছে। ফিরছে পিতৃভূমিতে। মাকে আর জড়িয়ে ধরা হলো না। বাবার বুকে আর যাওয়া হলো না। বাবা-মা ঠিকই জড়িয়ে ধরবেন ছেল-মেয়েকে। হয়তো কফিনের ওপর থেকে। অশ্রু গড়িয়ে পড়বে কফিনের ওপরই। নিহত-দগ্ধ দেহ নীরবে সয়ে যাবে স্বজনের আর্তনাদ।

তাদের পরীক্ষা দুদিন আগে শেষ হলো মাত্র। খাতাও দেখা শুরু হয়নি হয়তোবা। পরীক্ষক যখন খাতা দেখতে গিয়ে জানবেন এ খাতায় লেখা হাতটি আর ভূখণ্ডে নেই। তাঁর চোখ হতেও হয়তো দু-ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়বে খাতার ওপর।

আমাদের সাথেও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত কয়েকজন নেপালি শিক্ষার্থী আছে। আমার দেখা অন্যতম সেরা মেধাবীদের একটি জাতি এ নেপালিরা। মেডিকেলের কষ্টসাধ্য পড়াশোনাকে তারা ঠিকই জয় করে নিয়েছ। আমরা যেখানে পাশ করতে হিমশিম খাই, তারা সেখানে অনার্স নম্বরকে করে নিয়েছে মামুলি ব্যাপার। ১৩ টি মেধাবী প্রাণ ঝরে গেলো।

গোপালগঞ্জ শেখা সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও ছিলো। নাম পিয়াস রায়। সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাতৃভূমিকে টাটা জানিয়েছিলেন মাত্র পাঁচদিনের জন্য। কে জানতো, এ বিদায় হবে অনন্তকালের! চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা শেষ করে নেপাল যাচ্ছেন বেড়াতে। তিনিও আর নেই। তার পরীক্ষার ফলাফল আসবে। পাশ করে গেলে নামের পাশে ডাক্তার লেখা হবে। তার আগে যুক্ত হবে ‘লেইট’।

কুমুদিনি উইমেন্স মেডিকেল কলেজে ৫ম বর্ষে অধ্যনরত নেপালি শিক্ষার্থী শ্রেয়া ঝা। বছরখানেক পর বাবা-মার কাছে ফিরছিলো। সে ফিরেছেও দেশে। তবে লাশ হয়ে।

ওই বিমানে কর্মরত বাংলাদেশি কো-পাইলট পৃথুলা রশিদও আর নেই। মেয়ে হয়ে জন্মানো এখনও অনেক সমাজে অপরাধ। সেখানে জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে পাইলট হবার স্বপ্ন দেখে এতদূর এলেন। ফিরবেন লাশ হয়ে।

রংপুর মেডিকেল কলেজের ৩৩ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী, বর্তমানে ওই মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালেরই সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শাওন সস্ত্রীক বেড়াতে গিয়েছেন নেপালে। চল্লিশ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে আহত অবস্থায় তিনি আইসিউতে ভর্তি আছেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও হয়তো তিনিও পাড়ি জমাতেন স্ত্রীর সাথে না ফেরার দেশে।

ইউ এস বাংলা ফ্লাইটের ৭১ জন যাত্রীর মধ্যে ৫০ জন আর বেঁচে নেই। বেঁচে থাকা ২১ জনের ভেতরও কয়েকজন হয়তো পাড়ি জমাবেন সংখ্যাগরিষ্ঠের মিছিলে। মৃত্যুটা এমনই। জীবনটা এমনই। নিশ্চিত গন্তব্যে অনিশ্চিত যাত্রা।

এবার থেকে বাবা সিট নাম্বার, বাসের নাম্বার, বগি নাম্বার ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলে আর বিরক্ত হবো না। সন্তানের লাশটা নিশ্চিন্তে পাবার অধিকার সকল বাবাদের আছে। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নিজের জন্য বাঁচি

নিজের জন্য বাঁচি

খুব কাজল পরতে ভালোবাসতাম, চোখের জলসীমায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো।  তুমি বলতে, বেশ…

মৃত্যু আমাকে টানে

মৃত্যু আমাকে টানে

মৃত্যু সত্য। প্রচন্ড রকমের সত্য। পৃথিবীর একমাত্র ধ্রুব সত্য হলো মৃত্যু। আপনি…

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বড় মেয়ের বয়স তখন ৪-৫ বছর। স্কুল থেকে বাসায় এসে দুপুরে উঠল…

মোবাইলে চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইন

মোবাইলে চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইন

শুরু করি একটা গল্প দিয়ে। বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গেছি। বান্ধবীর স্বামী এডমিনিস্ট্রেশনের…

আমি মনে রাখব কোনটি?

আমি মনে রাখব কোনটি?

আমি ভুলে যাব ৯টি খারাপ মানুষের কথা। মনে রাখব ওই ১টি মানুষের…

পারিবারিক শিক্ষা

পারিবারিক শিক্ষা

ছেলেটা বসেছে এক সিনিয়রের চেয়ারের নীচের হ্যান্ডেলের পা দিয়ে,আরেক চেয়ারে। যার হ্যান্ডেলে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর