ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৪, পৌষ, ১৪২৫ - হিজরী

আর একটাও নতুন মেডিকেল কলেজ নয়, অধ্যাপক টি এ চৌধুরী স্যারের অনুরোধ

স্বাধীনতা পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক টি এ চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের তৃতীয় সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ভাষণ দেন স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত , বাংলাদেশের গাইনোকোলজি এন্ড অবস্টেটিক্স বিষয়ের কিংবদন্তী অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরী স্যার। স্যার তার ভাষণে বাংলাদেশের মেডিকেল সেক্টরের কিছু দারুণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রনহীন মেডিকেল কলেজসমূহ, মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থার মান, বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিএসএমএমইউর দায়িত্ব, একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব,চিকিৎসা পেশায় সময় দিয়েও কীভাবে পরিপূর্ণ ,সফল ও শান্তিময় জীবন অতিবাহিত করা যায় তার রহস্য - এরকম নানা বিষয় তিনি চমৎকারভাবে তার বক্তব্যে তুলে ধরেন।মেডিভয়েসের পাঠকদের জন্য অধ্যাপক টি এ চৌধুরী স্যারের পুরো বক্তব্য তুলে ধরা হলোঃ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হামিদ, মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, বাংলাদেশ পার্লামেন্টের সদস্যবন্দ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান, একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন ফ্যাকালটির সদস্যবৃন্দ, সংবাদ সংস্থা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ, সর্বোপরি আজ যাদের জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে অর্থাৎ যারা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পরীক্ষা পাশ করার পর আজ সনদপত্র গ্রহণ করতে এসেছেন তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সমবেত সুধীমন্ডলী,

আজ ১৯শে ফেব্রুয়ারী, ভাষা আন্দোলনের মাস। ১৯৫২ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারী যে সমস্ত ভাষা সৈনিক নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন ও সেই সাথে সামাল স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান জানিয়ে আজ আমি আমার বক্তব্য শুরু করছি।

আমাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে মনোনীত করার জন্য আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং এটি আমার জীবনে একটি বিরল সম্মান হিসেবে মনে করি।

আমি কোন বড় ধরনের বুদ্ধিজীবী নই। তাই আমার পূর্বসূরীদের মত আমার বক্তব্যে আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিক চিন্তাধারা খুব একটা থাকবে না। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাদের চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসা শিক্ষা বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত অর্ধ শতাব্দীর বেশী সময় ধরে বেশ কাছে থেকে এই পরিবর্তনগুলি আমার দেখার সুযোগ হয়েছে বিধায় অভিজ্ঞতার আলোকে আমি কিছু বক্তব্য রাখতে চাই।

দেশে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে সেই সম্পর্কে আমরা সবাই একমত। আমাদের মাতৃমৃত্যুর হার, শিশু মৃত্যুহার অনেক কমেছে। শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের প্রায় সবাই টিকা পান। অনেক সংক্রামক ব্যধি সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যখাতে এই উন্নতি আমাদের এই অঞ্চলের অন্যান্য অনেক দেশের ঈর্ষার কারণ। কিভাবে এটা সম্ভব হল? দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নতি এই ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বড় রকমের অবদান রেখেছে কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজগুলি করেছে আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীরা। সেটা সম্ভব হয়েছে গত ২/৩ দশকে আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অনেক বাড়ার ফলে। মানুষের দোড় গোড়ায় সেবা পৌঁছানোর জন্য নিঃসন্দেহে আরও অনেক চিকিৎসক আমাদের প্রয়োজন। তবে আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি যে, দ্রুত চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যাতে এদের গুণগত মান ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। সময় একটু বেশী লাগলেও আমরা চাই দেশে কেবলমাত্র এমন চিকিৎসক তৈরী হোক যারা যে কোন মাপকাঠিতেই অন্যান্য দেশের চিকিৎসকের চেয়ে নিম্নমানের হবেন না। দেশে গত কয়েক দশকে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে অনেক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেগুলির অনেকগুলিই মুনাফাভিত্তিক, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য হল এই মেডিক্যাল কলেজগুলি আপন করে এর মাধ্যমে টাকা রোজগার করা, সমাজের উন্নতি করা নয়। অনেক মেডিক্যাল কলেজে সত্যিকারের চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নাই, শিক্ষক নাই, রোগী নাই। অথচ পাশের হার ৮০-৯০%। বেশ কিছু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে মেডিক্যাল শিক্ষা দেওয়ার নাম করে যদি আমরা নিম্নমানের চিকিৎসক তৈরী করি এটা কি ঠিক হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে এই সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ থেকেও শেষ পর্যন্ত ভাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বের হয়েছে। সেটা হয়েছে ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব প্রচেষ্টায়। বেশ কিছু মেডিক্যাল কলেজ এ শিক্ষার মান এতটাই নীচু যে সেখান থেকে পাশ করা ডাক্তারদের যোগ্যতা নিয়ে আমাদের নিজেদের মনেই সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। আপাততঃ নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ আর চালু না করে যেগুলি আছে সেগুলিকে মান সম্মত করার চেষ্টা করা উচিৎ। আমার মতে দেশে এখন যে শতাধিক মেডিকেল কলেজ আছে তা আমাদের চিকিৎসকের প্রয়োজন আপাতত মিটাতে সক্ষম।

স্বাস্থ্য সেবা সুষ্ঠুভাবে দেয়ার জন্য এখন আমাদের কিছু বিকল্প পদ্ধতির কথাও চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে । আমাদের গ্রাজুয়েট ডাক্তাররা এখন যে সমস্ত কাজ করেন তার বেশ কিছুটা কিন্তু এখন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে করান যায় ।

উপরন্তু যে সংখ্যক ডাক্তার তৈরী হচ্ছে তার সুষ্ঠু বন্টনও হচ্ছে না। বেশীর ভাগ ডাক্তারই শহরের বাইরে নিয়ে যেতে চান না। যারা যান তারাও সেখানে কাজ করার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় কিছুদিন পরে হতাশ হয়ে আবার নত এসে ভীড় জমান। পদায়ন, বদলী ও উচ্চশিক্ষার নীতিমালা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং নতুন চিকিৎসকদের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষনের দিকে যৰ্থাথ নজর দিতে হবে। নয়ত স্বাস্থ্যখাতে আমাদের এই অর্জন আমরা ধরে রাখতে পারব না। বিদেশ থেকে যে সমস্ত চিকিৎসক আমাদের দেশে আসেন বিশেষ করে যারা পরীক্ষক হিসাবে আসেন তারা সকলেই আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতার কথা জোর গলায় বলে গেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার যোগসূত্র গভীর। আপনারা অনেকেই জানেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ায় আগে এই ক্যাম্পাস IPGMR (Institute of Postgraduate Medicine & Research) নামে পরিচিত ছিল। ঐ প্রতিষ্ঠানের আমি আমার কর্মজীবনের অর্ধেকেরও বেশী সময় অধ্যাপক হিসেবে ও শেষের ৭ বৎসরের অধিক সময় পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর আমরা সবাই অত্যন্ত খুশী হয়েছিলাম যে এই ধরনের একটা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সমস্ত চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পরীক্ষার মান এবং মেডিকেল ডেন্টাল কাউন্সিলের সাথে বসে একযোগ একটা উন্নত, মানসম্মত, জনমুখী কারিকুলামের মাধ্যমে দেশের জন্য উপযুক্ত সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরী করবেন। এই আশা কেবলমাত্র আংশিকভাবে পূরণ হয়েছে। সাধারণ মেডিক্যাল কলেজগুলি এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তদকির বাইরে। কোন কারিকুলামের খুব বেশী পরিবর্তন এখনও হয় নাই। উপরন্তু দেশে দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের প্রয়োজন কত এবং সেটা কিভাবে পূরণ করা হবে সেই সম্পর্কে কোন সঠিক দিক নির্দেশনারও অভাব আছে।

আমার মতে দেশের যে কোনবিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হল তিনটি-

১। বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স চালু করা,

২। মানসম্মত পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং

৩। গবেষণা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইদানীং MD/MS Course এ Residency প্রোগ্রাম চালু করেছে এবং তাদের অঙ্গীভূত অন্যান্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেও এই ধরনের কোর্স চালু করে তার তদারকির ব্যবস্থা নিয়েছে। এটা একটা অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ । তবে আমার মনে হয় তদারকি এখনও দুর্বল। এটাকে জোরদার করতে হবে। কিছু কিছু বিষয় আছে যা ভাল চিকিৎসকদের তৈরী করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই বিষয়গুলি সাধারণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে চালু করা সম্ভব নয় কারণ এই সমস্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামো নাই । আমার মতে বি.এস.এম.এম.ইউ. এই ধরণের কিছু কোর্স স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শুরু করতে পারে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, Medical Genetics, Medical Statistics, Epidemology, Teaching Methodology, Social & Biomedical Research Methodology, Communication Skill ইত্যাদি। এমনকি আমি মনে করি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে English Language এর উপর একটা কোর্স চালু করা উচিৎ। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশুনা করেন এবং পরীক্ষা দেন ইংরেজীতে অথচ তাদের অনেকেরই ইংরেজী জ্ঞান ভাল নয়। ফলে তারা ভাল পাঠ্যপুস্তক না পড়ে নোট বই পড়ার দিকে বেশী আগ্রহী হয়ে পড়েন। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিষয় নিয়ে কিছুটা চিন্তা ভাবনা করবেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক অবস্থায় আছে গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয় কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে খুব একটা এগিয়ে যেতে পারে নাই। তবে এটা মনে রাখতে হবে ভাল গবেষণা ব্যয়বহুল এবং গবেষণায় মানুষকে নিয়োজিত রাখতে হলে যথার্থ বেতন ও মর্যাদা দিতে হবে। বি.এস.এম.এম.ইউ. মত প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব একটি রিসার্চ ডিভিশন থাকা উচিৎ যারা এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের সাথে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের

সাথে একযোগে (Collaborative Research করার ব্যবস্থা নিতে পারে। গবেষণা মান ভাল হলে অন্যান্য জায়গা থেকেও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। বিদেশে অনেক Foundation ও ঔষধ কোম্পানী তাদের গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেন । যার ফলে সেখানে রিসার্চের টাকার খুব একটা অভাব হয় না। তবে সেই পর্যায়ে যেতে হলে অবশ্যই দক্ষ গবেষক তৈরী করতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মধ্যে গবেষনার জন্য আলাদা Faculty সৃষ্টি করে গবেষণার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ।

এখন যাদের জন্য আজকের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন তাদের উদ্দেশ্যে দু’চারটি কথা বলব। পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে তোমরা সনদ নিতে এসেছ । তাই তোমাদেরকে পুনরায় উষ্ণ অভিনন্দন। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে জীবনের অনেকটা সময় পড়াশুনা ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করে তোমরা আজ সফলকাম হয়েছ। কিন্তু একটা জিনিষ ভুললে চলবে না। যে এই লক্ষ্য অর্জনে অন্যেরও যথেষ্ট অবদান আছে। যেমনঃ তোমাদের পিতা-মাতা, স্ত্ৰী-স্বামী, সন্তান-সন্ততি। তাদের সেই প্রচেষ্টার স্বীকৃতিও তোমাদেরকে দিতে হবে। অনেকে টাকা-পয়সা দিয়ে, কেউ কেউ সময় দিয়েও অনেকে তোমাদের দায়িত্ব অনেকটা ঘাড়ে নিয়ে তোমাদের জন্য পড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাদের জন্যও আজ খুবই আনন্দের দিন এবং এই দিনে তাদের এই অবদান ভুললে চলবে না। বিশেষ করে তোমাদের ছেলেমেয়েরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে তোমাদের সাহচার্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাদের দিকে নতুন করে মনযোগ দিতে হবে। চিকিৎসা শাস্ত্রের যে কোন শাখায় উৎকৰ্ষ সাধন করতে হলে কেবল পরীক্ষায় পাশ করে সনদ পাওয়াটাই যথেষ্ট নয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার পথে এটা তোমাদের প্রথম পদক্ষেপ। এই সনদ তোমাকে তোমার পছন্দমত বিষয়ে চিকিৎসা করার অধিকার দেয় কিন্তু কোন অবস্থায়ই তোমাকে বিশেষজ্ঞ বানায় না। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেখানে এই স্নাতকত্তের ডিগ্রি/ডিপ্লোমা লাভ করার পরও চিকিৎসকরা অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানী সহকর্মীদের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু আমাদের দেশে সেই রকম সুযোগ নাই। তাই নিজের উৎকর্ষ সাধনের জন্য নিজেকেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বস্তুতঃ সফলতা অর্জন করতে হলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে সারা জীবনই পড়াশুনা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখতে হবে। আশা করি তোমরাও এটা থেকে বিচ্যুত হবে না। আমরা যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করি তখন আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি ও নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল খুবই কম। লাইব্রেরীতে নতুন বই ও জার্নাল পাওয়া যেত না। ইন্টারনেটের অস্তিত্ব ছিল না, কোন Audio-Visual Material তৈরী করার ব্যবস্থা ছিল না। আজকাল সবই তোমাদের হাতের কাছে। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তোমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে। আজকাল অনেক শিক্ষিত রোগী ইন্টারনেট এর মাধ্যমে তাদের অসুখ ও এর চিকিৎসা সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেই আসে তাই তাদের চিকিৎসা করতে হলে তোমাদেরকে তাদের চেয়ে অনেক বেশী জানতে হবে।

আজকালের সমাজ অনেকটা বস্তুবাদে বিশ্বাসী। মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের স্বচ্ছলতা, বাড়ি-গাড়ী ইত্যাদি চায়। চিকিৎসক সমাজও এর থেকে আলাদা নয়। তবে একটা জিনিষ মনে রাখতে হবে; সব কিছুতেই সময় লাগে। সৎ পথে উপার্জন এই দেশে চিকিৎসকদের মত খুব কম মানুষই করে। কেবলমাত্র টাকা রোজগারের জন্য দিবা-রাত্র বিরামহীন কাজ করা বা অস্বচ্ছ উপায়ে টাকা রোজগার করা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।

প্ৰবাদ আছে যে, আমাদের দেশের অনেক চিকিৎসক সুর্যাস্ত বা সূর্যোদয় কোনটাই দেখেন না। কখন রোগী দেখা শুরু করবেন কখন শেষ করবেন তারও ঠিক নাই। তাই তারা পরিবার পরিজন বিশেষ করে ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে মানসিক ভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন যার ফলে ছেলে মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই রোগী দেখার সময়টা কমিয়ে বেশ কিছুটা সময় পরিবারকে দিতে হবে। পড়াশোনা ও বিনোদনের জন্য বেশ কিছুটা সময় আলাদা করে রাখতে হবে। বিনোদের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। এই বিনোদন হতে হবে পরিবার পরিজনদের সান্নিধ্যে সময় কাটানো ও পারিবারিক বন্ধনকে আরও জোরদার করা। দালাই লামা বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের ভাচিৎ বৎসরে অন্ততঃ ১বার একটি নতুন জায়গায় ভ্রমণ করা। সাথে সাথে এই ধরণের বিরতি নিলে দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমী থেকে রেহাই পেতে পারবে ও পরবর্তিতে পুনরায় নতুন উদ্যমে কাজ করার উসাহ পাবে।

আমার নিজের জীবনই কিন্তু এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে। আমার পেশাগত জীবনে প্রথম থেকেই আমার স্ত্রী ও আমি ঠিক করেছিলাম যে বৎসরে অন্ততঃ ১ মাস আমরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবো না। এই নিয়মটা আমরা কিন্তু এখন পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। আজ এতদিন পরে পিছনে তাকিয়ে মনে হয় যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুবই যুক্তিযুক্ত হয়েছে। এই আমাদের পারিবারিক পরিবেশ ভাল রাখার জন্য ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য অত্যন্ত ভাল অবদান রেখেছে বলে মনে করি।

তাই জীবনটাকে কিছুটা ছক কেটে নিতে হবে । কাজের ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েও কিভাবে একটা পরিপূর্ণ, সফল, শান্তিময় জীবন যাপন করা যায় সেটা শিখতে হবে এবং চর্চা করতে হবে। ভাল চিকিৎসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে আমাদের আরও কিছু অতিরিক্ত গুন থাকতে হবে। রোগীদের জন্য সহমর্মিত থাকতে হবে। কেবল মাত্র সহানুভূতি দেখানোই যথেষ্ট নয়। রোগীরা অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে অথবা অদ্ভুত আচরণ করে। এতে ধৈৰ্য্য হারালে চলবে না। তাকে প্রকৃত অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে । নিজেদের Ego টা কমাতে হবে। চিকিৎসকরা ভগবান নন। ভুলত্রুটি হবেই সেটাকে স্বীকার করে নিতে হবে । এবং এই ভুল গুলাকে পর্যালোচনা করে আবার নতুন করে শিখতে হবে। Professional Jealousy পরিহার করে Health Competition এর দিকে যেতে হবে। শেষ কথা আমাদের Profession এ অনেক ব্যস্ত হয়ে গেলেও নিজেদের জন্য কিছুটা সময় হাতে রাখতে হবে। জীবনে রোগী দেখা আর অর্থ উপার্জন করাটাই শেষ কথা নয়। আয়ের টাকাটা সঠিকভাবে ব্যয় করে নিজের পরিবারের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে হবে। আমি আবারো বলবো তোমরা তোমাদের সন্তানদের দিকে নজর দিবে, তাদেরকে সাহচর্য দিবে, ভাল কাজ করতে উৎসাহিত করবে। তাহলে তারা সমাজের অনেক ধরনের অপরাধের ফাঁদে পা দিবে না।

আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমি সত্যিই দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি টাকা-পয়সা, সহায় সম্পত্তির চেয়ে ছেলে মেয়ের পড়াশোনা করানোর, Moral Value শেখানো এবং সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মূল্য অনেক বেশী। একমাত্র সুস্থ জীবন ধারার মাধ্যমে সমাজের চলমান অশুভ এবং দ্রুত অবক্ষয় বন্ধ করা সম্ভব এবং এই ব্যাপারে দেশের একজন। সচেতন নাগরিক হিসাবে তোমরা যর্থাথ দায়িত্ব পালন করবে এটাই আমার আশা । তোমরা সবাই সফল চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এর সাথে সাথে নিজেকে ও পরিবারকে সুস্থ জীবন ধারায় নিয়ে যাবে এই কামনাই করি। দেশের জনসাধারণকে তোমাদের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা দিবে এটাই আজ সবার প্রত্যাশা। তবে তার সাথে সাথে নিজেরাও সুস্থ থাকবে এবং জীবনকে ভালভাবে উপভোগ। করবে এই কামনা নিয়েই শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।

অধ্যাপক টি.এ.চৌধুরী

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো: শেখ হাসিনা

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো: শেখ হাসিনা

মেডিভয়েস রিপোর্ট:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো। এসএসসি পরীক্ষা…

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া

মেডিভয়েস রিপোর্ট: একই সাথে তিন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন…

১০৭ চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার শুরু ১৯ ডিসেম্বর

১০৭ চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার শুরু ১৯ ডিসেম্বর

বিসিএস (স্বাস্থ) ক্যাডার/সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সিভিল সার্জন পদে পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট প্রণয়নের…

বিএসএমএমইউতে ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষিকার আত্মহত্যা

বিএসএমএমইউতে ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষিকার আত্মহত্যা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিক্ষিকা…

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও মূল বিষয়গুলোর…

হবু চিকিৎসকের পাশে দাড়ালেন চিকিৎসকরা

হবু চিকিৎসকের পাশে দাড়ালেন চিকিৎসকরা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সিরাজগঞ্জের বেলকুচির প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে আরিফুল ইসলাম। বাবা একজন চা…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর