অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ


১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১২:৫২ পিএম

অপবাদ

অপবাদ

ডা. জবা যখন মেয়েটির গায়ে হাত দিল, আঁতকে উঠল। ঠান্ডা হয়ে গেছে। নিজে পালস দেখতে দেখতে সাথে সাথেই সহকারীকে বি পি দেখতে বলল। কপালে শিশির বিন্দুর মত ফোটা ফোটা ঘাম। অবস্থা যে খারাপ বুঝতে আর বাকী রইল না। হ্যাঁ পালস, বি পি দু'টোই সঙ্কটাপন্ন। এবডোমেন টেন্স, টেন্ডার।চেহারা ফ্যাকাসে। হঠাৎ ভীষন পেট ব্যাথা হবার পর থেকে এই অবস্থা। টিপিক্যাল একটোপিকের ফিচার। এত ছোট্ট একটি মেয়ে, মাত্র সতের বছর বয়স, বিয়ে হয়নি, এই বয়সে এইসব ছি! জবা বিটা এইচ সি জি টেস্ট করাতে পাঠাল। ইমারজেন্সী আল্ট্রাসনো রিপোর্ট বলল, পেট ভরে আছে ফ্রী ফ্লুইডে। মানে ইন্টারনাল হেমরেজ। প্রফেসর মাত্র চলে গেলেন আর রোগীটাও এল। টেলিফোনে কথা বলে জবা তড়িৎগতিতে অপারেশনের সব ব্যবস্থা করে ফেলল।

ব্লাড ট্রান্সফিউশন শুরু হয়ে গেছে। একটু রিসাসশিটেড করেই অপারেশন শুরু করবে। কিন্তু জবার কাছে একটি বিষয় খটকা লাগল। প্রশ্ন করে একটোপিকের মত সব সিম্পটম পেলেও এক্সপোজারের হিস্ট্রী এবং মাসিক বন্ধের হিস্ট্রী মেয়েটি কিছুতেই দিল না। পি ভি করতে গিয়েও দেখল হাইমেন সম্পূর্ন ইন্ট্যাক্ট। কি হতে পারে? তারপরেও মাকে একটু কথা শুনিয়ে দিল। মেয়ে কোথায় কি করে একটু খোঁজ রাখতে পারেন না? মেয়ের মার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল।

৫ম বর্ষের ছাত্র জামান এসেছে। ওর ব্লক প্লেসমেন্ট। ওকে বসিয়ে দিল ইন্টার্নী রবির সাথে সহযোগীতা করতে। জামান ছেলেটা একদম পড়াশোনা করে না। বড়লোকের ছেলে। মাথায় ধান্দা অন্যরকম। পড়াশোনার নাকি দরকার নেই।

ডা. ফারহানা ইসলাম জবা উর্ধ্ব অধ: মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সি এ। খুবই মেধাবী একটি মেয়ে। স্কুল কলেজে ফার্স্ট ছাড়া কখনও রেজাল্ট হয়নি। কিছুতেই ডাক্তারী পড়বেনা। তাই মায়ের চাপে যেন তেন একটি পরীক্ষা দিল। চেষ্টাই চলছিল যেন কোথাও চান্স না হয়। আর মনে মনে প্রাইভেট মেডিকেলগুলোকে অভিশাপ দিত। কারন এই মেডিকেলগুলোর জন্যই অনেকেরই বাবা মার চাপানো ইচ্ছের কাছে নিজের ইচ্ছেকে বলি দিতে হয়। জবার বেলাতেও তাই- ই হোল। বাড়ীর কাছে বলে এই মেডিকেলে। এটা কেমন নাম কলেজের? উর্ধ্ব অধ:? মালিকের ব্যাখ্যা হোল এত এত মেডিকেল কলেজ আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিড়ে নামের একটু সঙ্কট পরে গেছে। পূর্ব পশ্চিম, উত্তর দক্ষিন, উত্তর কোনা (নর্দার্ন), পূর্ব কোনা (ইস্টার্ন) সবতো শেষ।

জবার মা-ও খুব ভাল স্টুডেন্ট ছিল। স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিল। ডাক্তারী পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেবারে ফিফথ গার্ল রংপুর মেডিকেলে চান্স পেলেও সে কোথাও চান্স পেল না। জবার মা খুব আফসোস করে। সেদিন যদি এমন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থাকত তাহলে আজ সে এবং তারমত ছেলেমেয়ের অনেকেই ডাক্তার হতে পারত। মার এই আফসোস ঘুচাবার জন্যই জবার ডাক্তারী পড়া। ওর মার একই কথা। মেডিকেল ধুয়ে কি তুমি পানি খাবে? তুমি শুধু এম বি বি এস সার্টিফিকেটটা নিবে। ডাক্তারীর আসল খেলাতো তারপরে শুরু। সেখানে তুমি দেখিয়ে দিবে। হোলও তাই। একচান্সে এফ সি পি এস পার্ট ওয়ান পাশ। কিন্তু এম বি বি এস এ যে কি পরিমান ঘাটতি ছিল তা বন্ধু বান্ধবের সাথে আলোচনায় বুঝতে পেরেছে। নিজ যোগ্যতায় পার হলেও কষ্ট হয়েছে খুব। প্রফেসর বরকতউল্লাহর খুব প্রিয় পাত্রী জবা। স্যারের সাথে থেকে কাজও শিখছে ভাল।

মেয়েটির ব্লাডপ্রেসার আস্তে আস্তে বাড়ছে। ইউরিন আউটপুটও ভাল। আরও একটা ব্লাড না দিয়ে এনেস্থেটিস্ট এনেস্থেসিয়া দিবে না। সিস্টোলিক প্রেসার ১০০ নিদেনপক্ষে ৯০ করে নিবে।
জবা জামানের ইন্টারভিউ নিচ্ছিল। সে যে পড়াশোনা করে না বা পারে না, তাহলে পাশ করে কি করে? জামানেরও একই অবস্থা। বাবার ইচ্ছাতে মেডিকেল। তবে বিষয়টা একটু ভিন্ন। জামানের দু'টো কাজিন একজন বুয়েট থেকে পাশ করা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়র আর একজন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল থেকে পাশ করা ডাক্তার। দু' জনেই নিজ নিজ পেশার বেহাল অবস্থা দেখে ব্যবসা কে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। ডাক্তার ভাইটির পোস্টিং ছিল উপজেলায়। ওর বন্ধুটি গ্রামের মাস্তানের হাতে সামান্য প্যারাসিটামল বিনা কারনে দিতে আপত্তি করায় যে মার খেল তা দেখেই ও যে চম্পট দিয়েছে আর যায়নি।তাতে জামানের বাবার খুবই অসুবিধে হয়ে গেছে। ব্যবসা করবে জামান আর ওরা করবে ডাক্তারী মোক্তারী। এখন এইসব অতি শিক্ষিত ছেলেগুলো ব্যবসা করলে একজন বি এ পাশ এম এ পাশ ব্যবসায়ী হিসেবে জামানের ফিল্ড খারাপ হয়ে যাবে না? যেখানে আজকাল অনেক পি এইচ ডি হোল্ডাররা ব্যবসা করে। তাই একটি উচ্চতর ডিগ্রী দরকার। আর সেটা মেডিকেলের মত সহজলভ্য আর কোথাও নেই।

জামানের সহজ স্বীকারোক্তি। নব্য পদ্বতি না থাকলে ওর মত ছেলে এ প্লাস পেত না। সৃজনশীল প্রশ্নে নাকি পোলাপান খাতা কালি দিয়ে ভরে দিলেই নাম্বার। গরুকে চিনে যে গরু লিখে সে যে নাম্বার পাবে, যে না চিনে গাধা লিখে সেও সেই একই নাম্বার পাবে। নব্য পদ্বতি প্রনয়নের লোকেরা শুধু গনতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, সমাজতন্ত্রেও বিশ্বাসী। তার শুরুটা এই সার্টিফিকেট দিয়ে। তারপরেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে কি দরকার বুঝিনা।

