ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


২২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৮:০৬ পিএম

দেশপ্রেম, বৈদেশিক মুদ্রা, দেশের ভাবমূর্তি 

দেশপ্রেম, বৈদেশিক মুদ্রা, দেশের ভাবমূর্তি 

বিনিশা শাহ, নেপালী মেয়েটা, ১৮ বছর বয়স হবার অনেক আগেই ডাক্তার হবার এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে একদিন বাংলাদেশে পাড়ি জমালো। ভর্তি হল এক বেসরকারি এক ডেন্টাল কলেজে। মা তার প্রতিদিন ক্যালেন্ডার এর পাতায় একটা করে দিন কেটে দেয়। আর ভাবে, আর ৩ বছর ৩৬৪, ৩৬৩, ৩৬২ ...

ওরা আদিবাসী। এদের বাড়তি আয়ের তেমন ব্যবস্থা নাই। সবচেয়ে ভাল জমিটা বিক্রি করে দিয়েছেন ভর্তির সময়। আরও একটা বিক্রি করবেন ভেবে রেখেছেন মেয়ে ৩য় বর্ষে উঠলে। সেটা দিয়ে বাকীটা হয়ে যাবে।

বাবা বাংলাদেশ এসে জানতে পারেন মেয়ে পরীক্ষায় খারাপ করছে। প্রতি বছরের জায়গায় ছয় মাস, কখনও একবছর বেশী লাগছে। 

বিনিশা বাবাকে ধরে কাঁদছে। একসময় তার বাবাও কাঁদতে শুরু করে। যাবার সময় মেয়েকে বলে যান এবার পাশ না করলে, তার পক্ষে আর সম্ভব না। দেশে ফিরে যেতে হবে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, ভাবতে থাকে দেশে ফিরে গেলে বাবার কত টাকা জলে যাবে। বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না। ভাবে মরে যাওয়াই ভাল।

প্রচুর পড়ছে বিনিশা, রাত দিন এক করে। তারপর পর পরীক্ষার দিন আসল। সে বুঝতে পারে না কেন তার কলম চলছে না। অতিরিক্ত মানসিক চাপে মাথাটা ফাঁকা লাগছে। সব কমন। তাও লেখা আগায় না। দেশে চলে যেতে হবে, লেখতেই হবে, কিন্তু অজানা আতংক ভর করেছে। সব ভুলে গেছে। কিছু মনে আসছে না। সারা শরীর কাঁপছে। দেখছে ছোট বেলায় পাহাড়ি পথে দৌড়াচ্ছে। মা, বাবা সবার কথা মনে হচ্ছে। আর পারছে না বিনিশা অনেক আগেই। রুমে গিয়ে বিনিশা এক পাহাড় যন্ত্রণা থেকে নিজেকে বাঁচারার জন্য, চির দিনের শান্তিকে আলিঙ্গন করল। আর আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা কত লোভী৷ আমাদের বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষার নির্মম, নির্লজ্জ ব্যবসা।

বাংলাদেশের ডেন্টাল কমিউনিটির একজন হিসাবে আমি বিনিশা, তার বাবা মার কাছে ক্ষমা চাই। বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবেও ক্ষমা চাই মামনি। আমরা আজও পারিনি বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনূকুল পরিবেশ দিতে। যা পেরেছি তা নিজেদের সীমাহীন লাভের জন্য দেশের পিঠে ছুরি মারতে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রচুর ছেলে মেয়ে আসে বিদেশ থেকে সরকারি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়। এক রংপুর ডেন্টাল কলেজেই কমপক্ষে ৫০ জন পড়ে। এখান থেকে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আসে। করও পায় সরকার। এটা তো সরকারের একটা ভাল খাতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু বেসরকারি ডেন্টাল কলেজগুলোতে অভিনব নতুন নতুন ইনোভেশন হয়৷ কিভাবে ২০ লাখের প্যাকেজ ২৫ লাখে ঠেকানো যায়। আর এই বিদেশী মেয়েরা যারা বিনিশার মত জীবন দিতে পারে না, এদের অনেককেই শুনি হয়ে যেতে হয় এটিএম বুথ নাহলে নিজের শরীরকে করে ফেলতে হয় পণ্য।

কিভাবে মুক্তি আসবে এই অবস্থা থেকে। এটা চলতে থাকলে একদিন ডেন্টালে বিদেশীরা আর আসবে না। বেসরকারি ডেন্টাল কলেজের মালিকরা হয়ত ভাবেন সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মত জবাই করতে। নারায়ন নগদ হলেই মজা। কিন্তু দেশ কী হারাবে? কী আর হবে, চিংড়ি, আম বা গার্মেন্টস এর মত হবে।

আমরা কী পারি না একটা মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তুলতে। পারিনা একটা সেল বা পোর্টফলিও তৈরি করতে। যারা পরীক্ষা করে জানাবে কোন কোন ডেন্টাল কলেজের পরিবেশ বিদেশী বান্ধব। শুধু সেখানেই ভর্তি হবে বিদেশীরা। পারিনা একটা নির্দিষ্ট টাকার পরিমাণ ঠিক করে দিতে। পরে পাশ করুক না করুক আর একটা টাকাও নিতে পারবে না। মাঝে মাঝেই তাদের সাথে কথা বলা, কি সমস্যা আছে, তারা কেমন আছে? তাদের অভাব অভিযোগ শুনে, কোন রেফারেন্স উল্লেখ না করে সংশ্লিষ্ট কলেজকে বলা হয় যে, এই এই ধরনের কোন অভিযোগ না আসে। মনিটরিং মনিটরিং মনিটরিং জরুরী।

বছরের সেরা চোখে ধুলা দেয়া: এক বেসরকারি ডেন্টালের পরিচালক এই জরিমনা ব্যবসা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন " আমি তো কিছুই জানিনা এই জরিমনা নেবার কথা। আমার কলেজে এগুলো নাই। সব নিয়ম মত চলছে। আমাকে তো কেউ অভিযোগ করেনি। করলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিব।" হায় সেলুকাস, চিকিৎসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট যে কেউ জানে, ব্যবস্থা ঠিক নিবে তবে সেটা অভিযোগকারীকে আরও একবছর বেশী পড়তে হবে।

বি. দ্র:: সাংবাদিক চলিয়া যাইবার পর পরিচালক সাহেব অফিস থেকে করবী, টগর, জুই কাউকে ডেকে বলেন যে, আজ জরিমনার টাকা কত জমা হইছে? দাও, আমার মেয়ে আজ একটু রেডিসনে খেতে চেয়েছে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত