ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


০৭ মার্চ, ২০১৮ ০৫:১৭ পিএম
মুক্তিযুদ্ধ

দীপিতার বাতেন মামা

দীপিতার বাতেন মামা

আমি দীপিতা। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। প্রাণ রসায়ন। আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে অদ্ভূত। বাবা ভাইবোনদের মধ্যে ছোট ছিলেন। বৈষয়িক সম্পত্তি প্রবাহমান চূড়া থেকে ঢালু হয়ে নামতে নামতে তার অব্দি বেশি একটা পৌঁছায় নি। সর্বকনিষ্ঠের আহলাদে কিংবা উদাসীনতায় লেখাপড়াটাও হয়ে ওঠেনি তেমন। এক কাপ চা, একটা সিগারেট সমুখে নির্বিঘ্নে পেলেই তিনি বর্তে যেতেন। ভাবতেন, এরচেয়ে বেশি মানুষের আর কি লাগে!

আর মা হচ্ছেন আমার দেখা সবচেয়ে ভালো স্ত্রী। বাবাকে নিয়ে কোনদিন কোন অভিযোগ শুনিনি মায়ের মুখে। দারিদ্রতা তাদের আরো বেশি নেকট্যতা দিয়েছে যেনো। আমার বাবা মা'র সাংসারিক মিথস্ক্রিয়া আমার কাছে এখনো অপার বিস্ময়! কোনকিছু ঠিকঠাক মতো না পেয়েও কী অসাধারন সংসার জীবন পালন করে গেছেন তারা!

- মা আপনার ঐ জমিটা বাবা বিক্রি না করলে পারত না? আমরা এখন বাগান বাড়ি বানাতে পারতাম।

- কোনটা?

- যেটা নানা বাড়ি থেকে পেয়েছেন, সেটা।

- তোর বাবা কি ইচ্ছা করে বেচ্ছে? সেবার এমন বিপদে পরল মানুষটা। বাবুনের পরীক্ষা.... বেতন, ফিস (আমাদের মা ফি কে ফিস বলেন), ফরম ফিলাপের টাকা সব বাকী। এদিকে সংসার তো আছেই। এতগুলা মানু( মানুষ)। শেষে আমিই কইলাম, জমিন দিয়া কি অইব, বেইচা দ্যান।

আমার মায়ের গয়না গাটির ও এমন ইতিহাস আছে। কোথায় ওগুলো জানতে চাইতাম না আমরা। নিশ্চয় বন্ধকী দোকানে। মা ঠিকই জানতো সেগুলো ফিরিয়ে আনার সাধ্য বাবার নাই।

সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে এগুলো নিয়ে আমার মায়ের মনে কোন আক্ষেপ দেখিনি। বরং বাবার চোখেমুখে একটা কষ্টের ছায়া লেগে থাকত।
সংসারে বাড়ন্ত থাকলে সব বাবার চোখই মনেহয় ক্লান্ত ঘোলাটে দেখায়। আমার অনুমান।

আমরা অনেক ভাইবোন। আমরা যার যার মতো সবাই লক্ষীমন্ত। কখনো লেস ফিতার জন্য কিংবা নতুন জামা জুতার জন্য কান্না করিনি। পেটে ক্ষুধা রেখে ও এমন একটা ভাব করতাম যেন, পেট ফেঁটে যাবে, আর খেতে পারব না। মা কিন্তু ঠিকই বুঝতেন। আরেকটা ব্যাপার, মা কখনো আমাদের সাথে খেতেন না। পাছে আমরা জেনে যাই, পাতিলে পর্যাপ্ত ভাত নেই।

আমার মনে আছে, আমি প্রথম আমি বর্ণমালা লিখেছি মাটিতে। ছোট একটা ডাল ভেংগে। আমরা বলতাম ছিটকীর ডাল। ওটা আমাদের খুব প্রিয় একটা অনুসঙ্গের মতো ছিল। কারন আমরা ওটা দিয়ে দাঁত ও মাজতাম। বাবা আমাকে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লেখা শিখাচ্ছিলেন। খ লিখতে পারার যে আনন্দ, এখনো যেনো লেগে আছে আমার চোখে মুখে!

পাশের বাসার এক আত্মীয়। আমি নানী বলে ডাকতাম। আমাকে বেশ আদর করতেন। অবশ্য অন্যরা বলত আমি নাকি নানীর সব কথা শুনি। ফুট ফরমাস জটপট করে দিই। নানীরা ছিলেন বেশ বড় লোক। তাদের ঘরে সব সময় রান্না করা খাবার উপচে পরত। রান্নার বুয়ারা একটার পর একটা রান্না করে চলছে। তখন আমার ভাবনার গন্ডিটাই এমন ছিল, যার ঘরে যত খাবার তারা তত বড়লোক।

তো সেই ঘরে আরো কিছু বাড়তি লোক ছিল। বাতেন মামা তেমনি একজন। মামা নানীদের জমির ফসল দেখতেন। গরু চড়াতেন। আর কিছু হলেই ঠাঠা করে হাসতেন। আমাকে বলতেন ' মালিক ' কখনো কখনো 'পাইলট '। কেন যে বলতেন আমি এখনো বুঝতে পারি না। তবে মামা যে আমাকে একটু বেশি সমীহ করেন এটা আমি বুঝতাম। ক্লাস টু থ্রি পড়ুয়া হলেও মর্যাদা বুঝার বয়স হয়ে গিয়েছিলো বেশ আগেই।

যাহোক, বাতেন মামার চোখে মুখে একটা বিষন্নতা কী খেলা করত? সবাই বলত, মামা একটু পাগল কিছিমের। তেমন বৈষয়িক জ্ঞান নেই। তার বাড়িটা যখন চালাকী করে অন্যজন নিয়ে নিল, তখন এই ধারনা আরো বধ্যমূল হলো যে মামা আসলে পাগলা। না হলে নিজের বাড়ি কেউ অন্যকে দিয়ে দেয়?

অনেক দিন পর। আমি তখন ইউনিভার্সিটর ছুটিতে বাড়ীতে। মাকে খুব করে বল্লাম,

- মা, বাতেন মামার গল্প শুনতে চাই। বলেন তো, মামা এমন উদাসীন কেন?

- শুনেছি যুদ্ধের পর থাইকা এমন। সামনা সামনি পাক সেনাদের লগে যুদ্ধ করছে। মরা লাশ কবর দিছে রাতের আন্ধারে। আরো কত কি!

- আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকি। গা কাটা দিয়ে ওঠে। বাতেন মামা মুক্তিযোদ্ধা!!! এই মুক্তি মামা আমাকে এত আদর করেন !!!

- আরো বলেন মা। মামা তো তাহলে সাহসী। তো এখন এমন পাগলা কেন?

- মা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন। সেবার এমন যুদ্ধ হইল। তোর মামী পোয়াতী। যখন তখন অবস্থা। বাতেন ভাই নাই তো নাই। তার বউ কানতে কানতে কয়,

- হ্যায় যুদ্ধে গেছে। হ্যার পোলাপাইন নাকি স্বাধীন দেশত জন্মাইব।

- দেশ তো স্বাধীন হইছে। কিন্তু বাতেন ভাই স্বাধীন দেশে তার বউ বাচ্চাকে পায় নাই। শুনছি রাজাকাররা নাকি পোয়াতি বউরে পাক সেনাদের ক্যাম্পে দিয়া আইছিল। আহারে বাতেন ভাই! তারপর থাইকাই তোর বাতেন মামুর এই অবস্থা।

দেখি মা'র চোখ দিয়া ঝরঝর করে পানি পরছে। আমি ও ঝাপসা দেখছি সব। বুকের কাছে কী যেনো দলা পাকিয়ে আছে, দমবন্ধ।

আমার দেখা একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা। আমার বাতেন মামা। আমি জানি আমার মায়ের কোন ভাই নাই। তারপরও বাতেন মামা আমার মামা। একমাত্র মামা।
আমি আমার মামারে আর খুঁজে পাইনি। কোথাও না।
বাংলাদেশের কোন গেজেটে ও না। তবুও খু্ঁজি...

( বিঃদ্রঃ- আমার প্রথম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা। সাত মার্চ জাতিরজনক স্বাধিনতার কবিতা শুনিয়েছিলেন। সেই ক্ষনকে বুকে নিয়ে করে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না