উর্ধ্ব অধ: এর মালিক নাজীব আংকেলের জন্য বাকীটা। ৩২ লক্ষ টাকা দিয়ে ভর্তির সময়েই আংকেলের সাথে কথা হয়েছে রাস্তা যেন একমুখী এবং সন্মুখগামী হয়। বাইর হবার রাস্তাও যেন খোলা থাকে। আমি বলেই দিয়েছি ডাক্তারী করবনা, বাবার "জামান গান্ধা সাবান" এর ফ্যাক্টরিই দেখাশোনা করব।

-- জামান গান্ধা সাবান! সেটা আবার কি?
-- জানেন না? আলম পঁচা সাবান যে ওটাতো আমার মামার। বাবা বলল এমনই একটা নাম দেই। চলবে ভাল।

জানেন আপু আগের প্রিন্সিপ্যাল স্যার চলে গেছেন কেন?

-- নাতো।
-- স্যার একদিন নাজীবুল্লাহকে বলছিলেন যে কি ১০, ২০ পাওয়া পোলাপান নিচ্ছেন এরা ডাক্তার হবেই বা ক্যামনে আর ডাক্তারী করবেইবা ক্যামনে? আপনি কি পূনর্বাসন কেন্দ্র খুলে বসেছেন নাকি? উত্তরে বলল, " তাইতো। নয়তো আপনাদের পূনর্বাসন করতাম ক্যামনে"। পরেরদিনই স্যার রিজাইন করেছেন।

জবার ভীষন মন খারাপ হয়ে গেল। এইসব ছেলেমেয়েদের জন্য ওদেরকেও মানুষের ভ্রু কুঁচকানো দেখতে হয়।

প্রফেসরের সাথে কথা বলে জবা ওটিতে ঢুকল। পেট ভর্তি ক্লটেট ও ফ্রী ব্লাড। কিন্তু টিউবের কোথাও কিছু খুঁজে পেল না। শুধু ওভারীর এক জায়গায় ফাটা এবং ব্লিডিং হচ্ছে। এবডোমেন ক্লিন করে স্যারকে আবার ফোন দেওয়ালো।

-- স্যার এইটা ওভারীয়ান এক্টোপিক। ব্লিডিং হচ্ছে। ওভারী কি ফেলে দিব? 
-- তুমি না বলেছিলে মেয়েটা আনম্যারিড।
-- জ্বী স্যার।
-- খবরদার ওভারীতে হাত দিবে না।
-- স্যার হাততো লেগে যাচ্ছে।
-- যাবেইতো। ২-০ ক্যাটগাট বা ভিক্রিল দিয়ে বাইট দিয়ে দাও। খুব সফট থাকে তাই সাবধানে বাইট দিবে। প্রয়োজনে কটারী করবে।
-- এটা কি কেস স্যার? 
-- ফোন রেখে যা বলছি তাই কর। তোমরা তো হিস্ট্রী ভাল করে নাও না।
-- আচ্ছা স্যার।

পরেরদিন রাউন্ডে স্যার শুরুই করলেন গল্প দিয়ে। এক লোকের বউ এর পাতলা পায়খানা। মাঝরাতে বের হোল ডাক্তারের জন্য। একটা সাইনবোর্ড দেখে কলিং বেল বাজাল। ডক্টর ভদ্রলোক শুনে বললেন, " আমিতো ভাই ঐ ডাক্তারনা, আমি ইতিহাসের ডাক্তার।" স্বামী ভদ্রলোক ব্যর্থমনোরথ হয়ে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ ঘুরে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, " আচ্ছা বলেনতো ওর এই পাতলা পায়খানা হবার পিছনে ইতিহাসটা কি"?

তোমাদের কি রোগীর ইতিহাস নেবার জন্য ইতিহাসের ডক্টর লাগবে? ডা. বরকতউল্লাহ নিজেই হিস্ট্রী নেয়া শুরু করলেন। ইন্নোসেন্ট ফুটফুটে মেয়েটিকে কি অপবাদই না দিচ্ছিল। মাসিকের ডেট পার হয়নি এখনও। বিটা এইচ সি জি ও নেগেটিভ এসেছে। কি হতে পারে? রাপচার অব করপাস লুটিয়াম বা ওভারীয়ান রাপচার। যেটাকে বলে ওভারীয়ান এপোপ্লেক্সি। সাধারনত করপাস লুটিয়াম রাপচারে সব সময় ব্লিডিং হয়না। ব্লিডিং না হলে শুধু ব্যাথা থাকে এবং কনজারভেটিভ চিকিৎসায় ঠিক হয়ে যায়। যখন কোন ব্লাড ভেসেল টর্ন হয় তখন ব্লিডিং হয়। ব্লিডিং হলেই ব্যাথা এবং সব ফিচার একটোপিকের মতই। যেমন এই পেশেন্ট এবং সার্জারী অনিবার্য। তফাত হোল এটা সাইকেলের মাঝখানে বা শেষের দিকে হয়। মাসিক হবার সময়ের আগেই। কখনও মাসিকের ডেট দু'একদিন পারও হতে পারে। বিটা এইচ সি জি দিয়ে এক্সক্লুড করতে হবে। সাধারনত ওভারীয়ান টিস্যু ইনফ্লামেশনের জন্য যদি স্ক্লেরোটিক থাকে, বা ওভুলেশন ইনডাকশনের হিস্ট্রী থাকে তখন হয়ে থাকে। ফলিকলগুলো অনেক বড় হয়, অনেক ফ্লুইড থাকে। ফলিকল রাপচার হয়ে সেই ফ্লুইড পেটে পরলেই ব্যাথা হয়। ব্লিডিং হলে আরও ব্যাথা এবং জটীলতা। যদিও রেয়ার, রিপ্রোডাক্টিভ লাইফে ০.৫ থেকে ৩ পারসেন্ট পর্যন্ত হতে পারে।

জবা সব শুনে বলল, "হিস্ট্রীতো নিয়েছি স্যার এবং এই হিস্ট্রীই দিয়েছে। বিশ্বাস করিনি"।

প্রফেসর বললেন, " যাক পেশেন্ট ভাল আছে, এখন ওদেরকে স্যরি বল মিথ্যে অপবাদ দেবার জন্য। আচ্ছা তুমি রোগীর সাথে এত খ্যাচ খ্যাচ কর কেন"?

-- কই স্যার খ্যাচ খ্যাচ করলাম কই? 
-- সেদিন যে একটা একটোপিক এসেছিল সে রোগীর হাসব্যান্ডের সাথে রাগ করতে দেখলাম।
-- ও স্যার সেই ঘটনা যদি শোনেন। রাপচারড একটোপিক স্যালাইন আর ব্লাড লাগিয়ে ভোলা থেকে এই মদনপুর আসছে। লঞ্চে যে শেষ হয়ে যায় নাই তাইতো ভাগ্য। তার মধ্যে সে বলে অপারেশন করাবে না। ডি এন্ড সি করাবে। কিছুতেই কনসেন্ট দিচ্ছিল না। খ্যাচ খ্যাচের চেয়েও বেশী কিছু থাকলে তাই করতে হোত।
--- সেটা না হয় বুঝলাম। কিন্ত আমি ভাবছি অন্য কথা। গাইনী অবস এর সি এ মেয়েগুলো এইসব রক্তারক্তি ব্যাপার নিয়ে এত টক্সিক থাকে যে কেউ যদি পাত্রী হিসেবে ওদের কর্মক্ষেত্রে দেখতে আসত তাইলে আর বিয়া হইত না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে