কামারুজ্জামান নাবিল

কামারুজ্জামান নাবিল

ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৫:০৮ এএম

ক্যান্সার প্রতিরােধে আমাদের করণীয়

ক্যান্সার প্রতিরােধে আমাদের করণীয়

দিন-দিন ক্যানসারে আক্রান্তের পরিমাণ বেড়েই চলেছে বললে ভুল হবেনা। কেন এই দূরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আমরা যা খাচ্ছি তা কি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেনা অথবা আমাদের খাবারে কি পরিবর্তন আনা উচিত নয় যা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং ক্যান্সার প্রতিরােধক হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা কিভাবে ক্যান্সার প্রতিরােধ করতে পারি সে বিষয়ে নিচে তুলে ধরতে চাই।

১. সবজি ও ফল-মূলঃ আমাদের নিত্য দিনের খাবার আইটেমে সবজির পরিমাণ বাড়াতে পারি। সবজি হচ্ছে এন্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সার প্রতিরােধে সাহায্য করতে পারে। সাথে ফল-মূল বেশী খেতে পারি। গবেষণায় দেখা গেছে, ফল-মূল বিশেষ করে অন্ননালী, মুখের এবং স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে কাজ করে। ২ মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকাঃ গবেষনায় দেখা গেছে লাল মাংস বেশী পরিমাণে খেলে কোলন ও রেক্টোম ক্যান্সারে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আরেকটি বিষয়, মাংস কাবাব করে না খেয়ে পানি সহকারে রান্না করে খাওয়া উচিত। যেভাবে আমাদের দেশে বেশীরভাগ সময়েই আমরা খেয়ে থাকি। কাবাব বানাতে সরাসরি অধিক তাপেআগুনে পুড়ানাে হয় এতে হিটেরােসাইক্লিক এমিন। নামে এক রাসায়নিক যৌগের সৃষ্টি হয় যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ইরানের ইস্ফাহানের একশহরে গবেষণা করে দেখা গেছে অধিকহারে মাংসের কাবাব খাওয়ার ফলে সেই শহরে পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্তের পরিমাণ অধিক।

৩. রাইস ব্রানঃ সাধারণত ধান থেকে বাদামী একটি অংশ আলাদা করা হয়ে থাকে যা চালের তুষ হিসেবে পরিচিত। এতে রয়েছে আয়রন, সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, ভিটামিন A-E-B1B2-B5B6 রয়েছে। সাধারণত এটা সহকারে চাল খেলে ভাতে স্বাদের পরিমাণ কমে যায় তাই এমন চাল কিনে পাওয়া যায়না। সেক্ষেত্রে চালের তুষ কিনে আলাদাভাবে ভাতের সাথে অথবা রুটিতে মিশিয়ে। খাওয়া যেতে পারে। তবে কেনার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখা উচিত, এটি কেমন পরিবেশে সংরক্ষন করা হয়েছিল কারণ দূষিত পরিবেশে সংরক্ষিত থাকলে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

৪. প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ তেলঃ অলিভ ওয়েল যা জয়তুন নামে পরিচিত, বাদাম বাতিলের তেল, সরিষা বা ক্যানােলা তেল, সূর্যমুখী তেল ইত্যাদি প্রাকৃতিক উদ্ভিজ তেলের ব্যবহার রান্নার কাজে বাড়ানাে যেতে পারে।

ক. অলিভ অয়েলঃ অলিভ অয়েলে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট এবং ফ্যাটি এসিড, যা শরীরের জন্য উপকারী। এছাড়াও রয়েছে ফ্যানােলিক এন্টি অক্সিডেন্ট এবং ক্যানসার প্রতিরােধী উপাদান, যা কোলন, স্তন এবং ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরােধে সাহায্য করে।

খ. তিলের তেলঃ তিলের তেলে পলিস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড প্রচুর পরিমাণে রয়েছে সাথে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট ক্ষমতা। এছাড়াও রিবােফ্লাভিন, ফসফরাস, কপার, যেটা শরীরে শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এই তেল কোলন ক্যান্সারের প্রতিরােধক হিসেবে কাজ করে থাকে। গ, সরিষার তেলঃ সরিষার তেল হচ্ছে অলেয়িক এসিড, লিনােলেয়িক এসিড এবং আলফালিনােলেনিক এসিডে সমৃদ্ধ এছাড়াও এতে রয়েছে, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে। এই তেল স্তন ক্যান্সার প্রতিরােধে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘ. কুসুম ফুলের তেলঃ কুসুম ফুলের তেল স্বাদ ও রংহীন একধরনের তেল। কুসুম ফুল হচ্ছে এন্টি অক্সিডেন্ট, যা ক্যান্সার প্রতিরােধে কাজ করে। ঙ, সূর্যমুখী তেলঃ সূর্যমুখী ফুলের তেল হৃদরােগের ঝুঁকি কমায় সাথে কোলন ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

চ. মাছের তেলঃ এই তেল স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ১৪শতাংশ কমাতে পারে।

৫. মাশরুমঃ ঔষধ হিসাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত রােগীদের চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি এন্টি অক্সিডেন্ট,এণ্টি-ডায়াবেটিক, এন্টি টিউমার, এবং এন্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

৬. সােয়ে ইসভােনােঃ যা উদ্ভিদ ইস্ট্রোজেন নামেও পরিচিত। এটি বিপাকীয় জৈবিক ফাংশান, প্রােটিন সংশ্লেষণ এবং ক্যান্সার কেমাে প্রতিরােধক এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

৭. খেজুরঃ আমরা সাধারণত রমজান মাসে খেজুর খেয়ে থাকি যদিও চাইলেই সারা বছর আমরা এই ফল খেয়ে অনেক রােগ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুরের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলাে, এটি ক্যান্সার প্রতিরােধক হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও স্নায়ুবিক শক্তি, হজমশক্তি বর্ধক, অ্যানিমিয়া রােগ থেকে মুক্তি পেতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তাই প্রতিদিন একবেলা খাবার শেষে অথবা সকালে তিনটি করে খেজুর খাওয়া যেতে পারে।

৮. চকলেটঃ চকলেটে রয়েছে ফ্লাভিলে যা এন্টি অক্সিডেন্ট এবং যেটা কোষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে থাকে। কেননা ধ্বংসপ্রাপ্ত কোষ ক্যান্সার সৃষ্টিতে সাহায্য করে থাকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খাওয়ার পরিমাণ সে সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।

৯. লবণঃ খাবারে বেশি লবণ পরিহার করা উচিত।

১০. মধুঃ মধুতে এন্টি অক্সিডেন্ট, এন্টি ব্যাকটেরিয়াল, এন্টি ফাংগাল উপাদান রয়েছে। মধুমুখের ক্যান্সারের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।

১১. সিগারেট পরিত্যাগ করা যা মারাত্মকভাবে ফুসফুস ক্যান্সার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় সাথে শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর।

১২. মসলাঃ দারুচিনি, হলুদ, জিরা, গুঁড়া মরিচ, আদা ইত্যদি।

ক. দারুচিনি দারুচিনিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফাইবার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ এবং কয়েক ধরনের এসেনশিয়াল অয়েল। দারুচিনি লিউকোমিয়া ও লিম্ফোমা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। থাকে। তাই সুযােগ পেলে দারুচিনি গুঁড়া মেশানাে চা নিয়মিত খেতে পারেন। দারুচিনি ক্যান্সারে। প্রতিরােধে সিলভার বুলেট হিসেবে পরিচিত।

খ. হলুদ হলুদের মধ্যে পলিফিনল কারকিউমিন উপাদান রয়েছে। যা প্রস্টেট, মেলানােমা, স্তন, লিউকোমিয়া ক্যান্সারের প্রতিরােধক হিসেবে কাজ করে।

গ. জিরাঃ জিরাতে এন্টি অক্সিডেন্ট সাথে থাইমােকুইনােন উপাদান আছে। এটি প্রস্টেট ক্যানসারের প্রতিরােধক হিসেবে কাজ করে।

ঘ. আদাঃ ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে আদা উপকারী যা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে ভূমিকা রাখে।

১৩. রাতে ঠিকমত ঘুমানােঃ রাতে নাইট ডিউটিরত নার্সদের উপর এক গবেষণা করে দেখা গিয়েছে যারা রাতে কাজ করেন তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশী। আমাদের শরীরে মেলাটোনিন নামক এক হরমােন নিঃসৃত হয়, যে হরমােন নিঃসরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছায় রাত ১১টা থেকে ভোঁর ৪টার মধ্যে। রাতে যারা নিঘুম থাকেন তাদের এই হরমােন দিনেরবেলা ঘুমালেও কম পরিমাণে নিঃসৃত হয়ে থাকে। যা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যদিও সম্প্রতি কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটার সাথে ক্যান্সারের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তবে এটা নিয়ে আরাে গবেষনার অবকাশ রাখে।

১৪. কাঁচের পাত্ৰঃ গরম দুধ বা গরম কোন খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে সংগ্রহ না করে কাঁচের পাত্রে সংগ্রহ করা।

১৫. শারীরিক ব্যায়ামঃ যারা শারীরিক ব্যায়াম করেন না তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে। এজন্য নিয়মিত হাঁটা বা ৩০ বা ৪০ মিনিট সাইকেল চালানো যেতে পারে। অথবা হালকা ব্যায়াম।

 

 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে