ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

 ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগ

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট।


২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৬:৩৮ পিএম
পর্ব-০১

মায়ের গল্প

মায়ের গল্প

শেরপুরের ছনকান্দা ‘মিয়াবাড়ির’ আবুল হোসেন সাহেব তার ৫ মেয়েকেই বেছে বেছে তালুকদার বাড়িতে বিয়ে দিয়েছেন কেন জানি না। বড় মেয়ে আবেদা বেগম ওরফে পেয়ারা বেগমের বিয়ে হল সরিষাবাড়ির বিখ্যাত তালুকদারবাড়িতে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন তালুকদার কলকাতায় ‘বড় দারোগা’ ছিলেন বলে বাড়ির নাম ‘দারোগাবাড়ি’ও। অল্প বয়সে এই বাড়ির ছোট বউ হয়ে এসে যেন অথৈ সাগরে পড়ে গেলেন আমার মা। বিশাল পরিবারের এত আত্মীয়স্বজন এবং নানা নিয়মকানুনের বেড়াজালে রীতিমত হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। সবার উপরে আমার আব্বার বোহেমিয়ান স্বভাব। আব্বার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পরবর্তীতে নান্দিনা স্কুল ও আনন্দমোহন কলেজে পড়াশুনা করলেও নেশা ছিলো নাটক আর গান। বিষয় সম্পত্তির তেমন খোঁজ খবর রাখতেন না। পরে শিক্ষক হিসেবে থিতু এবং সুনামের অধিকারী হলেও তাঁর মূল অবদান সরিষাবাড়ির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কর্নধার হিসেবে।

তাই আমার মাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন জটিল পরিবেশেও অদৃশ্য একটা ছাতার ছায়া অনুভব করতে পারতেন। আমার জন্মের আগের বছর দাদার আকস্মিক মৃত্যু মাকে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি ফেলে দেয়। আব্বা সংসারে মন দিলেও ততদিনে সহায় সম্পত্তির বেহাল অবস্থা। অল্প বয়সে আমার বড় ভাই সম্পত্তি রক্ষা ও উদ্ধারে মায়ের পাশে দাড়ান, নিজের উচ্চতর লেখাপড়া স্যাক্রিফাইস করে। কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক পরিবারে জটিল প্রতিকূল পরিবেশে প্রথম জীবনের কঠিন সংগ্রাম, বোহেমিয়ান স্বামী আর নয় ছেলেমেয়ের বিশাল সংসার সামলানোর তীব্র মানসিক চাপের কারণে তিনি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসার কোন ত্রুটি হয় নি। কিন্তু আমাদের মন্দ ভাগ্য। বছরে প্রায় ছয় মাস মা অস্বাভাবিক থাকতেন। কি যে কষ্টের সেই স্মৃতি। আব্বার এক নতুন রূপ দেখলাম। বোহেমিয়ান মানুষটি দুই যুগের বেশি সময় অসুস্থ আমার মায়ের সেবা করলেন কি অসীম ধৈর্যের প্রতিমুর্তি হয়ে। অসুস্থ অবস্থায় দিনের পর দিন মা কিছু খেতে চাইতেন না, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কাটাতেন।

সাতানব্বই সালের জুলাইয়ের শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে ভর্তি করাতে হল। দুই ডাক্তারের মা হিসেবে চিকিৎসকদের সর্বাত্নক চেষ্টা বিফল করে ৪ আগস্ট চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

মা যখন সুস্থ থাকতেন, তখন আমাদের সব দিনই ঈদের দিন। ছেলেমেয়েদের জন্য কি যে পাগল ছিলেন। ছেলেদের কেউ বাড়ি আসবে। আগের কয়েকদিন তোড়জোড় লেগে থাকতো। কত কিছু যে রান্না করতেন। অপুর্ব রান্নার হাত ছিলো তাঁর। আমার বউকে ছেলেমেয়ের কাছে আমার মায়ের রাঁধা পোলাউ- কোর্মার স্বাদের গল্প করতে শুনি। আমার মনে আছে শীতের সময় পিঠা- উৎসব লেগেই থাকতো। নিজেও ভালো পারতেন, ডেকে নিয়ে আসতেন এ কাজে বিখ্যাত ‘কালুর মা চাচী’ কে। সারা রাত ধরে পিঠা বানাতেন। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত রান্না ঘরে মায়ের পাশে ঘুর ঘুর করতাম। তেলের পিঠা ভেজে গরম গরম খাওয়াতেন। কলার পিঠা সকাল বেলায়, ঠাণ্ডা হলে। নারকেলের কুলি, দুধ- চিতই। আরো কত কি। কত হাঙ্গামা করে এসব আয়োজন করতেন।

আজ আমরা দুই ভাই ডাক্তার। এক ভাই সরকারী ব্যাঙ্কের ডিজিএম। এক ভাই জুট মিলের জিএম। বাকী দুইজন ব্যাবসা করেন। নয় ভাই বোনের ঘরে কত নাতি নাতনী। সেদিন মায়ের এক নাত্নীর বিয়েতে আব্বা, নয় ভাইবোন, নাতি-পুতিরা কত ফুর্তি করলাম। এর মাঝে হঠাত করে আমার মত সবারই হয়তো মনে হয়, মা থাকলে আজ কেমন করতেন। হে আল্লাহ, আমার মাকে তুমি জান্নাতবাসী করো।

আরও পড়ুন-

►মায়ের গল্প

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে