ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা ধ্রুবা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা ধ্রুবা

ডেন্টাল সার্জন, ওএসডি, অ্যাটাসমেন্ট ঢাকা ডেন্টাল কলেজ এন্ড হসপিটাল


০৮ মার্চ, ২০১৮ ০৮:২৬

না ভালো মা, না ভালো ডাক্তার: Double Guilt Cycle of Doctor Mothers

না ভালো মা, না ভালো ডাক্তার: Double Guilt Cycle of Doctor Mothers

- কংগ্রাচুলেশনস আপু! এফসিপিএস, তাও আবার একটা বাচ্চা নিয়ে। আপনি পারেনও বটে!

- আমি? না ভালো মা, না ভালো ডাক্তার। আমার এচিভমেন্ট শূণ্য!

ছন্দা আপু (ছদ্মনাম) এ নিয়ে ষষ্ঠ বার এফসিপিএস ফাইনাল পার্ট পরীক্ষায় বসেছেন। ক্লাস টপার হিসেবে ইন্টার্নি শেষের পর বিসিএস, এফসিপিএস পার্ট ওয়ান কিছুই আটকাতে পারেনি তাকে। বিয়ে হলো, তাও সব ভালোই চলছিল। এরপর মা হলেন, সব বদলে গেল। একে একে পাঁচ বার পরীক্ষায় বসলেন। ফলাফলে শুধুই হতাশা। পতিত নক্ষত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে। একটু যে পড়বেন, সে উপায়ও নেই। পড়তে বসলেই বাচ্চাটা কোলে এসে বসে থাকে, বই ছিঁড়ে ফেলে। দরজা লাগালে এক নাগাড়ে ধাক্কা চলতেই থাকে। এ অবস্থার বিগত কয়েক বছরেও কোন পরিবর্তন নেই। তাই এবার পরীক্ষার আগের কয়মাস সন্ধ্যা হলেই সন্তানকে ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো শুরু করলেন। বাচ্চা ঘুমালে পড়তে বসতেন তিনি। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে ডাক্তার হাজব্যান্ড ব্যাপারটা আঁচ করতে পারেন। মনোমালিন্য শুরু হয় সংসারে। এফসিপিএস পাশ হয়েছে ঠিক, কিন্তু এই সফলতা বিস্বাদ ঠেকছে তার। তার ফোলা চোখে সফলতার চকচকানি নেই, শুধুই অপরাধবোধ।

শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীজুড়ে সব কর্মজীবী মা এই মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে দিন কাটান। সন্তানের জন্য জীবনের যেকোন সিচুয়েশনে মায়ের চেয়ে উপযোগী কিংবা যথার্থ বিকল্প কেউ হতে পারে না। মা-ই সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষিকা, মা-ই বেস্ট গাইড। একজন মা তার কর্মকালীন সময়ে যতই নির্ভরতার মানুষের কাছে সন্তানকে রেখে আসুক, অফিসের কাজের চেয়েও তার মস্তিষ্ক অকুপাই করে রাখে সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তা, বিপদের সম্ভাবনার ভয় এবং সর্বোপরি সন্তানকে সময় না দিতে পারার অপরাধবোধ। এই অপরাধবোধ কাজে প্রভাব ফেলে। কাজ থেকে দ্রুত ঘরের ফেরার তাড়া থাকে, কাজের ফাঁকেফাঁকে সন্তানের সব আবদার পূরণ করতে হয় ফোনে, খোঁজ রাখতে হয় দৈনন্দিন কাজ-খাওয়ার, সমাধান করতে হয় নানা সমস্যার। মা হবার আগের মতো এখন আর হয় না কোন প্রফেশনাল পারফরম্যান্স।

ডাক্তার মায়ের জন্য এ দায় ও দায়িত্ব আরো বেশি। এমন নয় যে অফিস শেষ মানেই সবটুকু সময় গিল্ট ফ্রি হয়ে সন্তানের জন্য বরাদ্দ! চিকিৎসা পেশা হিসেবে প্রশ্নাতীত ভাবে পড়াশোনা এবং প্র্যাকটিস ডিমান্ড করে। এবং মানুষের জীবন নিয়ে যে প্রফেশন সরাসরি ডিল করে, তাতে কোনকিছু ছাড় দেয়া যায় না। ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে বিবেকের কাছে এত বেশি দায়বদ্ধতা অন্য কোন পেশায় আছে বলে জানা নেই। তাই সন্তানের জন্য নির্ধারিত সময়েও ডাক্তার মা নির্বিঘ্ন থাকতে পারে না। মাথার উপর ঠিকমতো পড়তে না পারার, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে না পারার এবং ডাক্তার হিসেবে দৌড় থেকে ছিটকে পড়ার ভয়, আশংকা এবং দায় স্থায়ী বাসা বাঁধে। আশা, সম্ভাবনা এবং পজিটিভিটি দূরে চলে গিয়ে মা-কে হতাশ করে, অপরাধী করে। "ডাবল গিল্ট" এবং "মেন্টাল লেবার" এর স্ট্রেসে পড়ে অনেক মা ডাক্তারি ছেড়ে দেয়, মেইন্সট্রিম প্র্যাকটিস থেকে দূরে সরে যায়। আর যারা ছাড়ে না তারা সমাজের স্ট্যান্ডার্ডে "গুড ইনাফ" হওয়ার চেষ্টা চালাতেই থাকে। হতাশার দুষ্টচক্রে পড়ে ডিভিশনাল শহরের সেরা গাইনোকলজিস্ট ওটির ওয়াশ নিতে নিতে ভাবেন, "ইশশ! আরেকটু সময় দিলে ছেলেটা জেলা স্কুলে টিকে যেত"! ম্যাটারনিটি লিভের পর আরো ছয়মাস ট্রেনিং ডিসকন্টিনিউ করা অনারারি ডাক্তার ছোট্ট শিশুকে হাস্পাতালে নিয়ে আসে লো ইমিউনিটির তোয়াক্কা না করেই। বাচ্চার ছয়মাসের আগেই লিভ শেষ করা বিসিএস মা পোস্টিং এ যেতে বাসে বসে ব্রেস্টফিড করিয়ে ঢেঁকুর তোলে, তাতে ইবিএফ করানোর কতোটুকু তৃপ্তি আর অযাচিত স্থানে ফিডিং এর কতটুক গ্লানি তার কোন অনুপাত নেই। বাচ্চার কথা দেরিতে ফোটে, মাইলস্টোনগুলোতে পৌঁছাতে একটু সময় নেয়, কার্টুন দেখার অভ্যস্ততা জেদি করে তোলে। মা আরো হতাশ হতে থাকে। এ হতাশা সুপার ওম্যান না হতে পারার। এ হতাশা কোন কিছুতে পারফেক্ট না হতে পারার।

শোন মা! ডাক্তার মা!!

মা হিসেবে, ডাক্তার হিসেবে "গুড ইনাফ" নামের মরীচিকার কোন অস্তিত্ব নেই। "গুডনেস" হতে পারে যে কোন ফর্মে, যে কোন প্যাকেজে। তুমিই শ্রেষ্ঠ মা তোমার সন্তানের মা হয়ে, তোমার রোগীর চিকিৎসক হয়ে। তুমিই শ্রেষ্ঠ তোমার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সন্তানের জন্য নিজেকে ডেডিকেট করায়। তুমিই শ্রেষ্ঠ স্বপ্নের কোন সাবজেক্টে ক্যারিয়ার না করে সহজতর বিষয়ে পড়ে সন্তানকে সময় দেয়ার মাধ্যমে। তুমিই শ্রেষ্ঠ সবচেয়ে কঠিন বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ে রোগীর সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ায়। এখানে অপরাধবোধের স্থান নেই, নেই কোন হতাশায় জর্জরিত হবার অবকাশ। মা হয়ে সন্তানের মাধ্যমে অমিত সম্ভাবনার যে আলো তুমি জ্বেলেছ, দুস্থের সেবায় অকাতর হয়ে যে আলো তুমি বিলিয়েছ অসংখ্য মানুষের মাঝে, জেনে রেখ সে আলোতেই তুমি অনন্যা, তুলনাহীন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত