ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. নাজিরুম মুবিন

মেডিকেল অফিসার, মিনিস্ট্রি অব হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার


ব্রেস্ট ক্যান্সার গবেষণায় অগ্রপথিক যে নারী বিজ্ঞানী

ব্রেস্ট ক্যান্সারের ইতিহাসে BRCA1 জিন আবিষ্কার অনেক বড় একটি মাইলস্টোন।

BRCA1 জিন, কোষের দেখভাল করে। যখন ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, BRCA1 ডিএনএকে মেরামত করে। আর মেরামত করতে না পারলে প্রোগ্রাম সেল ডেথের মাধ্যমে কোষটাকেই মেরে ফেলে। যখন BRCA1 নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এটি আর কোষের দেখাশোনা করতে পারে না। ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামতও করতে পারে না। ফলাফল ক্যান্সারের ঝুঁকিবৃদ্ধি।

BRCA1 জিন এবং ব্রেস্ট ক্যান্সারের সাথে এর সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এর আগে ধারণা করা হতো ক্যান্সার হয় ভাইরাসের কারণে। এর সাথে জেনেটিক কোন ব্যাপার স্যাপার জড়িত নেই। এই আবিষ্কারের পরেই ব্রেস্ট ক্যান্সার চিকিৎসার দৃশ্যপট বদলে যায়। গবেষণায় দেখা যায় মোট ব্রেস্ট ক্যান্সারের ৩-৮ শতাংশের কারণ BRCA1 জিনের মিউটেশন। আর ২৫% বংশানুক্রমিক ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্য দায়ী এই BRCA1 জিনের মিউটেশন। তাই স্ক্রিনিং এর ফলে আগে ভাগেই ব্রেস্ট ক্যান্সার ও তার ঝুঁকি নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো নারীদের এই প্রাণঘাতী রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট BRCA1 জিন আবিষ্কার করেছিলেন একজন নারী বিজ্ঞানী। ড. মেরি ক্লেয়ার কিং। সত্তরের দশকে যখন তিনি ক্যান্সারের সাথে জিনের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এমন ধারণা সামনে এনেছিলেন তখন সবাই হাসাহাসি করেছিল। তবে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এটি প্রমাণ করার ব্যাপারে।

ড. কিং কোনভাবেই তার প্রজেক্টের জন্য ফান্ড জোগাড় করতে পারছিলেন না। হঠাৎ আশার বাণী শুনতে পেলেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) থেকে। তার শহর থেকে এনআইএইচ অনেক দূরে। প্লেনে করে যেতে হবে। এনআইএইচে প্রেজেন্টশনের দিন তারিখ ঠিক হলো। এই প্রেজেন্টেশনের উপরেই নির্ভর করছে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সাথে জিনের সংশ্লিষ্টতা আবিষ্কারের কাজে তিনি ফান্ড পাবেন কি না।

প্রেজেন্টেশনের ঠিক ১ সপ্তাহ আগেই ঘটলো সেই দুর্ঘটনা। ড. কিংয়ের স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেল। পরের দিন ড. কিং তার মেয়েকে ডে কেয়ার থেকে বাসায় এনে দেখেন তার বাসা ভাঙ্গা হয়েছে। ড. কিং তার মাকে ডেকে আনেন এনআইএইচে থাকার সময়টাতে তার মেয়েকে দেখে রাখতে। কিন্তু যখন তার মা জানতে পারলেন যে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে তিনিও রাগ করে চলে গেলেন।

এতো সব ঝড় ঝাপ্টায় ড. কিংয়ের এনআইএইচে যাওয়াটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। তিনি তার ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের রুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। চেয়ারম্যান তাকে সান্ত্বনা দিলেন। তার পোস্টডকের সুপারভাইজার বললেন এনআইএইচে প্রেজেন্টশনের সময়ে তিনি ড. কিংয়ের মেয়েকে দেখে রাখবেন। সবার উৎসাহ ও আশ্বাসে ড. মেরি ক্লেয়ার কিং এনআইএইচে গেলেন। প্রেজেন্টেশন দিলেন। বাকিটা ইতিহাস। ১৭ বছরের চেষ্টায় ১৯৯০ সালে অবশেষে আবিষ্কৃত হলো BRCA1 জিন এবং ব্রেস্ট ক্যান্সারে তার ভূমিকা। বদলে গেল ব্রেস্ট ক্যান্সারের প্রচলিত সব ধারণা। এটা এমন সময়ের কথা যখন হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট মাত্র কাজ শুরু করেছে।

পারিবারিক জীবন ও বিজ্ঞানী জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে মহিলা বিজ্ঞানীদের অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হতে হয়। এ প্রসঙ্গে ড. কিং বলেন, “কাকতালীয়ভাবে মেয়েদের সন্তান ধারণ, লালন-পালনের সময় এবং ক্যারিয়ার গঠনের সময় একই সাথে আসে। আর বিজ্ঞানও একটি বহু আকাঙ্ক্ষিত সন্তান। আপনি এর থেকে দূরে সরে যেতে পারেন না।” যে কারণে তিনি পরিবার বান্ধব ল্যাবের ধারণা গড়ে তুলেছেন। তার মেয়ে বড় হয়েছে মায়ের ল্যাবের দেয়ালে ছবি এঁকে এঁকে।

ড. মেরি ব্লেয়ার কিং চিকিৎসক নন। কিন্তু ব্রেস্ট ক্যান্সার চিকিৎসায় তিনি চিকিৎসকদের পথ দেখিয়েছেন। প্রতিদিন নতুন জীবন পাচ্ছে হাজারো ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগি। তার জীবনের গল্প শুনে মনের জোর পাচ্ছে পেশাজীবী নারীরা।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ড. মেরি ব্লেয়ার কিংয়ের প্রতি নিরন্তর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডা. আব্দুল করিম (ছদ্মনাম)। প্রেসক্রিপশনে নামের পাশে এমবিবিএস শব্দটি নেই। আছে কিছু…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস