ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:৫৫ পিএম

কবিরাজ : নেপোয় খায় দই

কবিরাজ : নেপোয় খায় দই

সমাজ থেকে কুসংস্কার অপসারনের দায়িত্ব শিক্ষিত যুবসমাজকেই নিতে হবে। অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবিরাজ। 

এটা আমাদের সমাজে প্রচলিত অতি জঘন্য একটি কুসংস্কার। কিছু রোগ আছে যা চিকিৎসা ছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায় । চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় self limiting disease. সবার এ রকম কম-বেশি অভিজ্ঞতা থাকার কথা, যেখানে দেখা গেছে তিনি জ্বর বা পেট বেথা আক্রান্ত হয়ে এক দিন বা দু দিন পর কোনও ওষুধ না খেয়েই ওই জ্বর বা পেট বেথা ভালো হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় ওই গ্রামে কোনও বেকার লোক নিজেকে কবিরাজ দাবি করলে সহজ সরল সাধারন রোগীরা তার কাছে যায় । ফলে পরের দিন জ্বর বা পেট বেথা যখন নিজে থেকে ভালো হয়, তখন ওই কবিরাজের খুব সুনাম হয়!

অন্যদিকে, যেসব রোগ চিকিৎসা ছাড়া ভালো হয় না, সেসব ক্ষেত্রে কবিরাজের অন্ধ ভক্ত রোগীরা দিনের পর দিন কবিরাজের পিছনে হাজার হাজার টাকা ঢালে। ঢালতে ঢালতে এক সময় তার টাকা শেষ হয়ে যায়, আর সে সময় নাগাদ তার রোগ জটিল আকার ধারন করে। তখন ওই রোগী খালি হাতে সরকারি হাসপাতালে আসে। তখন ওই জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ৫০০ টাকার ওষুধ কিনার দরকার হলে, রোগী সরকারি হাস্পাতালের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুরু করে, "ডাক্তারেরা আমারে ওষুধ দেয় না"। উদাহরন স্বরূপ, কোনও এক রোগীর হাত ভাঙ্গার পর কবিরাজের কাছে দেড়-দুই মাস সময় পার করে পরে পচা হাত নিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। আবার কেউ কেউ পায়ু পথে রক্ত আসার কারনে কবিরাজের কাছে মাসের পর মাস টাকা খরচ করে পরে খালি হাতে এসে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জানা গেল এটা মলদ্বারের ক্যান্সার এবং এতদিনে এটা সারা শরীরে ছড়িয়ে গেছে, তাই চিকিৎসা করে কোনও লাভ হবে না। অথচ ওই রোগী যেদিন থেকে কবিরাজের কাছে যাওয়া শুরু করেছিল, সেদিন যদি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতো, তাহলে অপারেশন করে রোগ ভালো হতে পারতো !

আবার, এম বি বি এস ডাক্তার কোনও রোগীকে জরের জন্য ৭ দিনের ওষুধ দিলে রোগী ৬ দিন ওষুধ খেয়ে অধৈর্য হয়ে ৭ম দিন সকালে কবিরাজের কাছে গেলে ঐ দিন বিকালে যখন জ্বর থামে তখন মূর্খ রোগী বলতে শুরু করে, " ৬ দিন ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে আমার এক পইসার উপকার হয় নি, অথচ কবিরাজের কাছে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার জ্বর সেরে গেছে!" নেপোয় মারে দই! আহা!!

মূর্খতা আর অন্ধভক্তির কারনে ১ জন রোগী যখন কবিরাজের কাছে যায় , তখন ধুরন্ধর কবিরাজ রোগীকে এমন কিছু কাজ করতে বলে যাতে করে ওই রোগী কবিরাজকে অনেক বড় জ্ঞানী / আধ্যাত্মিক সাধক বলে মনে করে! উদাহরন্সরুপ, ধুরন্ধর কবিরাজ রোগীকে বলে , " আগামীকাল সকাল বেলা খালি মুখে আপনাদের ঘরের পিছনের পুকুরের থেকে এক বোতল পানি আনবেন আর ঐ পানি বোতলে ঢুকানোর মুহূর্তে কেউ আপনাকে ডাকলে আপনি সাড়া দিবেন না"!

সবাইকে এ কথা বুঝতে হবে যে, 

(ক) কবিরাজ নিজে যখন অসুস্থ হয় তখন সে এম বি বি এস ডাক্তারের কাছে চলে আসে চিকিৎসার জন্য, আর নিজে কবিরাজ সেজে মূর্খ এবং নির্বোধ মানুষের সাথে প্রতারনা করে রোগীর ক্ষতি করে। 

(খ) এম বি বি এস ডাক্তার কখনোই চিকিৎসার জন্য কবিরাজের কাছে যায় না। 

(গ) বেকার লোক যখন আর কোনও পথ খুজে পায় না, তখন সে কবিরাজ সাজে।

এমন অনেক পেট বেথা আছে যা, গড়ে প্রতি ৩ বা ৪ মাসে একবার আসে তারপর ১ বা ২ দিন থেকে নিজে নিজেই ভাল হয়ে যায় । কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, অনেক হাইস্কুল শিক্ষককে দেখেছি এ ধরনের পেট বেথার জন্য কবিরাজের কাছে গিয়ে নাভি খোলাতে ! আফসোস ! শিক্ষিত লোক যদি এভাবে মূর্খদের মতো আচরন করে, তাহলে মূর্খরা কি করবে? অথচ, শিক্ষকের দায়িত্ব (অঘোষিত / অলিখিত) হচ্ছে সমাজের কুসংস্কার দূর করা!

তাই, নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত যুবসমাজকেই সমাজের এসব আত্মঘাতী কুসংস্কার অপসারনের দায়িত্ব নিতে হবে।

 

এ সপ্তাহে ৪২তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি 

আরও ২০০০ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত