ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, জুলাই ২০১৮ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ 


চাঁদ কহে চামেলি গো...

ছবির মা'টি হলো আমার রোগী চামেলি। কোলের মেয়েটি যখন তার পেটে ছিল তখন তার ব্লাড ক্যান্সার হয়। ধরা পড়ে সিজারের পর, যখন অপারেশনের ঘা আর শুকাচ্ছিলনা। ধরা পড়তে না পড়তেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। খিঁচুনি, অজ্ঞান। আমার জীবনে নিজে ডায়গনসিস করা প্রথম ব্লাড ক্যান্সারের রোগী। ঈদ পরবর্তী ছুটির সময়। বড় স্যারেরা অধিকাংশই ছুটি কাটাচ্ছেন। আমি তখন একটি বেসরকারি হাসপাতালের ' সিএমও'। কাজ করি বিকেলের পর থেকে গভীর রাত অব্দি।

চামেলির অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা মেডিকেল অফিসার যখন আমাকে বলল আমি দৌড়ে ওর কেবিনে গিয়ে ঢুকলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে ওর চোখের তারা পরীক্ষা করে বললাম ওর মনে হয় ডি আই সি হয়েছে। মাথায় রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। দ্রুত আই সি ইউ তে শিফট কর। ট্রলির সাথে নিজেই গেলাম আইসিইউতে । সিটি স্ক্যানের আয়োজন করলাম। সিটিস্ক্যানে ধরা পড়ল মস্ত বড় হিমোরেজ। এর ভেতর ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা দিয়ে রোগীর ডি আই সি মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হলো। পরদিন নিউরো সার্জন সিদ্ধান্ত দিলেন অপারেশন করে হিমোরেজ সরাতে হবে। চামেলির পরিবার হতভম্ব। আমি বললাম এই অবস্থায় অপারেশন ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু না করলে আরো বেশি ঝুঁকি। চান্স নিয়ে দেখেন।

সব রকম সাপোর্ট দিয়ে অপারেশন করা হলো। মেয়েটার কই মাছের প্রান। অপারেশনের পর ওর ব্রেইনের ফাংশন দারুন ভাবে ফিরে এলো।

এরপর শুরু হলো কেমোথেরাপি। এক পর্যায়ে যখন সে ভালোর দিকে ওর স্বামী বলল 'ইন্ডিয়া নিয়া যামু'। 

বললাম 'যান'।

ইন্ডিয়া থেকে দুই সপ্তাহ পর ফিরে এলো। বলল "স্যার উনারা কইছে আপনারা যেই রোগ ধরছেন হেইডাই। এহন এই ট্রিটমেন্টই চালাইয়া যাইতে হইব। তাই আইয়া পড়ছি।"

এবার চামেলি নিজেই কথা বলতে পারে। অতি আবেগী মেয়ে। এত কথা বলে! আমি শুনলাম এক অদ্ভুত মায়াময় গল্প। চামেলির স্বামী খুব স্বচ্ছল কেউ নন। কাজ কর্মও তেমন কিছু করেনা। পারিবারিক মোটর পার্টসের ব্যাবসায় সময় দেয়। স্ত্রীর ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা করবে কিন্তু পরিবার বাধ সেধেছে। তাদের ভাষ্য "এই রোগ ভাল হয়না। হুদাই টেটমেন কইরা কি লাভ? "

চামেলির স্বামী চিকিৎসা করবেই। পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। দেওয়া হলো। সেইসব নিয়ে সে পরিবার থেকে আলাদা হলো। তারপর এই চিকিৎসা।

চামেলির দফায় দফায় কেমোথেরাপি চলে। আমি সিনিয়র প্রফেসরের কাছে রেফার করি, কিন্তু সে রাজি হয়না। বলে আপনেই দিয়া দেন স্যার। আমি প্রফেসর মাহবুব স্যারকে ফোনে ফোনে সব শেয়ার করি। স্যার হাসেন আর বলেন ঠিক আছে তুমিই দিয়ে দাও।

আমি এক চোরামি করি। ওর খরচ বাঁচিয়ে দিতে হাসপাতলের রেগুলার সিস্টেমকে গোপনে বাইপাস করে আমার চেম্বারের ভেতরের পেশেন্ট বেডে ওকে শুয়ে দিয়ে কেমো দেই। ওর বোন থাকে সার্বক্ষনিক ওর সংগে। কেমো চলে আর আমি ওর জীবনের গল্প শুনি। জীবনের গল্প মানে ওর স্বামীর গল্প। কিভাবে ওর স্বামী বিরাট ঝড়ের ভেতর উলটো দাঁড়িয়ে পিঠ পেতে দিয়ে ওকে রক্ষা করেছে।

সবাই চামেলিকে অপয়া বলে। বলে ও বাঁঁচবেনা। অহেতুক এত আয়োজন। এমনকি ওর শ্বাশুড়ি পর্যন্ত ওদের ত্যাগ করেছে। অপরাধ একটাই - "ব্লাড ক্যান্সার। আর সব নি:শেষ করে তার চিকিৎসা করা"। ওর শ্বাশুড়ি এখনো বিশ্বাস করে এই কুহকিনীর পাল্লায় পড়ে তার ছেলে সর্বস্ব খুইয়েছে। এ এক অদ্ভুত কনফ্লিক্ট।

চামেলি প্রতিদিন জীবনকে দেখে বিস্ময়ের সাথে আর ভাবে সে কি সত্যিই রোগমুক্ত! 

আমি বলি হ্যাঁ তোমার আর কোন রোগ নেই।

সত্যি কইতাছেন স্যার? 

হুম সত্যি। 

আমি আমার মাইয়াটার লাইগা বাইচা থাকতে চাই। 

স্বামীর জন্য চাওনা? 

ও কপট অভিমান করে বলে ' না, আমি মরলে তো হ্যার লাভ। আরেকটা বিয়া করব। ' 

বলে মিট মিট করে হাসে।

ওর স্বামীও হাসে। লজ্জা পায়। আমার চেম্বারে ঢুকেনা লজ্জায়। দরজার ওপার থেকে লুকিয়ে আমাকে দেখে। বউয়ের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা বোকা পুরুষ বোকামির লজ্জায় হাসে।

পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। একরকম নিখরচায় তার পুরো কেমোথেরাপি শেষ হয়। এর ভেতর আরেকবার ফলো আপ করে আসে ইন্ডিয়া থেকে। চামেলি এখন পুরো রোগ মুক্ত।

চামেলির স্বামী এখন নিজেই ব্যাবসা খুলেছে। ব্যবসার অবস্থা ভাল। চামেলি গ্রামেই থাকে। তবে মনে কিছুদিন পর পর ভয় ঢোকে। তখন ঢাকায় চলে আসে, আমাকে খুজে বের করে। আমি এখন আর প্রায়ভেট রোগী দেখতে চাইনা। কিন্তু সেও মানেনা। বঙ্গবন্ধুতে অনেক রোগী আর মানুষের ভিড়ে ওকে দেখে দেই। চামেলির মেয়েটা বড় হয়েছে। গতবার যখন আসলো আমি কি মনে করে ওদের একটা ছবি তুলে রাখলাম। আজ ট্যাবের গ্যালারি থেকে ছবিটা খুঁজে পেলাম।

চামেলির ফোন নাম্বার প্রতিবারই সেইভ করতে ভুলে যাই। কল লিস্টে অনেক ফোনের ভিড়ে তলিয়ে যায় ওর নাম্বার। মাঝে মাঝে আমারও ওকে মনে পড়ে। কেমন আছে মেয়েটা? আশ্চর্যের ব্যাপার যতবারই এরকম ভাবি ততবারই সে কিভাবে যেন নিজেই ফোন দেয়। " আস সালা মালিকুম স্যার..... স্যার আমি..... " 

আমি বলি "তুমি চামেলি"। 

চামেলি সরল হাসি হাসে। "স্যার আপনে কেমনে বুঝলেন"?

আজ সন্ধ্যায় চামেলির কথা মনে পড়ছে। আমি নিশ্চিত আগামিকাল সকালেই ও ফোন করে বলবে " আস সালামালিকুম স্যার। স্যার আমি......"

ওর কথা শেষ হবার আগেই আমি বলে দেব, তুমি চামেলি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

রাফা। এ দুই শব্দের নামের প্রতি মেডিকেল শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের কী যে টান!…

বন্ধুকে হারাতে চাই না

বন্ধুকে হারাতে চাই না

স্বপ্নের জগতে বাস করে না কিংবা স্বপ্ন দেখে না এমন মানুষ পৃথিবীতে…

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

আমদের চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় শত্রু আমরা নিজেরাই। আমদের মাঝে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের তীব্র…

আর যাই হোস্ ডাক্তার হইস না

আর যাই হোস্ ডাক্তার হইস না

চিকিৎসকরা হইলো গোবেচারা সম্প্রদায়। কলুর বলদ। রোগীদের জন্য খেটে যায় দিনরাত... অথচ…

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

বিথী, বয়স ২৪। তার ভাষ্যমতে সে মা বাবার খুব আদুরে মেয়ে। অবাধ…

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

কয়েকদিন ধরে একটা ভুয়া খবর বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটা হলো- ‘ক্যান্সার কোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর