ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
আহমেদ হোসাইন

আহমেদ হোসাইন

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।


২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৩:৫৭

ডা. মনসুর খলিল স্মরণে: আপনারে তুমি রাখিলে আঁধারে

ডা. মনসুর খলিল স্মরণে: আপনারে তুমি রাখিলে আঁধারে

ঈর্ষণীয় মেধা, জ্ঞানের প্রতি সুতীব্র তৃষ্ণা, অপরিসীম দায়িত্ববোধ, আন্তরিক অভিভাবকত্ব ও মানবিক উৎকর্ষতায় যে মানুষটি নিজের অবস্থান নিয়ে গেছেন আকাশসম উচ্চতায়; তিনি চিকিৎসক সমাজের অন্যতম কিংবদন্তী অধ্যাপক ডা. মনসুর খলিল স্যার। পেশাদারি মানসিকতার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজ সন্তানের মত দেখতে পারা এ মহামানব তাঁর মহা প্রস্থানের আগেই জয় করে নিয়েছেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়। নিজ যোগ্যতায় তৈরী করেছেন নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার নতুন মানদন্ড। জ্ঞান জগতের বিচিত্র পরিব্রাজক হিসেবে পথ দেখিয়ে গেছেন গতানুগতিকতার বৃত্ত ভাঙ্গার, ইচ্ছের আলোয় নিজেকে আলোকিত করার। 

অধ্যাপক ডা. মনসুর খলিল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬১ সালের ৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। মা আছিয়া সুলতানা পরিবারের অধিকর্তা। পিতা ডা. মিরাজ আহমেদ ছিলেন সামরিক কর্মকতা। যিনি একসময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি মেঝ, বড় ভাই অধ্যাপক ডা. মহসিন খলিল। বোন সবার ছোট।

দুরন্ত মেধাবী হিসেবে তিনি নিজেকে পরিচিত করেছেন জীবনের শুরু থেকেই। জুলিয়াস সিজারের সেই বিখ্যাত উক্তি “ভিনি ভিডি ভিসি” যার মানে “এলাম, দেখলাম, জয় করলাম” যেন তার জন্যই করা। জীবনের যে প্রান্তে গেছেন দাবড়ে বেরিয়েছেন অপরিসীম দক্ষতায়। তুখোড় মেধার ছাপ রেখেছেন প্রতিটি দিগন্তে । বড় ভাই যখন প্রথম শ্রেণিতে ছিলেন, উনি তখন নার্সারিতে। অসাধারণ ফলাফলের পুরস্কার হিসেবে ডাবল প্রমোশন পেয়ে হয়ে যান ভাইয়ের সহপাঠী। আবার পেলেন ডাবল প্রমোশন! কিন্তু না, সেই ছোট্ট যাদুকর আর উপরের ক্লাসে না গিয়ে বড় ভাইয়ের সাথেই থাকবেন বলে ঠিক করলেন। 

অগ্রযাত্রা চলতে থাকলো একের পর এক। ১৯৭৬ সালে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় চার বিষয়ে লেটারমার্কসহ প্রথম বিভাগ অর্জন। অর্জিত নম্বর ৭৪%। সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১৫তম স্থান। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বোর্ডের অধীনে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা একই রেজাল্টের পুনরাবৃত্তি। চার বিষয়ে স্টার মার্কসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ। ৮২.২% নম্বর পেয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় আবারো ১৫তম স্থান। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েও শুধুমাত্র বড় ভাইয়ের সাথে পড়তে চলে আসা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। মেধার কী অভিনব স্বেচ্ছাচারিত্ব!

মেডিকেল জীবন শুরু করেন ম-১৬ ব্যাচে। মেডিকেল প্রাঙ্গণেও রচিত হতে থাকল ধারাবাহিক সফলতার মহাকাব্য। অভূতপূর্ব ফলাফলে হয়ে ওঠেন ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় প্রথম স্থান; দ্বিতীয় ও তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান এবং চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন। শুধু কমিউনিটি মেডিসিন ও ফরেনসিক মেডিসিন ছাড়া বাকি সব বিষয়ে অনার্স মার্কস প্রাপ্তি। কী অসাধারণ ধারাবাহিকতা! 

১৯৮৪ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহকারী সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে ৮ম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে স্বাস্থ্য ক্যাডারে পুরো বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। শরিয়তপুরের জাজিরা থানায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়তার সাথে দুই বছর (১৯৮৬-৮৮) দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রভাষক ছিলেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে এনাটমিতে এমফিল করতে আইপিজিএমআর এ আসেন। এমফিলেও প্রথম স্থান অর্জন!

যদিও বাবার  ইচ্ছে ছিল তাঁর তুখোড় মেধাবী ছেলেটিকে অনেক বড় সার্জন হিসেবে দেখার। কিন্তু ডা. মনসুর খলিলের স্বপ্ন ছিল নিজেকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে গড়ার। তাই তাঁর পছন্দ ছিল এনাটমি। এমফিল শেষে ১৯৯৩ সালে এনাটমি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে। পিএইচডি অর্জনের জন্য ১৯৯৪ সালে পাড়ি জমান জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৯৯ সালে। সেখানেও তিনি রেকর্ড সংখ্যক নম্বর অর্জন করে স্পেশাল রিকমেন্ডেশন পান। তাকে গবেষণার কাজে জাপানে থেকে যেতে বলা হলো বেশ উচ্চ পারিশ্রমিকে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। অর্থ আর আর সম্মানের লিপ্সা কখনও তাকে স্পর্শ করেনি। 

 

১৯৯৯ সালে দেশে ফিরে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। ২০০১ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। জ্ঞান অর্জনের এক অদম্য কিন্তু ব্যতিক্রমী নেশায় ২০০১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি এনাটমির কম্পারেটিভ এনাটমিতে এমএস কোর্সে প্রবেশ করেন তিনি। সাফল্যের পুষ্পমাল্যে এখানেও তার একচ্ছত্র অধিকার। ফলাফল অবধারিতভাবেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র এনাটমিস্ট যিনি মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যকার তুলনা নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন।

এক কর্মস্থলে বেশিদিন মন টিকতো না তার। বদলি হয়ে ২০০১ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে চলে আসেন খুলনা মেডিকেল কলেজে। ২০০২ সালে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে। এখানে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরই মাঝে ২০০৪ সালে সিওমেক থেকেই ফরেনসিক মেডিসিনে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। বরাবরের মতো এখানেও প্রথম স্থান। ২০০৫ সালে অর্জন করেন ফরেনসিক মেডিসিনে এমসিপিএস ডিগ্রি।

২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন থেকে লাভ করেন গগবফ ডিগ্রী। এরপর ২০০৯ এ যোগদান করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ২০১১ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন কিশোরগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে। নতুন প্রতিষ্ঠিত এই মেডিকেল কলেজটিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন তিনি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে একসময় তার হাত ধরে দাঁড়িয়েছে মেডিকেল কলেজটি। ভবন প্রতিষ্ঠা, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, বিভাগগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগসহ সব বিষয়ে তিনি বলতে গেলে একাই দৌড়েছেন। তরুণ শিক্ষার্থীরা যাতে নতুন ক্যাম্পাস হিসেবে কোনোভাবেই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় সেই চিন্তাই তার মাথায় ছিল সবসময়। 

এত মেধা, এত অর্জন সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন একেবারেই প্রচারবিমুখ। তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান ছিল তার ছাত্র-ছাত্রীদের কেন্দ্র করেই। ক্লাসের নির্ধারিত সময়সীমা শেষেও বিকেলে এবং রাতে শিক্ষার্থীদের পড়াতেন নিজ উদ্যোগে। নিঃস্বার্থ মানুষটির বিশেষ দৃষ্টি থাকত দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি। একজন আদর্শ পিতার মতোই তিনি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সবধরনের খোঁজ রাখতেন। ফোন দিতেন মাঝে মাঝেই। তিনি বলতেন, ‘এই মেডিকেল তোমাদের মা, আর আমি তোমাদের বাবা।’ মেডিকেল অঙ্গনের পিতৃসম এই ব্যক্তিটি অনেকটা নিভৃতেই চলে গেলেন ২০১৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর। ফুসফুসের জটিলতা ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। প্রিয় ক্যাম্পাস ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ত্যাগ করেন তার শেষ নিঃশ্বাস। 

ডা. মনসুর খলিল মেধার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় ছিলেন। যোগ্যতায় ছিলেন অতুলনীয়। বাংলা ছাড়াও জানতেন ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি, হিন্দি, জাপানিজ ও জার্মান ভাষা। চাইলেই পারতেন শত সীমাবদ্ধতায় ঘেরা এই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ভোগ বিলাসের সুস্থির জীবন। সে সক্ষমতা তার ছিল। সুযোগ ছিল আকাশ সমান খ্যাতি বগলদাবা করার। সব বাদ দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন দুটো শার্ট দুটো প্যান্ট নিয়ে জৌলুশহীন জীবনযাপন।  মাথা গোজার জন্য ছোট্ট একটি বাসা। আসবাব হিসেবে সামান্য কাঠের চৌকি, সস্তা দরের চেয়ার-টেবিল আর মূল্যবান সামগ্রী বলতে অনেকগুলো বই। অকৃতদার এই মানুষটি বেতন যা পেতেন তার বেশিরভাগ খরচ করতেন অন্যদের জন্য। প্রায়ই বই কিনে উপহার দিতেন ছাত্র-ছাত্রীদের। নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে বাকী টাকা পাঠিয়ে দিতেন মাকে। মা যখন মৃত্যুবরণ করলেন সে টাকাগুলো চলে যেতে লাগলো এতিমখানার তহবিলে। তার মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত একাউন্টে পাওয়া গেল মাত্র দু হাজার টাকা! 

ডা. মনসুর খলিলেরা বছর বছর জন্মান না। জীবনের সবটুকু দিয়ে যে অর্জন তারা কিনে নিয়েছেন তার প্রতিদান শুধু মৃত্যুদিনে স্মৃতিচারণে নয়। যে অকৃত্রিম আদর্শ তিনি লালন করেছেন কোমল হৃদয়ে, যে অকুন্ঠ দরদ ধরে রেখেছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেই অনুভূতিগুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করা অবধারিতভাবেই আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। খ্যাতি-যশ, লোভ, বিত্ত-বৈভবের সীমাহীন জৌলুশ ছেড়ে আমরাও যদি মানবতার জন্য, সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কিছুটা ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা তৈরি করতে পারি; প্রথাগত অনিয়মকে অবহেলা করে; কোনো কাঙ্খিত সুন্দরের প্রত্যাশায়; তবেই তাদের মতো মহামানবেরা প্রকৃত মূল্যায়ন পান। ভালবাসার ফলাফল অনুস্মৃতিতে, মুগ্ধতার প্রকাশ আনুগত্যে; ঠাট দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় নয়।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত