ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


১৫ জানুয়ারী, ২০১৮ ১২:৪৩ এএম

জীবনের বাধাগুলো সরাতে পারল না কিশোর ছেলেটা

জীবনের বাধাগুলো সরাতে পারল না কিশোর ছেলেটা

আবু শাকিল। ছেলেটার একটা অসুখ  ছিল। যখন থেকে রং চিনতে শিখেছে। সে চিনেছে ২ টা রং লাল আর কালো। কারন প্রতি মাসে রক্ত নিতে হয় তাকে। রক্তের ব্যাগের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকে। শাকিলের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য রক্তের ব্যাগের থেকে পাইপ দিয়ে নেমে আসা রক্তের ধারা। আর কালো কারন মন খারাপ আর কষ্টের ছবি।  

কিশোর ছেলেটা খুব ভালো লেখত। ফেসবুকে নিয়মিত লেখক। নিজের রক্তের প্রয়োজনে, অন্যদের প্রয়োজনে খুব ভাল করে লেখত যাদের মানুষ যে যেখানে থাকুক যেন নিয়মিত রক্ত দেয়। শাকিল আর রক্ত চেয়ে কাউকে বিরক্ত করবে না।  

পরশু রাতে আবু শাকিল আমাদের  ছেড়ে চলে গেছে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। সে ছিল থ্যালাসেমিয়ার রোগী।  

ছোট্ট শিশু থাকতেই এরা জেনে যায় জীবনের মানে হচ্ছে রক্ত। কারন এদের দেহ আর পাঁচটা বাচ্চার মত রক্ত তৈরি করতে পারে না। যতদিন বেচে থাকবে প্রতিমাসে ২/৩/৪ বার মানুষের কাছ থেকে রক্ত নিয়ে এদের বেচে থাকতে হয়। সময় হলেই এদের শরীরের শক্তি হারিয়ে যেতে থাকে।  নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ক্ষুধা লাগে না। মুখটা দেখতে শুকিয়ে যাওয়া ফলের মত  মনে হয়। রক্ত যোগাড় একটা চ্যালেঞ্জ। কারন সবাই দিতে চায়না। আবার সবারটা নেয়াও যায় না। দোকানে বিক্রি হয় না যে টাকা দিয়ে কিনে নিলাম। এসময় এই বাচ্চাগুলাকে ভাল খাবার খেলনা কিছুই এদের মনোযোগ পায়না। এরপর যখন পাওয়া যায় এদের মুখের অভিব্যক্ত যে দেখেনি সে জীবনের মানে বোঝেনি।

এটা একটা জেনেটিক রোগ। বাবা মার থেকে পায়। এর কোন চিকিৎসা নাই। প্রতিমাসে রক্ত নেয়া আর সেই রক্ত নেবার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে মৃত্যুর কারন হয় তাই এই আয়রন শরীর থেকে বের করে ফেলতে হয়। এর ঔষধ আছে। কিন্তু ট্রাজেডি যে, এটা বিদেশ থেকে আসে ফলে উচ্চমূল্যতে বিক্রি করে যা এদেশের ৯৫ ভাগ বাচ্চা নিয়মিত নিতে পারে না। ফলে কিশোরেই ঝরে পড়ে।

এই রোগ ছড়ায় না একজনের থেকে অন্যজনে। বাবা মার কাছ থেকে ছাড়া হবে না। এটা প্রতিরোধ করা যায়। শুধুমাত্র  বাবা মা দুজনাই যদি বাহক হয় তবেই বাচ্চা থ্যালাসেমিয়া রীগ নিয়ে জন্মাবে। এছাড়া আর কোনভাবে বা জন্মের পরে এটা হবে না। বাহক একেবারে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ।সামাজিক প্রচারনা আমাদের থ্যালাসেমিয়ার অভিশাপ থেকে বাচাতে পারে।

যেহেতু আক্রান্ত হবার কোন ভয় নাই তাই আমাদের এটা নিয়ে আগ্রহও কম। এদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ে আমরা অস্থির। এদেশের ঔষধ কম্পানী বার্ড ফ্লুর ঔষধ বানায়। থ্যালাসেমিয়া বাচ্চাকে বাচিয়ে রাখার আয়রন চিলেশন এজেন্ট বানায় না। অথচ এক হিসাবে বলা আছে এদেশে সাড়ে তিন লক্ষ থেকে চার লক্ষ। যাদের প্রতিমাসে কমপক্ষে দুই বার লাগবে।

কত টাকা আমরা দান করি। কিন্তু রক্ত এমন একটা দান যে এটা নিজের শরীরের অংশ। টাকা দিয়ে মাপা যাবে না। না মিললে নিতেও পারে না। অনেক সময় ইচ্ছা করলেও দেবার সুযোগ অনেকে পায় না। আমাদের ডোনারের অভাব। কারন চার মাস পর পর দিতে হয়। আর রোগীর লাগে মাসে দুই থেকে চার ব্যাগ। মানে ৪ মাসের জন্য ৮ জন ডোনার। তাহলে সারা দেশে কত ডোনার লাগে। বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের ছেলে মেয়েরা এগিয়ে এলে থ্যালাসেমিয়ার বাচ্চাদের জন্য অনেক বড় উপহার হত।

রক্তদান  সর্বোচ্চ দান। এর চাইতে সোওয়াবের আর কিছু নাই। আর না দিলে চার মাস পর পর এমনই নষ্ট হয়ে যায়। প্রতি জুম্মার নামাজের পর এই কথা গুলো মুসল্লিদের জন্য বলাবার চেষ্টা করতে হবে।  

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত