ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৮:২০

আমি চেয়েছি একজন ইমাম হোসাইন মামুন হতে

আমি চেয়েছি একজন ইমাম হোসাইন মামুন হতে

এবারের একুশে বই মেলায় বেরিয়েছে 'সময় যখন পক্ষে নেই'। লেখক ইমাম হোসাইন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ এর পঞ্চম বর্ষের তরুণ শিক্ষার্থী। নবীন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন আমাদের। তার গল্পটা শোনা যাক তাহলে।

লেখালেখির শুরুটা কিভাবে?

শুরু বলতে গেলে ছোট বেলায় পরীক্ষার খাতায় লিখা বাংলা রচনা থেকেই। মুখস্থ উত্তর লিখার চাইতে নিজের মতো করে লিখতেই পছন্দ করতাম সবসময়। মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষ থেকেই ফেসবুকে যে কোনো ঘটনা নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে করতে এক সময় গল্প লিখার দিকে মনোযোগ দেই।

আপনার প্রথম বই 'সময় যখন পক্ষে নেই' সম্পর্কে কিছু বলুন?

বইতে মধ্যবিত্তের জীবনধারা, সমাজে প্রচলিত কিছু ধারণা বা বিশ্বাস, মেডিকেল জীবনের কিছু ছায়া, ছাত্রজীবনের শেষ দিকে সময় ও অর্থের অভাববোধ এবং অবসর সময়ের জন্য সামান্য হাহাকার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছাত্রজীবনের এ শেষ ভাগটা অনেকের জন্যই প্রতিকূল সময়। সময়ের বিপরীত স্রোতে বসে বই লিখেছি এবং গল্পের পটভূমির সাথে মিল রেখেই বইয়ের নাম রেখেছি ‘সময় যখন পক্ষে নেই’। বইটি পাওয়া যাচ্ছে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ইতি প্রকাশনের ২৬৩-২৬৪ নাম্বার স্টলে।

সাবলীল ভঙ্গিমায় লেখা শব্দমালার ভেতরও পাঠক খুঁজে পাবে এক ধরনের চিন্তার খোরাক। কোনো লাইনে পাঠক হাসবে আবার কোনো লাইনে হারিয়ে যাবে ভাবনার অতল গহবরে। বইটিতে জীবনের বিভিন্ন সময়ে দেখা ও শোনা বিভিন্ন পটভূমি থেকেই গল্পগুলো রচিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক গল্পেরই রয়েছে একটি ছায়া ঘটনা। ‘সময় যখন পক্ষে নেই’ গল্পগ্রন্থে মোট এগারটি গল্প রয়েছে। তার মধ্যে একটি গল্পকে গল্প না বলে প্রবন্ধ বলাই শ্রেয়। সচেতন পাঠক পড়া মাত্রই বুঝে নেবেন লেখাটি নিজ বাবা মাকে নিয়েই লিখা। যার ভাব মধ্যবিত্ত যে কারোর সাথেই আংশিক বা পুরোপুরি মিলে যেতে পারে। এগারটি গল্প ছাড়াও রয়েছে পাঁচটি ‘ফ্ল্যাশ ফিকশন’ বা ‘এক লাইনের কথা সাহিত্য’।

নতুন লেখক হিসেবে কী কী প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন?

বাংলা বাজার নামক ভূ-খণ্ডে ‘নতুন লেখক’ মানে এক অসহায় গোষ্ঠীর নাম। তবে প্রকাশকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠলে আর খুব একটা বেগ পোহাতে হয় না বই প্রকাশের ক্ষেত্রে।

আর পাঠকের দিক হতে যে সমস্যার সন্মুখীন হতে হয় তা হলো সৌজন্য বা ফ্রি কপি। এ প্রথাটি একজন নতুন লেখকের সৃজনশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। গণহারে সৌজন্য কপি চাওয়া একজন লেখকের লেখালেখির আগ্রহকে গলাচিপে হত্যা করার মতোই। বই প্রকাশ করলে যদি কেউ না কিনে বিনামূল্যে চান তা লেখকের জন্য খুবই মনোকষ্টের কারণ। অথচ বই কেনা কঠিন কিছু না। আমার মনে হয়, বইমেলার ক্যান্টিনে গিয়ে যদি আমরা তিনশ টাকার লুচি-মাংস খেতে পারি তাহলে একশ বা তিনশ টাকার একটা বইও আমরা কিনতে পারি।

ইদানীং তরুণ সমাজ বই পড়ার ক্ষেত্রে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে। যা একটা সময় বেশ কমে গিয়েছিলো। একজন তরুণ হিসেবে এর কারণ কী বলে মনে হয় আপনার কাছে?

ব্যাপারটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। আমি নিজেও যেহেতু তরুণ, সেহেতু আমার অবস্থান থেকেই বলবো এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। শুধুমাত্র প্রচারের অভাবে অনেক লেখকের নামই আমাদের কানে বা চোখে এসে পৌঁছায় না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সে খরা ঘুচিয়েছে। যেমন ফেসবুকে বিভিন্ন জনের লেখা পড়েই আমরা বুঝতে পারি কে কেমন লিখেন বা লিখছেন। ওই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই আমরা অনেকের বই কিনছি। ফলে পুরাতন লেখকদের বইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে নতুন লেখকদের বইও।

অদ্যাবধি সব মেলাতেই তরুণদের পদচারণা বেশি ছিলো, আছে এবং থাকবে আশা করি। ‘সাহিত্যবিমুখ প্রজন্ম’- এ তকমা মনে হয় না এখনকার জন্য প্রযোজ্য।

বই বের করার পেছনে অনুপ্রেরণা কার?

সত্যিকারার্থে বই বের করার পেছনে অনুপ্রেরণার চাইতে পরামর্শই বেশি শোনা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে কিছু করতে গেলে আমরা খুব কমই অনুপ্রেরণা পাই। বেশির ভাগক্ষেত্রেই শুনি জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য। একঘণ্টার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের চাইতে এক মিনিটের অনুপ্রেরণাকেই বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে আমার কাছে। বইয়ের ব্যাপারে সকল কাজ সম্পন্ন করেই জানিয়েছি যে, বই প্রকাশ করতে যাচ্ছি। প্রকাশক প্রাপ্তির ব্যাপারে আমায় সহযোগিতা করেছেন আরেক লেখক, প্রিয় ভাই ডা. মহিউদ্দিন কাউসার। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা প্রকাশ করছি।

একজন নবীন লেখকের কখন বই বের করা উচিত?

নিয়মিত লেখালেখি করার অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা না থাকলে সতেরো-আঠারো বছর বয়সে হুট করে বই লেখার প্রতি না ঝুঁকাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ব্লগ, প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাগাজিন, জাতীয় দৈনিক ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মে লেখার অভিজ্ঞতা থেকে একটা পাঠক বলয় তৈরি হলেই লেখাকে মলাটবদ্ধ করার কাজে হাত দেওয়া যায় বলে মনে করি। সবচাইতে ভাল হয় যদি আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠীদের বাইরেও অচেনা, অজানা কেউ একজন লেখকের লেখা পড়তে আগ্রহী হয়।

অটোগ্রাফ দিতে কেমন লাগে?

শুরুর দিকে একটু আধটু হাত কাঁপছিলো, হাত ঘেমে ছিলোও একটু একটু। হাতের সাথে ঘেমেছে পুরো শরীর। মেলার মাঝপথে এসে তা একটু কমেছে। আমার বই মেলার প্রথম দিন থেকে উপস্থিত থাকলেও আমি উপস্থিত হয়েছি মেলার ষোলোতম দিনে। এর আগে সিলেটে বইমেলার শেষ চারদিন (১২-১৫ ফেব্রুয়ারি) থাকায় অটোগ্রাফভীতি একটু কমেছে। তার আগে প্রি-অর্ডারের বইতে অটোগ্রাফ দেয়ার সময়ও সামান্য ইতস্ততবোধ করেছিলাম। এখন অবশ্য একটু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

ব্যক্তি ইমাম হোসাইন মামুন সম্পর্কে বলুন।

নামতো আপনারাই বলে দিলেন। জন্ম ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায়। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি নিজ এলাকায় বখতার মুনশি ফাজিল মাদরাসায়। মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছি ফেনীর আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসায়। উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ সম্পন্ন করেছি বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা থেকে। বর্তমানে এমবিবিএস চূড়ান্ত বর্ষে অধ্যয়নরত আছি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে। বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিলো ছেলে ডাক্তার হবে। ছেলে ডাক্তার হচ্ছে। আমার স্বপ্ন সুনির্মল বসুর মতোই- ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’।

ইদানীং নতুন লেখকদের মধ্যে ভাল লিখার প্রবণতা দেখা দিলেই তাকে ‘এ যুগের হুমায়ূন আহমেদ’ তকমা দিয়ে দেন অনেকেই। আমি কখনো হুমায়ূন আহমেদ বা জহির রায়হান হতে চাইনি। আমি চেয়েছি একজন ‘ইমাম হোসাইন মামুন’ হতে।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত