ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


০৬ মার্চ, ২০১৮ ০১:৪৬ পিএম

আপনার বেঁচে থাকায় যে মানুষটির অবদান ছিলো

আপনার বেঁচে থাকায় যে মানুষটির অবদান ছিলো

ছবির মানুষটির নাম ডা. রফিকুল ইসলাম।

ডা. রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন। সম্ভবত ডা. রফিকুল ইসলামকে আপনারা চিনেন না। আপনি যদি আশির দশকের পরে তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে আপনার বেঁচে থাকার পেছনে ছবির এই মানুষটার কিছুটা অবদান আছে। সম্ভবত আপনার ভাই, বোন বা উত্তর প্রজন্মের বেঁচে থাকার পেছনেও এই মানুষটা ভুমিকা রাখছেন।

ছোটবেলা থেকে আজকে পর্যন্ত যে ‘আনস্মার্ট’ রোগটি আমাকে, আপনাকে মাঝে মাঝেই ভুগিয়েছে, তার নাম ডায়রিয়া। এই রোগটি আপনার কাছে আজ আর মহামারি মনে হয় না, কারণ আপনি খাবার স্যালাইনের নাম জানেন এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এই স্যালাইনটি আজ সহজলভ্য। আর কোথাও পাওয়া না গেলেও লবণের সাথে গুড় মিশিয়ে এটা বানানোর সহজ ফর্মূলাটা আপনি জানেন। এই 'সামান্য' স্যালাইন এখন সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবন বাঁচাচ্ছে। এই ওরাল রিহাইড্রেশান স্যালাইন (ORS) বা খাবার স্যালাইন আবিষ্কারের পিছনে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন তিনি ডা.রফিকুল ইসলাম। বিরাশি বছর বয়সে গতকাল অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

আইসিডিডিআরবিতে থাকাকালীন তাঁর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে ওরাল রিহাইড্রেশান স্যালাইন স্বীকৃতি পায়। এর আগে ডায়রিয়ার চিকিৎসার একমাত্র সমাধান ছিলো ইন্ট্রাভেনাস কলেরা স্যালাইন, যা উন্নত বিশ্বে এবং একমাত্র হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যেতো। এটা ঠিক, খাবার স্যালাইনের আবিস্কারের প্রক্রিয়া আরো আগেই শুরু হয়েছিলো কিন্তু ডা. রফিকুল ইসলামের গবেষণাই এটিকে সার্বজনীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতে বাংলাদেশী শরণার্থী শিবিরে হঠাৎ করে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। ইন্ট্রাভেনাস কলেরা স্যালাইন যেটা শিরায় দেয়া যায়, তা খুবই অপ্রতুল হয়ে পড়ে।সেই সময়ে হাজার হাজার শরণার্থী শিশুর জীবন বাঁচাতে ভূমিকা পালন করে খাবার স্যালাইন। এরপর খাবার স্যালাইন WHO এর স্বীকৃতি পায় এবং যুদ্ধের পর এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে সারা বিশ্বে। আন্তর্জাতিকভাবে ‘ঢাকা স্যালাইন’ নামে পরিচিত এই ORS বা খাবার স্যালাইনকে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ‘দ্যা ল্যানসেট’ অভিহিত করেছে বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা অগ্রগতি হিসেবে। আশির দশকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ছিলো ২০ শতাংশ। ORS বা খাবার স্যালাইনের সঠিক ব্যবহার এখন এটাকে ২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। শিশু মৃত্যুহার কমানো নিয়ে আমাদের যে গর্ব এবং জাতি হিসেবে আমরা যে প্রশংসা পাই, সেটি মূলত খাবার স্যালাইন আবিষ্কারক ডা. রফিকুল ইসলামের জন্যই। 

প্রচারবিমুখ, অন্তর্মুখি ডা. রফিকুল ইসলাম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য থেকে ট্রপিক্যাল মেডিসিনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে আইসিডিডিআরবিতে যোগদান করেন এবং নিরবচ্ছিন্ন গবেষণায় নিবেদিত থেকে ২০০০ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

এই নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক-গবেষকের জন্য শ্রদ্ধা এবং আমাদের মিডিয়াও যেনো এই দেশের সেরা সন্তানটিকে স্মরণ করে এই দুরাশা পোষণ করছি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত