ডা. এম এ কাশেম

ডা. এম এ কাশেম

পরিচালক, সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।


২৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৬:০৬ পিএম
আজ জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী

ডা. নুরুল ইসলাম ছিলেন যুগদ্রষ্টা, যুগস্রষ্টা

ডা. নুরুল ইসলাম ছিলেন যুগদ্রষ্টা, যুগস্রষ্টা

জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের আজ পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন সাবেক পিজি হাসপাতালের রূপকার, জাতীয় ওষুধ নীতির স্বপ্নদ্রষ্টা, ধূমপান বিরোধী আন্দোলনের অগ্রদূত, বাংলাদেশে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল শিক্ষার জনক, দেশে বেসরকারী খাতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটিসির প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক তথা দেশের একজন নন্দিত চিকিৎসক। চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষকতা, নিয়মানুবর্তিতা ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতায় তার সমান্তরাল ব্যক্তি সমাজে বিরল। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়। আরো বহু পুরষ্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন।

চিকিৎসক হিসাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। তাঁর ক্লিনিক্যাল আই ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি রোগী দেখেই বুঝতে পারতেন তার কী কি অসুখ হয়েছে। এরপর তিনি রোগীকে যে প্রেসক্রিপশন লিখে দিতেন তাতে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ থাকতো না। ধন্বন্তরী চিকিৎসক বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন। তাঁর অনেক প্রেসক্রিপসনে লেখা থাকতো ‘কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই’। রোগীদের তিনি প্রায়ই বলতেন 'Medicine is a useful Poison.' সারা দেশে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার রোগীদের সফল চিকিৎসা তিনি করে গেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মওলানা ভাসানী, মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খান, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পল্লীকবি জসিমউদ্দীন, সওগাত-সম্পাদক নাসিরউদ্দিন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন ডা: নুরুল ইসলামের প্রেসক্রিপসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ডা. নুরুল ইসলামের নৈকট্য ও সখ্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বিকশিত ও প্রস্ফুটিত করতে সাহায্য করেছে।  একবার বঙ্গবন্ধুর মায়ের অসুখ হয়েছিলো। তখন ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসা থেকে ডাক পড়ল ডা. নুরুল ইসলামের। তিনি তাঁর ‘ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি সালাম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন এবং আমার কাঁধে হাত রেখে তাঁর মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বাংলাদেশের সবচাইতে বড় ডাক্তার নিয়ে এসেছি মা। এবার ইনশা আল্লাহ্ তোমার অসুখ সেরে যাবে।’ বঙ্গবন্ধুর মাকে দেখে তিনি দিলেন তিনটি প্রয়োজনীয় ওষুধের অতি সস্তা দামের একটি পাউডার। এতেই সুস্থ হয়ে গেলেন তিনি।

একবার বঙ্গবন্ধু ভাই শেখ নাসের অসুস্থ হলেন। চিকিৎসা করে তাঁকেও সুস্থ করে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ডা. সাহেব, আপনি চমৎকার কাজ করেছেন। আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি শুধু আপনার দোয়া চাই, আর কিছু নয়’। বঙ্গবন্ধু ডা. নুরুল ইসলাম সাহেবের কাঁধের ওপর হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইনার মত লোক আমার প্রয়োজন। আপনারা সবাই যদি ইনার মত হন, অতি অল্প সময়ে আমার বাংলাদেশ সোনার বাংলা হয়ে যাবে।’ সেই ডা. ইসলামই পরবর্তীতে নিয়োজিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে।

আমি তখন সিক্স বা সেভেনে পড়ি। একবার তার চট্রগ্রামের খাতুনগঞ্জের চেম্বারে গিয়ে দেখি লং টেনিস খেলোয়ার এক রোগী আহত হয়ে এসেছেন। তিনি দেখে বললেন, ‘এতো আমার রোগী নয়। তিনি অর্থোপেডিক্সের চিকিৎসককে রেফার করলেন। কিন্তু রোগীর অভিভাবক নাছোরবান্দা। তিনি বললেন, আপনাকে আগে না দেখিয়ে কোথাও যাবো না।’ এরপর তিনি চিকিৎসা দিলেন।

তৎকালীন আইপিজিএমআর-এ (পিজি হাসপাতাল) সুদীর্ঘকাল তিনি পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সঙ্গে যুগ্ম পরিচালক হিসেবে ছিলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. এম আর খান লিখেছেন, ’একবার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর জন্য জোরাল আন্দোলন শুরু করল। ডা. নুরুল ইসলাম ছাত্রছাত্রীদের ডাকলেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানালেন 'You can shift the director but not the date of Examination' তাঁর দৃঢ়তায় পরীক্ষার্থীরা যথাসময়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। পরিচালক থাকাকালীন তিনি সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালে উপস্থিত হতেন এবং বিকাল ২টা ৩০ মিনিটে অফিস ত্যাগ করতেন। আবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে হসপাতালে এসে রাত ৯টার দিকে ফিরে যেতেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং সে সময়ে জাতীয় অধ্যাপকের ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ বলেছেন, ’স্যার সকালে হাসপাতালে ঢোকার মুখে দাঁড়াতেন এবং হাসপাতালের শিক্ষক, ডাক্তার, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত হচ্ছেন তা অবলোকন করতেন।’

তিনি দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ইউনিভার্সিটি ইউএসটিসি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যা ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ইউএসটিসি নিয়েই ছিলো তাঁর স্বপ্ন। আমরা যখন সেন্ট্রাল হাসপাতাল করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তখন আমার মামাকে বললাম, ‌‘মামা, গ্রীন রোডে একটা জায়গা পেয়েছি। আমরা একটা হসপিটাল দিতে চাই, আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।’ তিনি বললেন, ‘আমি যদি তোমার সঙ্গে থাকি তাহলে আমার ইউএসটিসির কী হবে?’ বড়ো আশার কথা যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়েয় ছাত্র/ছাত্রীরা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তার লালিত স্বপ্ন পূরন হতো।

১৯৬০ সালের দিকে ডা. নুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকল্টি অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন খোলা হয়। এর অধীনে এমফিল ও এমডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ হয়। বর্তমানে সিনিয়র অধ্যাপকদের এফসিএস, এমডি ডিগ্রি অর্জন তার কীর্তির নীরব স্বাক্ষর। ১৯৮২ সালে ওষুধনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার বন্ধে কাজ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো ড্রাগ পলিসির মাধ্যমে সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর ’লো’ টেকনোলজির ওষুধ দেশিয় ওষুধ কোম্পানিগুলো উৎপাদন শুরু করে। পক্ষান্তরে হাই প্রফাইল ওষুধ বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে দেশিয় কোম্পানিগুলোও উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে। তিনি ছিলেন তামাক ও ধূমপানবিরোধী আন্দোলন ‘আমরা ধূমপান নিবারণ করি বা আধূনিক’-এর সূচনাকারী। আধূনিকের লোগো সে সময়ে তামাকবিরোধী সচেতনতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় আজ তামাকবিরোধী অনেক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে যা তামাকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখে চলেছে।

দেশি-বিদেশি প্রায় ৩২টি পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাস্ট্রপতি স্বর্ণপদক (১৯৬৩), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৩)। ১৯৮৭ সালে জাতীয় অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেন। ডা. নুরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য কিছু স্মরণীয় উক্তি হলো, ’শত্রুতা/সমালোচনা সতর্কতা আনে, সতর্কতা সফলতা আনে। 'Reading makes a man, writing makes a perfect man, seminar makes a ready man.'

তিনি বলতেন, ’যখন কেউ আপনার কাজের সমালোচনা করে, তখন বুঝতে হবে আপনি ঠিক কাজটিই করছেন। জীবনের গতিপথে যত বেশি সফলতা লাভ করবেন, সুনাম অর্জন করবেন, শত্রুর সংখ্যাও ততই বাড়বে। যাদের কথা অর্ধেক বুঝা যায় আর অর্ধেক বুঝা যায় না তাদের চেয়ে যাদের কথা পরিষ্কার বোঝা যায় তারা অধিকতর উত্তম।

সেই জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা সবাই যেন তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত