ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৯:৩৭ এএম

বিভীষিকাময় আতংকঃ ক্যান্সার

বিভীষিকাময় আতংকঃ ক্যান্সার

বাংলাদেশে এত বছরেও ক্যান্সার চিকিৎসা মানুষের আস্থায় আসেনি। বোধগম্যহীন কারনে এদেশের মানুষ, যার ক্যান্সার হয়েছে বা ধারনা করছে, তাদের ভিতর যাদেরই সামর্থ্য আছে, চিকিৎসার জন্য ভারতে পাড়ি জমায়। আর যাদের কোন উপায় নাই ধুকে ধুকে মরা ছাড়া তারা দেশে চিকিৎসা নেন।

অথচ ক্যান্সার চিকিৎসায় এমন কোন বেসিক চিকিৎসার পার্থক্য নাই দুই দেশে। আমাদের দেশে খুব ভাল দক্ষ সার্জন আছেন, আছেন আন্তর্জাতিক মানের অনকোলজিস্ট। আর ক্যান্সার সাধারণত ৯৫% ভাল হয় যদি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে। এমন প্রায়ই চোখে পড়ে, একেবারে শেষ পর্যায়, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ত্তখন ধড়া পড়ল তাও রোগী নিয়ে ভারতে যায় মানুষ। ক্যান্সার চিকিৎসায় এই অবিশ্বাস এর কারন কি।

আমাদের দেশে প্রতি বছর এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষ মারা যায় ক্যন্সারের জন্য। এর ভিতর ওরাল ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা হিসাবে বিশ্ব ranking এ দ্বিতীয়। এটা ২০১৪ সালের তথ্য। এই ওরাল ক্যান্সার ছেলেদের ভিতরে দ্বিতীয়, মেয়েদের ভিতর তৃতীয়, আক্রান্তের সংখ্যা হিসাবে ।

এই ওরাল ক্যান্সারের চিকিৎসায় আমাদের অনেক দক্ষ সার্জন আছে। ইনাদের ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলো ফেসিয়াল সার্জন বলা হয়। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই সার্জনদের পরিকল্পিত ডিস্ট্রিবিউশন ও রেডিও থেরাপির সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে, এই ম্যাক্সিলো ফেসিয়াল সার্জনরা ওরাল ক্যান্সারের মৃত্যুহার দ্রুত কমিয়ে দিয়ে মানুষের ক্যন্সার চিকিৎসায় দেশীয় চিকিৎসকদের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় ৬০-৭০% ক্ষেত্রে রেডিও থেরাপি অবশ্যই প্রয়োজন রোগ সারেতে চাইলে। আর কেমোথেরাপি লাগে ২৫-৩০% ক্ষেত্রে। সাথে সার্জারি প্রয়োজনমত। ওরাল ক্যান্সারের রোগীর সুস্থতার জন্য সার্জারির পাশাপাশি রেডিও থেরাপি লাগবে। কেমোথেরাপির কাজ নাই। শুধুমাত্র রক্ত সংক্রান্ত ক্যান্সার, কলোরেক্টাল, ব্রেস্ট ও ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সারে কেমো লাগে। বাকীগুলায় রে থে লাগে সাধারনত।

আগেই বলেছি নিতান্ত গরীবরাই দেশে চিকিৎসা নেয়। সরকারী প্রতিষ্ঠানে ফুল কোর্স রে,থে দিতে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকা লাগে। বেশীরভাগ রোগী দিতে পারে না। কিছু ঢাকায় ক্যান্সার হাসপাতালে, ডিএমসি তে সুযোগ পায়। তাও সিরিয়াল পাওয়া ভাগ্য। তাদের সামর্থ্যর দ্বিগুনের বেশী রোগী প্রতিদিন আসে।

বাংলাদেশে ২ টা ঘটনা দেখা যায় , যার কারন অজ্ঞাত-

এক. সারা বছর ধরে ৯ টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের রেডিও থেরাপি মেশিন সারা বছর অকেজো থাকে। মাঝে মাঝে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলার মত হঠাৎ দু একটি মেশিন অল্প কিছু দিনের জন্য ভাল হয়। তারপর আবার নষ্ট। ২০০৯ - ২০১৫ মেয়াদী পরিকল্পনায় বলা আছে পুরাতন কোবাল্ট মেশিনগুলো বদলে লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন দেবার প্রক্রিয়া চলছে। আজও চলছে।নিয়ম কানুনের নানান প্যাচ, হাই টেক মেশিন, ওয়েল ট্রেইন্ড টেকনিশিয়ান, ইন্সটল করার ইঞ্জিনিয়ার এগুলো একসাথে সমন্বয় করা যায় না। দেখা যায় মেশিন বসাবার পর টেকনিশিয়ান পাওয়া যায় না । কাউরে পাওয়া গেল তাকে ট্রেনিং দিয়ে আনার পর, ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া যায় না, এ এক অদ্ভুত গল্প।

দুই. মানুষের মাঝে একটা ধারনা প্রতিষ্ঠিত যে, ক্যান্সার চিকিৎসা মানে কেমো দেয়া। এখানে আছে কোটি টাকার মন বুঝ দেয়া ব্যবসা। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে দেখেছি আয়রন চিলেশন, ব্লাড দেয়া, পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে চিকিৎসার নামে ব্যবসা। না দেখলে বুঝতাম না যে ক্যান্সার রোগী নিয়ে, থ্যালাসেমিয়া রোগী নিয়ে মানুষে ব্যবসা করতে পারে। তারা নাকি সেবা করছে। প্রতিরোধ নিয়ে কথা নাই এই ব্যবসায়ীদের। যে দেশে শিশু খাদ্যে মারাত্মক জীবানু পাওয়া যাচ্ছে, মেয়াদের সীল তুলে, নতুন সীল মেরে বাজার জাত করে, সেদেশে কেমো, থ্যালাসেমিয়া ব্যবসায়ীরা সব নিয়ন্ত্রণ করবে, প্রতিরোধের পলিসি বাদ দিয়ে, চিকিৎসার গাইড লাইন তৈরি করবে, যা আগেই তৈরি করা আছে।

ক্যান্সার থেকে মুক্তির জন্য প্রাথমিক প্রতিরোধ কর্মসূচি ( এক তামাক জাতীয় পন্য, পান সুপারি নিয়ে প্রচার ) শুরুতেই রোগ নিয়ে চিকিৎসক এর কাছে যাওয়া, দ্রুত রোগ নির্নয়, সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

ওরাল ও ম্যক্সিলোফেশিয়াল সার্জনদের সংগঠন বামোস এর নেতারা বলেছেন যে, এই সার্জনদের সঠিকভাবে কাজে লাগাবার জন্য সরকারী ৯ টি প্রতিষ্ঠান ও অন্য মে ক হাসপাতালে ওএমএস দের পরিকল্পিত পদায়ন করে তাদের দক্ষতাকে, জ্ঞানকে কাজে লাগাতে ঢাকার এটাচমেন্টগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। 

যেমন রংপুর এর মিঠাপুকুর এ কাজ করার সুযোগ নাই। যাকে ঢাকায় দরকার তাকে কক্সবাজার দিয়ে কোন কাজই হবে না। আমার রাজশাহী তে মে ক হাসপাতালে কেউ নাই। আযব। ডে ইউনিটে আছে কিন্তু রোগী তো সব হাসপাতালে আসে। সেবা দিতে পারিনা। আর যে চায় এখানে আসতে সে এটাচমেন্টে বেকার হয়ে গেছে। রংপুর মে ক হাসপাতাল, বগুড়া শহীদ জিয়া মে ক হাসপাতালেও ওএমএস সার্জন নাই। সব পরিকল্পনাহীন।

একই সাথে নেতৃবৃন্দ রেডিও থেরাপি মেশিন দ্রুত সচল করার দাবী জানিয়েছে। কারন তারা যে সার্জারী করছেন তা রেডিও থেরাপির অভাবে সফল হচ্ছে না। বাড়ছে মানুষের আস্থাহীনতা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত