ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২৪, মে ২০১৮ - ১০, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ফাতেমা খান

সৌদি প্রবাসী চিকিৎসক


পর্ব:০২

প্যারেন্টিং স্টাডি: প্রি-টিনেজার ও টিনেজার

Stephen Covey এর লিখা The 7 Habits of Highly Effective Families বইটা যখন পড়ি তখন তার প্রত্যেকটা কথা আমাকে যাদুর মত টানে। প্রায় ৩৮০ পাতার বইটার দু পাতা এগোই তো চার পাতা পিছিয়ে আবার পড়ি। ইচ্ছে করে পুরো বইটা এক চুমুকে গিলে ফেলি। অসাধারণ একটা বই!

নয় সন্তানের জনক এই লেখক বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে বাচ্চাদের সাথে কৌশলে সুঅভ্যাস গুলো গড়ে তোলার সহজ পথ বলে দিয়েছেন।

লেখকের টিপস এন্ড ট্রিক্স আসলে যে কত কাজে লাগল তা বাস্তবে দেখলাম, আমার ছেলেটাকে যখন সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ফজর নামাজ পড়ে স্কুল যাওয়ার অভ্যাস করালাম। যদিও শীতকালে আমার ঘুমকাতুরে ছেলেটার জন্য কাজটা খুব সহজ ছিল না। 

ভেবেচিন্তে জাওয়াদের সাথে একটা চুক্তি করলাম।দুটো কাজের জন্য প্রতিদিন তার জন্য দুই রিয়াল বরাদ্দ থাকবে, কিন্তু প্রতিদিন সে টাকা হাতে পাবেনা। উইকেন্ডে পুরো সপ্তাহের সঞ্চয় তার হাতে আসবে সাথে থাকবে আরো ছয় রিয়াল বাড়তি। কিন্তু যদি সে দিনের টাকা দিনে নিয়ে নেয় তাহলে বাড়তি টাকাটা পাবেনা।

প্রথম প্রথম কাজটা কঠিন ছিল কিন্তু এভাবে শুধু দুই সপ্তাহ...

তারপর থেকে ছেলের অভ্যাস হয়ে গেছে। ছুটির দিনেও তার ভোরবেলা গোসল আর নামাজ বাদ যায়না আলহামদুলিল্লাহ।

বোনাস হিসেবে আরেকটি ছোট অভ্যাসও কিন্তু তৈরী হয়ে গেল, তা হল টাকা সঞ্চয়ের অভ্যাস। প্রতিদিন তাকে দুই রিয়াল দেওয়া হলে সেদিনই সে হয়ত বিনা প্র‍য়োজনেই খরচ করে ফেলত, কিন্তু উইকেন্ডে অনেকগুলো টাকা একসাথে পাওয়ার পর আমি তাকে বলেছি ওর আর্ট বা পেইন্টিং এর জিনিসগুলো যেন সে ইচ্ছেমত কিনে নেয়। সঞ্চয়ের বা মিতব্যয়ীতার যে বীজটি আপনি এখন বুনে দিলেন তা কিন্তু থাকবে আজীবন।

প্রিটিনেজারদের মাঝে একটু একটু করে দায়ত্ববোধ জাগিয়ে দেওয়া উচিত যা শুনতে বা বলতে খুব সহজ হলেও করাটা বেশ কঠিন। আমার বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আমি পয়েন্ট কালেক্ট করার সিস্টেম চালু করেছি। যেমন: যেকোন একটা কাজের জন্য ১০ পয়েন্ট করে পাবে। যদি ছোট ভাইকে কোন কাজে (যেমন: হোময়ার্ক করা, খাওয়া, ড্রেস আপ ইত্যাদি) সাহায্য করে তাহলে আরো ১০ পয়েন্ট যোগ হবে। সপ্তাহ শেষে পয়েন্ট সব যোগ করা হবে, অত:পর মিনি পার্টি বা ছোট উপহার দেওয়া হবে। এতে তাদের উদ্যমও বেড়ে যায়। তবে কখনো আবার মুডের উপর ও নির্ভর করে। সব দিন একরকম হবেনা এটাই স্বাভাবিক।

দায়িত্বের শুরুটা হয় তাদের নিজেদেরকে দিয়েই। যেমন নিজের কাপড়, জুতা, বইখাতা, টেবিল চেয়ার গোছগাছ করা থেকে শুরু করে খাবার পর নিজের প্লেট গ্লাস টা ধুয়ে জায়গামত রেখে দেওয়া... সোজা কথায় আত্মনির্ভরশীলতা অভ্যাস করানো। একদিনে বা একবারে সব কাজ করতে না বলে একেকদিন এক একটা কাজের ট্রেনিং দেওয়া হলে ওরা কাজে আনন্দ ও বৈচিত্র খুঁজে পাবে। আমি অবশ্য ওদের ছোটখাট চেষ্টাগুলোর জন্য মাঝে মাঝে সারপ্রাইজ গিফট দেই। এতে আগ্রহ বাড়ে। চেষ্টা করছি কিন্তু এখনো পুরাপুরি ছেলেকে এই ব্যাপারে পারদর্শী করতে পারিনি।

আমরা বেশীরভাগ বাবা-মারা নিজেদের অজান্তে প্রায়ই একটা ভুল করি, যদিও আমাদের উদ্দেশ্য খারাপ না। বাচ্চাদেরকে কোন কাজে অভ্যস্থ করতে বা আরো বেশী পারদর্শী করতে তার সমবয়সী বা পাড়া পড়শীদের মধ্যে কারো উদাহরণ দিয়ে কথা বলি। যেমন - অমুক দেখেছ কত ভাল রেজাল্ট করেছে অথবা দেখেছ অমুক বাবা মাকে কত সাহায্য করে ইত্যাদি। আবার কখনো অন্যদের সামনেই বাচ্চাকে তার ভুলের জন্য তিরষ্কার করি। এ ধরনের আচরণগুলো তাদের মন মস্তিষ্কে এত গভীর ক্ষত তৈরী করে যার প্রভাব সারা জীবন থেকে যায়।

প্রত্যেকটি বাচ্চা ইউনিক, আপন গুনাগুনে অদ্বিতীয়। সবাই তারা নিজেদের বাবা মায়ের কাছে 'ওয়ান এন্ড অনলি' হতেই পছন্দ করে। তাই ওদের হতাশ হতে দিবেন না।

রবিঠাকুরের ওই কবিতার লাইনটা মনে আছে তো ''খোকা বলেই ভালবাসি, ভাল বলেই নয়''!

(চলবে)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

কারো পোস্টিং লন্ডন, কারো প্যারিসে! 

কারো পোস্টিং লন্ডন, কারো প্যারিসে! 

সরকারি চাকরির এক বছর পূর্ণ হল আজ! আমার অনুভূতিগুলো মিশ্র। ভাল লাগা…

প্রথম কর্মস্থলে যোগদানের গল্প 

প্রথম কর্মস্থলে যোগদানের গল্প 

সময়টা ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই।  পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ…

তাজিনের চলে যাওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা

তাজিনের চলে যাওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা

এক.  চলে গেলেন তাজিন। রংধনুর দেশে, অসীমে চলে গেলে আর কেউ কোনদিন ফেরে…

ভূড়িওয়ালা ডাক্তারদের কি পছন্দ হয় না?

ভূড়িওয়ালা ডাক্তারদের কি পছন্দ হয় না?

ইদানিং আউটডোরে দেখছি মায়েরা কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে বসতে না বসতেই, কিছু…

কী করলে মেডিকেল আঙিনা স্বাগত জানাবে তোমাকে?

কী করলে মেডিকেল আঙিনা স্বাগত জানাবে তোমাকে?

ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করায় ব্রত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাটা দিনদিন বেড়েই চলছে। কেননা…

সমাজ অধঃপতন হয়ে কোন দিকে যাচ্ছে?

সমাজ অধঃপতন হয়ে কোন দিকে যাচ্ছে?

বাচ্চা পেটে আসার ২৮ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা নষ্ট করলে সেটাকে এবরশন বা…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর