ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


সালাম কর, উনারা ডাক্তার, আল্লায় পাঠায়ছে

এক. ওয়েটিং রুমে বসে অপেক্ষা করছি, রাতের ট্রেনে ঢাকা যাবো। সাথে আমাকে তুলে দিতে এসেছেন রহমান মিয়া আর স্টেশনের কর্মচারী শহিদ।

মাঝেমধ্যে শর্ট নোটিশে ট্রেনিং বা এটা সেটার জন্যে ঢাকা যেতে হয়। মফস্বলে টিকেট পাওয়া একটা সমস্যা। তাই বাধ্য হয়ে সিলেটে লোক পাঠিয়ে আনতে। এতে খাজনা চেয়ে বাজনা বেশি তবুও করতে হয় কারন নিরাপদ জার্নি হিসেবে সবার পছন্দ ট্রেন। আজো সেভাবেই টিকেট সংগ্রহ।

ট্রেন অপেক্ষার সময় টুকুতে বসে বসে একটা কিছু পড়ার চেষ্টা করছিলাম। ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় এখন অল্প খরচে সময় বাঁচিয়ে পছন্দের যেকোনো বই বা আর্টিকেল সহজেই পড়া যায়, যা হয়তো কয়েক বছর আগে ছিলো কল্পনাতীত।

প্ল্যাটফর্ম ওয়েটিংরুম এর বাহিরে থেকে ভেসে আসা একটা বাচ্চার প্রচণ্ড কান্নার শব্দে পড়ায় মনোনিবেশ করতে পারছিলামনা। দারওয়ান রহমান ভাই কে ডেকে বললাম, 

"দেখতো বাচ্চাটি সেই কখন থেকে কাঁদছে"

তিনি এসে বললেন, 

"ভাই মায়ের কোলে বাচ্চাটি কাঁদতেছে, মা তার পায়ে জোর করে একটা জোতা পরিয়ে দিয়েছে বলে..!"

তাই বলে আধঘণ্টা যাবৎ চিৎকার করে বাচ্চাটি কাঁদছে...?

উঠে গিয়ে দেখলাম সত্যি একটা আট নয় মাসের বাচ্চা বোরকা পরা মায়ের কোলে বসে জোরে জোরে কাঁদছে। পাশে শশ্রুমন্ডিত মাথায় টুপি এক যুবক ও বসা।

জিগ্যেস করলাম, কি ব্যাপার?

মা বললেন, "বাচ্চাটি জুতা পরতে চায়না, পরিয়েছি তাই তাই কাঁদছে"

তোমাদের বাচ্চা?

মহিলা হেসে বললেন, জ্বী?

"জুতোজোড়া খুলতো.."

পাশেই বাবা হেসে হেসে জুতো জুড়ো খুলে ফেললেন। বললেন, ছাওয়ালটা দুষ্টু আছে।

জুতো খুলায় দেখলাম সত্যি সত্যি বাচ্চাটা কান্না থামিয়ে দিয়েছে।

একটু অবাক হলাম। সুন্দর টকটকে লাল একজুড়ো জুতা, সেটা পরানোতে বাচ্চা কাঁদছে। তাও প্রায় আধ ঘন্টা যাবৎ। অথচ বাচ্চারাতো এ ধরনের জুতো পরে কাঁদার কথা না। সত্যি বাচ্চাটা দুষ্টু বেশ, জেদীও।

বললাম, "বাচ্চাদের জোর করে কিছু করা ঠিক না। ঘুমিয়ে গেলে আবার পরিয়ে দিও"।

মহিলা মাথা নেড়ে বললো, "ঠিক আছে.."

খানিকক্ষণ পরই ঢং ঢং করে ট্রেন আসার ঘন্টা বাজার শব্দে প্ল্যাটফর্ম সরগরম হয়ে উঠলো। ট্রেন ঢুকতে লাগলো ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে।

কেবিনে ঢুকেই হতবাক। দেখি ডা. শামিম ভাই। তিন সিলেট সদরের ইউ এইচ এফ পি ও। খুশি হলাম, আজকের যাত্রায় কেবিনে আমার রাতের সংগী তিনি।

দুজনের ভালো লাগলো। গল্প করে করেই যাওয়া যাবে। তবে বেশিক্ষন গল্প করা হলো না। এসি রুমে কম্বল জড়িয়ে দুজনেই কবে যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না। সকালে এটেন্ডেন্ট সাহেবের ডাকে ঘুম ভাঙল।

দুজনে মহাখালী এসে একটি হোটেলে উঠলাম। মহাখালীর এ হোটেল গুলোতে বেশির ভাগ ডাক্তাররাই থাকেন।

কারো ট্রেনিং, কারো এফ সি পি এস বা এম ডি পরীক্ষা ইত্যাদি নানান কাজে মহাখালী এসে থাকতে হয় তাদের। ডি জি ও বিসিপিএস অফিস কাছে থাকায় সবার পছন্দ এখানকার হাতেগুনা কয়েকটি হোটেল, তাই রুম পাওয়াটা কষ্টকর, কিন্তু আজ পেলাম।

সকালে ক্লাসে গিয়ে সবাইকে পেলাম। সিলেটের সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এসেছেন। কেউ আত্মীয়ের বাসায়, কেউবা আমাদের হোঠেলেই।

একটানা পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস শেষে সবাই চার পাঁচটা টমটম নিয়ে হোঠেলে ফিরছিলাম। টমটম আমার অসম্ভব প্রিয়। দাদা বাড়ি গেলে চড়া হয়।

সিলেটের বিজ্ঞ ইউ এইচ এফ পি ও ডা. তৌহিদ ভাই আমার টমটমে। বললাম, "তৌহিদ ভাই মহাখালী সাততলা বিল্ডিং টা কই? আসার সময় প্রধান সহকারী বলছিলেন, স্যার ট্রেনিং ভ্যানু সাততলা ভবনের কাছে.."

ডা. তৌহিদ ভাই বললেন, ঐ যে, ঐদিক তাকাও। সাততলা বিল্ডিং ঐটা।

১..২...৩...৪...৫...৬...ভাই, এটাতো সাততলা না..!

তিনি বললেন, "আরে ঐটাই। নামে কথায় অনেক সময় থাকে না.."

আমি এই প্রথম দেখলাম সাততলা ভবন টি। পত্রিকায় অনেক বার এটার নাম এসেছে।

বললাম, ভাই সাততলা বস্তি টা তাহলে কই?

তিনি বললেন, বস্তি দিয়ে কি কাজ তোমার? 

বললাম, পত্রিকায় প্রায়ই এর নাম শুনি তাই। এই আগুন, মারামারি, মাদক ইত্যাদি ইত্যাদি।

"এদিক তাকাও..", তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন।

আমি দেখলাম বস্তিটির বাহিরের কিছু অংশ। গিজগিজ করছে মানুষ। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ছুটচ্ছে। কয়েকটা শিশু দৌড়াদৌড়ি করছে, খেলছে।

"তৌহিদ ভাই ভিতরে যাওয়া যাবে? এতো অল্প জায়গায় হাজার হাজার মানুষ কিভাবে থাকে, আমার দেখতে খুব ইচ্ছে করে। অনেক দিনের আশা.."।

আমাদের সিলেটের ইউ এইচ এফ পি ও'দের মুরব্বি তৌহিদ ভাই সায় দিলেন না বললেন, "সমস্যা হবে.."

 

দুই. বস্তিঘর আর বস্তিবাসীদের খুব কাছ থেকে একবার দেখার সুযোগ হয়েছিলো ঢাকা মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে কমিউনিটি মেডিসিন এ প্লেস মেন্টের সময়। কি একটা হেলথ রিলেটেড টপিক নিয়ে ডাটা কালেকশন করতে গিয়েছিলাম। সেবারই প্রথম দেখলাম ঢাকার শত সহস্র অট্টালিকা আর রংমহলের নীচে চাপা পড়ে আছে কিছু দুখী মানুষের অমানবিক জীবন কাহিনী। আচ্ছা ওরা কি মানুষ...! ভাবতে কষ্ট হচ্ছিলো।

সন্ধ্যায় একটু বিশ্রাম নিয়ে সদরের ইউ এইচ এফ পি ও সহ চা খেতে বেরুলাম। আমি তাকে বললাম, সাততলা বস্তির মানুষ কিভাবে জীবন যাপন করে দেখবেন? তারা কিভাবে থাকে, খায়। ওরাওতো মানুষ।

শামিম ভাই না বললেন না, হা ও বললেন না। অনেকটা এক্সপ্রেশন লেস ফেইস। আমি বললাম, "আমার খুব ইচ্ছে করছে ওদের কে কাছ থেকে দেখতে.."।

তিনি বললেন, তাইলে চলুন।

 

তিন. একটা টমটমে উঠলাম দুজনে। ধীরে ধীরে চলা শুরু হলো। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে টমটম থামিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলা উঠে পাশে বসে পড়লেন। হাতে দুটো পুটলি।

চালক বললো, এটা রিজার্ভ উঠবেনা, তিনি মানলেন না। আমার পাশে বসলেন। 

বললেন, "বাজান আমার মাইয়ার খুব বিপদ। তারে দেখতে যামু, না করিসনা.."

আমিও বললাম, "থাক। তুমি চালাও.."

যেতে যেতে ভাবছিলাম কি ভাবে বস্তির ভিতরে ঢুকা যায়। এভাবে হুট করেতো আর বস্তিতে ঢুকা যায় না। কি না কি হয়। 

আচ্ছা বস্তির পাশে যদি একটা দোকানে গিয়ে এটা সেটা কিনে দোকানি কে বলি, "আমার বাসায় কাজ করে রহিমার মা, সে কদিন ধরে যাচ্ছেনা। শুনেছি অসুস্থ। তাকে দেখতে আসছি কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিনা, তাহলে নিশ্চিত একটা ব্যবস্থা হবে। দোকানি হয়তো রহিমার মার ঘর কে খুজতে আমাকে সাহায্য করবে, গলির এমাথা থেকে ওমাথা। আইডিয়াটা মন্দ না।

হঠাৎ পাশে বসা বৃদ্ধার কথা মনে পড়লো। উঠার সময় সে কি যেনো বলছিলো, কে অসুস্থ।

আচ্ছা আপনার কে অসুস্থ? জিগ্যেস করলাম।

"আমার মেয়ে। সন্ধ্যার আগে মোবাইল ফোনে কইছে মাথা ঘুইরা পইড়া গিয়া অজ্ঞান হইয়া গেছে বাবা। পাগলের মতো ছুইটা আইছি সেই মিরপুর থাইকা, তারে দেখতে..."

কোথায় থাকে মেয়ে?

সাততলা বস্তিতে।

কি করে?

কিছু করে না।

বিয়ে শাদী?

"হো বাজান, জামাই টমটম ছালায়। চাইরডা পোলা মাইয়া, অভাব আর টানাটানির সংসার। কদিন আগে আবার আরেকটা পোলা অইছে। এমনিতে গরিব, মাইনষের বাসায় কাম কাজ কইরা খায়। তার উপর আল্লায় কোল ভইরা দিতাছে। আল্লায় আমি গরিবরেই ছিনছে। তাও যদি হইতো। কিন্তু হেই পোলা দুনিয়ায় আইতে গিয়া আমারে আরো ফকীর বানায়া দিছে.."

কেনো, কি হইছে?!

"কি কমু বাজান আপনেরে। জন্মের সময় মাইয়ার খিছুনি হইছিলো। পরে অপারেশন করা লাগছে। সেইতে বিশ হাজার টেকা গেছে"

বিশ হাজার? এতো টাকা কেনো? সরকারী হাসপাতালে যান নাই?

"গেছি বাজান। ছয় ব্যাগ রক্ত লাগছে। এক মাস হাসপাতালে থাকন লাগছে। ডাক্তার ওষুধপাতির টেকা লাগেনাই, তয় বাবা আরো খরছ আছেনা।

দিনে পাছ লিটার দুধ দিতো একটা গাভী আছিলো, শেষমেশ ঐডা বিক্রি কইরা টেকা দিছিরে বাবা।

আর কিছু নাই এহন গ্রামের বাইত, ভিডা ছাড়া। আপনার চাচারে বাড়ি রাইখা তাই চইলা আইছি ঢাকায়।

পেটে ভাত দিতে অইবোতো। এহন মাইনষের বাসায় কাজ কাম করি। পেট ছালাই, দুইটা পয়সা পাই। মাইয়া জামাই,নাতি পুতিরে দেহি.."

কোথা থেকে আসছেন বললেন ?

"বাজান মিরপুর"

আপনি অইখানে থাকেন?

"হো বাজান। এইহানে কাম নাই। ওই হানে আছে। কোন বাসায় কাম কইরা এক হাজার, কোন বাসায় দেড় হাজার আবার কোন বাসায় পাচশো। কাম বুইজা। 

ঐগুলা দিয়া একটা বস্তিতে থাহি মিরপুরেই। 

যাগো বাসায় কাম করি হেরা খুব বালা। খাওয়ায়, কাপড় টাপর দেয়। আমারতো ওতো লাগে না। মাইয়া নাতি পুতির লাইগা আনি,বাড়িত ও পাঠাই। আপনার ছাছায় বুড়া। ভিক্ষা করে..."

এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠলো। আমার এক বন্ধু এডিসি। ওর সাথে সন্ধ্যায় আড্ডা দেবার কথা ছিলো। 

জিগ্যেস করলো, তুই কই? 

বললাম, বস্তিতে। 

সে অবাক হয়ে বললো, কি বলিস, ফান করছিস? আমার এখানে তোর না আসার কথা ? 

বললাম, "দোস্ত পরে আসবো পরে কথাও বলবো। রাখি"

সে বললো, তুই যে মাঝেমধ্যে কি না করে বসিস।

বৃদ্ধা কে জিগ্যেস করলাম, পুটুলিতে কি? হাতের দুইটা পুটলি দেখিয়ে।

"মাইয়ার লাইগা দুধ, ছিনি, আটা আর ছাইল আনছি।তাড়াহুড়া কইরা পাগল ওইয়া ছুইটা আইছি। যে বাসায় কাম করি হেরা মাইয়া অসুস্থ হুইনা আমারে দিছে।

খুব বালা খালাগনেরা। কিছু টেকাও দিছে। কি করমু বাজান। আল্লায় খালি আমারে বিপদে ফালায়। আর মাইনষে আমারে তুলবার ছায়।

এই দুনিয়ায় আল্লায় খালি আমারেই ছিনলো। আমার জন্যে সক্কল বিপদ রাখছে....."। বৃদ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ দুটো আচল দিয়ে মুছলেন।

আর ছেলে মেয়ে কেউ নাই?

"নাগো বাজান। কপালডা পোড়া। কইছিলাম না, আল্লায় দুঃখ দেওনের লাইগা কেবল আমারেই ছিনছে..."

মানে?

"চাইরডা ছাওয়াল মারা গেছে জন্মের পর পর। হেরপর এই মাইয়া অইলো। বাছেনা বাছেনা।

আল্লাহর কাছে সিজদায় পইড়া কইলাম, এইবার আমারে নিয়া যাওগো আল্লা। আল্লায় আমারে নেয় নাই। 

পরে আরেকটা মাইয়া অইছে। এই দুইটা মাইয়াই আল্লায় দিয়া রাখছে ছে আমারে..."

সাততলা বস্তির কাছে টমটমটি চলে এলো। আমি বললাম, "আপনার ভাড়া আমি দিচ্ছি। আপনি ওপাশ একটু দাড়ান"

তিনি বললেন, "থাক বাজান। ভাড়া দেওন লাগবোনা"

আমি ভাড়া দিয়ে বৃদ্ধা কে বললাম, "আমি ডাক্তার। যদি কিছু মনে না করেন তবে আমি আপনার মেয়েকে দেখতে যাবো"

বৃদ্ধার চোখ চিক চিক করে উঠল। "কি কন বাজান। আপনে ডাক্তার। আল্লাহ একি মিলাইলো আমার হাতে। বাজানগো হাছাই আপনি আমার লগে যাইবেন? আমার মাইয়াডাতো অজ্ঞান হইয়া পইড়া আছে। বাজান আপনি গেলেতো বহুত বালা অইবোগো বাজান..." তিনি কেঁদে দিলেন।

হ্যা যাবো, চলুন।

কিন্তু বাজান আমিতো টেকা দিতে পারুম না।

কিসের টাকা?

ফিস।

আরে দূর লাগবেনা। চলেন।

মহিলা খুশিতে কেঁদে আমার পা ধরতে চাইলেন।

আমি বললাম, "আরে করেন কি,করেন কি চলেন"

মনে মনে ভাবলাম, যাক ভালো হলো। অনেক দিনের আশা বস্তিবাসীদের খুব কাছ থেকে দেখবো। তাদের দুখের জীবন নিয়ে লেখবো। সে আশাও টা আজ পুর্ন হবে আর সেই বৃদ্ধার অসুস্থ মেয়েটাকে দেখে দুটো পরামর্শ ও দিতে পারবো। এক ঢিলে দুই পাখি।

 

চার. আমি আর ডা. শামিম ভাই হেঠে চলেছি। আলো আধার। বৃদ্ধা হাঁঠছেন আগে আগে। আমরা পিছে পিছে। 

সারি সারি ছোট ছোট খুপরি ঘর। গাদাগাদি করে শুয়ে বসে আছে আবাল বৃদ্ধ। অনেক গুলো ঘর, হাটা যায় না। 

ছোট ছোট গলির মোড়ে মোড়ে আবার কিছু উঠতি বয়সি ছেলে গোল হয়ে বসে আছে। অদের কেউ কেউ বৃদ্ধার পিছনে পিছনে আমাদের ছুটে যাওয়া দেখে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। 

আমি পরনের কোট খুলে শামিম ভাইকেও বললাম, কোট টাই খুলে ফেলুন।

প্রায় দশ মিনিট হাটার পর ছোট একটা ঘরের সামনে এসে দাড়ালো বৃদ্ধা। বললেন, বাজান মাইয়ার ঘর ঠাউর করতে পারতাছিনা তো।

রাস্তা মনে অয় ভুইলা গেছি..! আমি আর শামিম ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। 

শামিম ভাই ইংরেজিতে বললেন, ছিনতাই টিনতাই হচ্ছিনাতো। 
আমি হেসে বললাম, মনে হয় না।

হঠাৎ বৃদ্ধা বললেন, পাইছি পাইছি। এইতো এই হানে আমার মাইয়া থাহে। "সুরমা" বলে তিনি একটা ডাক দিলেন। 

সাথে সাথে ছোট তিনটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে, "নানী আইছে নানি আইছে" বলে দৌড়ে এসে বৃদ্ধার কোলে ঝাপিয়ে উঠলো। 

তিনি বললেন, বুবুরা তোরা ছাড়, এই দ্যাহ তোর মার লাইগা ডাক্তার লইয়া আইছি...!

ছোট ছোট বাচ্চা গুলো আমাদের দেখে যেনো ভুত দেখলো। "কি কও নানি..! হেরা ডাক্তার..!!

"হ রে বুবুরা। তরা এবার ছাড় আমারে"।

"আহেন, আহেন বাজান", বলে তিনি আমাদের তার মেয়ে সুরমার ঘরটাতে ঢুকতে বললেন।

খুব কস্টে ঘরে ঢুকলাম আমি আর শামিম ভাই। এতো ছোট আঁটসাঁট ঘর যে ঢোকা যাচ্ছিলো না। তাও ঢুকলাম।

বাচ্চাগুলা গোল হয়ে আমাদের পায়ের কাছে বসলো। মিস্টি মিস্টি চেহারা। সব গুলো হাসছে। তাদের নানি আসছে। সাথে ডাক্তার ও। সম্ভবত এই প্রথম তারা ডাক্তার দেখছে। একটা বাচ্চা আমাকে ছুঁয়ে দেখলো।

একটু পাশে মেঝেতে আরেকটা মেয়ে বসা। তার কোলে একটা বাচ্চা। সম্ভবত এইটাই বৃদ্ধার সেই অসুস্থ মেয়ে, সুরমা। 

মেয়েকে বৃদ্ধা বললেন, "সালাম কর, উনারা ডাক্তার, আল্লায় পাঠায়ছে"

মেয়ে উঠতে চাইলো। আমরা বললাম, থাক মা বসেই থাকো। তুমি অসুস্থ।

ডা.শামিম বললেন, "সাঈদ ভাই একে তো সিভেয়ার এনিমিক লাগছে। দেখেন একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে"

আমি বললাম, দেখি মা এদিকে আসো। তোমার চোখ দেখি।

"হ্যা তাইতো একেবারে সিভেয়ার এনিমিয়া"

এর জন্যই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলো বার বার। এর মধ্যে এক যুবক আসলো। সাথে আরো অনেক আবাল বৃদ্ধ বনিতা। সবাই হা করে আমাদের দিকে ঘিরে তাকাচ্ছে।

বৃদ্ধা বললেন, "জামাই আইছো। কি অইছে মাইয়ার? উনারা অইলো, ডাক্তার। আল্লায় পাঠাইছে। আল্লায়তো খালি আমারেই ছিনে। বিপদে ফালায় আবার উদ্ধার ও করে ফেরেশতা দিয়া। উনাদের খুইলা কও কি অইছিলো আমার মাইয়ার?"

লিকলিকে কালো যুবকটি কাছে এসে পা ধরে সালাম করলো,

"স্যার আপনারা ডাক্তার। আপনারা কোথ্যেখে আইলেন এই গরীবের ঘরে স্যার। এই হানেতো বহনের ও জায়গা নাই, কি যে করি..."

বৃদ্ধা বললেন, "আরে জামাই কথা কম কও। বাজান গো কি আর বওনের সময় আছে"

সে বললো সব কিছু। আসলে পরপর তিন চারটা বাচ্চা আর অনাহার অপুষ্টিতে মেয়েটাকে তীব্র রক্তশুন্যতা পেয়ে বসছিলো। সে দেখালো ফার্মেসী থেকে কিছু ঔষধ খাওয়াচ্ছে, কিন্ত কমছেনা। একটা প্রেশক্রিপশন ও দেখলাম।

কোলের ছোট বাচ্চাটা আমাদের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। বেশ নাদুস নুদুস। আমি কোলে নিলাম। ওর হাতে বিসিজি স্কার মার্ক আছে কিনা দেখলাম।

অন্যান্য বাচ্চাগুলাও ভুত দেখার মতো আমাদের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম, ইস যদি কিছু চকলেট বিস্কুট আনতাম, তাইলে খুব মজা করতো তারা।

আমি কিছু টাকা বৃদ্ধার হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, 

"প্রেসক্রিপশন এর ঔষধ গুলা ভালো। অগুলা কিনে আনেন। আর কাল সকালেই, আই সি ডি ডি আর বি, মহাখালী টি বি হাসপাতাল বা আশে পাশে অনেক বড় বড় সরকারি হাসপাতাল আছে, ওকে নিয়ে যেয়ে ভর্তি করে নেবেন। ওর রক্ত লাগতে পারে। ওখানে কিছু টাকা আছে। ওতেই সব হবে আশাকরি"

মেয়েটির স্বামী কে আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম, "সমস্যা মনে করলে ফোন দিও"

আমি আর শামিম ভাই চলে আসলাম। বৃদ্ধা তার মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতি পুতি সবাই আমাদের পা ধরে সালাম করতে চাইলো।

বললাম, "আরে করেন কি করো কি করো কি"

তিনি আবারো বললেন, "আল্লাহ কেবল আমারেই ছিনছে। আমারে বিপদে ফালায়, আবার উদ্ধারের লাইগা ফেরেশতা পাঠায়। 

আল্লায় খালি আমার লগেই মশকরা করলো সারাজীবন"। বৃদ্ধার চোখে অশ্রুতে চিক চিক করছিলো।

"বাজানগো গরীবের ঘরে এক কাপ চা খাইয়া যান। কিছুতো আর করতে পারুম না.." তিনি বললেন।

আমি বললাম, "না থাক। ওতে আপনাদের কস্ট হবে। আপনি বলছেন, আমরা খুশি হয়েছি। আমাদের চা খাওয়া হয়ে গেছে। আপনি বরং মেয়েটা কে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করেন"

"তাইলে বাজান একটু খাড়ন আপনারা। রাস্তা ছিনবেন না। বাহির হইতে পারবেন না। অসুবিধা টসুবিধা অইবো। আমি পৌছাইয়া দেই..." বৃদ্ধা বললেন।

পাশে থাকা ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বলে উঠলো,

"নানি আমরাও যামু আমরাও যামু উনাগোরে আগায়া দিতে..."

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর