ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


১৬ জানুয়ারী, ২০১৮ ১২:৪৪ পিএম

প্রিয় চিকিৎসক, হতাশা ছড়ানো বন্ধ করুন

প্রিয় চিকিৎসক, হতাশা ছড়ানো বন্ধ করুন

ফেসবুকে ডাক্তারদের জীবনের নানা দুঃখ কষ্ট নিয়ে লিখালিখি করা, এই ধরনের স্ট্যাটাসে লাইক কমেন্ট করা, শেয়ার দেয়া নতুন প্রজন্মের ডাক্তারদের একটা ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে। এ ধরনের লিখার উদ্দেশ্য বিধেয় কোনটাই আমার কাছে ক্লিয়ার না। সন্দেহ নেই, এ ধরনের স্ট্যাটাস লোকজন বেশি পড়ে, শেয়ার দেয়, লাইক কমেন্ট বেশি পাওয়া যায়। যারা এসব লিখেন তারা যদি এ উদ্দেশ্যেই এসব লিখে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে। ক্যারি অন। কিন্তু এসব লিখালিখি নিশ্চয় আপনাদের পেশাগত জীবনের ভোগান্তি কমানোয় কোনো কাজে আসবেনা।

বাংলাদেশের মত কথিত মধ্যম আয়ের দেশে আমরা এক ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত। সেই ভয়ংকর রোগের নাম, অনিশ্চয়তা। আপনি যে বিষয়ে পড়াশুনা করেন না কেনো, আপনি নিশ্চিত না, আপনি কোন বিষয়ে ক্যারিয়ার করবেন, আপনি আদৌ চাকরি পাবেন কিনা, বা চাকরি পেলেও সেই চাকরিতে টিকে থাকবেন কিনা। সেই অনিশ্চয়তার মাঝে ডাক্তারিই একমাত্র পেশা, যাতে আপনি না খেয়ে থাকবেন না, এই নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে দুর্নীতি না করেও সচ্ছলতার সাথে যে পেশায় আপনি জীবনধারণ করতে পারবেন, তার নাম ডাক্তারি।

ছোটবেলায় আমরা যেসব স্বপ্ন দেখে বড় হই, তার অধিকাংশই আকাশ কুসুম কল্পনা। সেই পথ ধরে, একজন ডাক্তার মানেই কাড়ি কাড়ি টাকা, এই আশাবাদটাও বাস্তবতাবিবর্জিত। আমাদের মত গরীব দেশে, এরকম লাক্সারিয়াস কোনো পেশা থাকাও সম্ভব নয়। কিন্তু, তারপরও পেশা বলতে যদি বাংলাদেশে কোনো কিছু থাকে সেটার নাম ডাক্তারি। আপনার দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারী আত্মীয়, বড়লোক বাবার সন্তান বন্ধু, ভাগ্যের ফেভারে আংগুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ী প্রতিবেশীকে দেখে যদি আপনি বিভ্রান্ত হন, সেটা আপনার সমস্যা। কিন্তু আপনি যদি স্রেফ একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হোন এবং দুইয়ের সাথে দুই যোগ করলে কেবল চারই হয়, এই বিশ্বাস রাখেন, তাহলে আপনি স্বীকার করবেন, আপনি এই বাংলাদেশের একজন ভাগ্যবান নাগরিক এবং এই পেশায় এসে আপনি ভুল করেননি। এটি আপনিও জানেন এবং জানে বাংলাদেশের জুনিয়র থেকে শুরু করে সিনিয়র সব ডাক্তারই।এজন্যই ডাক্তাররা তাদের সন্তানদেরকে ডাক্তারই বানাতে চান এবং সন্তানদেরকে ডাক্তার বানাতে চান বাংলাদেশের যেকোনো সফল পেশার মানুষ।

ডাক্তারি পেশা পৃথিবীর যেকোন দেশেই কঠিন, ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশে আমাদের সিনিয়র ডাক্তাররা এটাকে আরো কঠিন বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ফেসবুকে লিখালিখির মাধ্যমে নিশ্চয় সেটার সমাধান হবেনা। আপনার এই লিখালিখিতে আপনার আয় রোজগার বাড়বেনা, আপনার কণ্টকাকীর্ণ চলার পথও সহজ হবেনা, কারও কাছ থেকে কোনো সুবিধাও আপনি পাবেননা। যে জিনিষটি আপনি আম ফেসবুকারদের কাছ থেকে পাবেন, তার নাম হচ্ছে করুণা। ছোটবেলা থেকে যে জিনিষটিকে সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করে এসেছি, তার নাম হচ্ছে করুণা। এজন্যই ফেডআপ হয়ে এতক্ষণ গ্যাজগ্যাজাচ্ছি। ডাক্তারদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট হতাশার কাহিনী সব ডাক্তারই জানে। তাহলে এই সব কাহিনীর টার্গেট পিপল কারা? আম পাবলিক, আপনার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, এর চাইতে খারাপ আর কি হতে পারে?

আপনি যদি লিখতেই চান, তাহলে সমাজের সাথে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করার বিষয়গুলো নিয়ে লিখুন। আমাদের পকেটে টাকা না থাকতে পারে, একটা ডিগনিটি নিয়ে আমরা বাঁচতাম, সেটাও ছুঁড়ে ফেলবেন না প্লিজ।
ভালো থাকুন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত