ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৪, পৌষ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. রীপা চক্রবর্তী

চিকিৎসক, বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ

কনসালটেন্ট, ডেন্ট-আই ইমপ্লান্ট সেন্টার, আজিমপুর, ঢাকা 


বাংলাদেশে চিকিৎসা: ভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা

বাংলাদেশি ডাক্তারদের অনেক বদনাম। তারা ভালো কাউন্সেলিং করেন না, রোগীদের সময় দেন না, ভুল চিকিৎসা করেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিজিট নেন, আরো অনেককিছু!

আচ্ছা, একটু রূপকথার দেশ থেকে ঘুরে আসা যাক।

কেমন হতো যদি আমাদের চিকিৎসা প্রাপ্তি সবসময় ডিজিটাল পদ্বতিতে হতো,আপনি যেকোন সময় একটি নির্দিষ্ট নাম্বারে কল করে কয়েক মিনিটের মাঝেই এম্বুলেন্সের সেবা ও হাসপাতালে পৌঁছবার পূর্বের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারতেন, হাসপাতালে আপনার জন্যে সবসময় একজন ডাক্তার থাকতেন,সাথে তার টিম। আপনার চিকিৎসার সব খরচ সরকার বহন করতো। আর আপনার সাথে কেউ না থাকলে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষই আপনাকে সঠিকভাবে বাড়ি পৌঁছে দেবে। শুধু তাই নয়,আপনার দেখাশোনা করার জন্যে সহায়ক বা সহায়িকার ব্যবস্থাও করে দেবে।

আরো আছে! ডাক্তারের চেম্বারে আপনাকে লম্বা সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে না,ডাক্তার আপনাকে খুব যত্ন করে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে দেখবেন। আপনার প্রেসক্রিপশন ফ্রি হবে অথবা বাৎসরিক একটি নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় ঔষধ নিতে পারবেন যতবার ইচ্ছা।

শিশু ও বয়স্কদের চিকিৎসা ফ্রি, গর্ভবতী মায়েদের সব চিকিৎসা ফ্রি, যাদের ভালো খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, সেই মা ও শিশুদের জন্যে সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার অনুমোদন দিচ্ছে।কীভাবে নতুন বাবা-মা তাদের অনাগত সন্তানের জন্যে প্রস্তুত হবেন তার জন্যে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রসবপরবর্তী জটিলতার নিরসনে একজন প্রশিক্ষিত ধাত্রী সর্বদাই মা ও শিশুর জন্যে নিয়োজিত!

এই কথাগুলো শুনতে কতই না ভালো লাগছে!যদি সত্যই এমনটি হতো তবে কতোই না ভালো হতো! কিন্তু আমি রূপকথার গল্প বলছি না। আমি আমাদের পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে কেমন চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান তা জানাতে চাইছি আপনাদের।

এই পদ্ধতিগুলো আমাদের দেশেও শুরু করা সম্ভব যদি সরকার ও চিকিৎসা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা আমরা পাই। আমি নিজেও একজন চিকিৎসক। তাই সর্বাগ্রে আমিও চাই আমার কাছে আসা রোগীদের জন্য স্বল্পমূল্যে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারি না একজন উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হয়ে অন্য নাগরিকদের জন্য।

প্রতি বছর প্রচুর রোগী আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চিকিৎসা নিতে যান কিন্তু তাদের সবাই সঠিক চিকিৎসা পান না। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে খুব ভালো করে পেশেন্ট কাউন্সেলিং করা হয় যার দরুণ তারা বুঝতে পারেন না অনেকাংশেই যে তাদের সঠিক চিকিৎসা হয়নি। পরবর্তীতে তারা আপাতত সুস্থ হয়ে ফিরলেও আবার সেই সিম্পটমগুলোই ফিরে আসে এবং দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করাটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায় আমাদের জন্য।

এই সুযোগটাই নেয় কতিপয় চিকিৎসক ও তাদের সহকর্মীরা যাদের সঠিক রেজিস্ট্রেশন না থাকার পরও তারা আইনের দূর্বলতার সুযোগে চাটুকারীতা দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে ভূল চিকিৎসা করেও ঠিকই রোগীর আস্থা অর্জন করে নিচ্ছেন।

আমি পড়াশোনার সুবাদে কিছুদিন ইউকে থেকেছি ও কাজ করেছি। আর সেজন্যে কিছুটা হলেও জানতে পেরেছি মূল সমস্যাগুলো কোথায়। লেখনীর শুরুতে যা যা বলেছি তার প্রায় সবকিছুই আমি স্বচক্ষে অবলোকন করেছি সেখানে। শুধু একটি সমস্যা ,আর তা হলো উইকেন্ডে আপনি মরে গেলেও ডাক্তার পাবেন না, আর পেলেও অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হবে যেমনটা আমরা দেশে রোগীদের কাছে অভিযোগ শুনি। তবে সেই সময়ে নার্সেরা অথবা ফার্স্টএইড প্রোভাইডারদের আপনি পাবেন যারা আপনাকে তাদের সম্ভাব্য সব চিকিৎসা দেবেন।

আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি ডাক্তারদের বেশি ভিজিট নিয়ে। কিন্তু আদতে উন্নত দেশগুলোতে পেসেন্টদেরকে তাদের হেলথ ইন্সুরেন্স অথবা ইনকাম লেভেলের ওপর নির্ভর করে ট্রিটমেন্টের চার্জ ধরা হয়। ১৬ বছরের পর থেকে সবাইকে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে হয়। ইন্সুরেন্স থাকলে তা বেতন থেকে কেটে নেয়া হয়। সরকারি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে খরচ কম,আর প্রাইভেটে অবশ্যই ট্রিটমেন্ট চার্জ বেশি। তাই বাধ্যতামূলকভাবে সব নাগরিক জিপি বা জেনারেল প্র্যাক্টিসে নিবন্ধিত থাকেন যা ব্যাতীত প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে আপনার চিকিৎসা এমনকি শুধু কনসালটেশনও সম্ভব নয়।

তাহলে একটু ভেবে বলুন, আমাদের দেশে আপনি চাইলেই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে পারছেন যেখানে খুশি,সেখানে যদি এই জিপি সিস্টেমটা থাকতো আমাদের দেশে,তবে কি আপনি এত সহজে চিকিৎসা নিতে পারতেন?

আরো যোগ করি,আমাদের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মত উন্নত দেশগুলোতেও ভালো চিকিৎসা শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ব,গ্রামাঞ্চলে নার্স ও অন্য হেলথকেয়ার প্রভাইডাররা কাজ করেন,তবে অবশ্যই তারা অনেক প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ, যে দিকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। আরো একটি বড় সমস্যা তাদের আছে আর তা হলো তাদের হাসপাতালগুলোতে সিট অনেক কম থাকে। তাই কখনই তারা তাদের ধারণ ক্ষমতার বাইরে রোগীদের ভর্তি করেন না। প্রয়োজনে শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেন এবং আপনাকে কখনোই বেশিদিন বা সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তারা হাসপাতালে রাখবে না। যদি দেখেন যে আপনি সুস্থ হয়ে উঠছেন বা হবার আশা আছে,তবে তারা আপনাকে রীতিমত বাধ্য করবে বাড়ি ফিরে যেতে! যাতে পরে আপনার সিট-এ আরেকজন রোগী তারা নিতে পারেন ও তাদের বাড়তি সিট বা বাড়তি চাপ কোনটিই না নিতে হয়।

আমাদের যদি কাজ করার সঠিক পরিবেশ প্রদান করা হয়,কর্মক্ষেত্রে সম্মান দেয়া হয়,সঠিক বেতন-ভর্তুকি ও বসবাসের নিরাপত্তা প্রদান করা হয়, সর্বোপরি হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধ করে বরং আমাদের চিকিৎসাক্ষেত্রে সাফল্যের দিকগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করে এবং রোগীদের আমাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে অনুপ্রাণিত করে যদি সরকার ও মন্ত্রণালয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়,আমরাও তবে আন্তর্জাতিক সেবা প্রদানে অবশ্যই সক্ষম হব।

লেখক: চিকিৎসক

বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ, কনসালটেন্ট, ডেন্ট-আই ইমপ্লান্ট সেন্টার, আজিমপুর, ঢাকা 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রোগীদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন : মমেকহা পরিচালক

রোগীদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন : মমেকহা পরিচালক

প্রিয় ময়মনসিংহ বিভাগবাসী, আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ বছর ২ মাস…

আত্মহত্যা নিয়ে যতকথা!

আত্মহত্যা নিয়ে যতকথা!

সুইসাইড বা আত্মহত্যা হলো নিজেই নিজেকে হত্যা করা।  এটা হলো অস্বাভাবিক চিন্তার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর