রবিবার ১৭, ডিসেম্বর ২০১৭ - ২, পৌষ, ১৪২৪ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. আলী আকবর রউফ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সার্জারী বিভাগ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


রোম, রোমান সভ্যতা ও কলোসিয়াম (পর্ব- ৪)

নীরু এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্য তখনকার সংখ্যালঘু গুটিকয়েক খ্রিস্টানদের দায়ী করেছিলেন। তাদের কাউকে গায়ে পশুর চামড়া জড়িয়ে কুকুরকে খেতে দিয়ে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করে মেরেছিলেন। আবার জীবন্ত কারো গায়ে আগুন ধরিয়ে রাতের বেলায় তার বাগানে আলোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

ত্রাণ- পুর্নবাসন, নগরীর পুর্নগঠন ও ডোমাস অরিয়াস নির্মাণের ব্যয়ভার মেটাতে কোষাগার অর্থশূণ্য হয়ে পড়েছিল। তাই নীরু বিভিন্ন প্রদেশ থেকে নির্ধারিত রাজস্ব ও ধনী শ্রেণীর উপর ট্যাক্সের হার বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সার্চ থেকে চাঁদা আদায় করেতেন তাছাড়া মুদ্রার আকার ছোট করে এবং তাতে খাদের পরিমাণ বাড়িয়ে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছিলেন। 

৬৫ খৃষ্টাব্দে গেইয়াস ক্যালপুর্নিয়াস পিসো নামক রোমান স্টেটম্যান কয়েকজন সিনেটর, প্রিটোরিয়ান গার্ডের কমান্ডার ও সমাজের উঁচু শ্রেণীর কিছু নাগরিকদের নিয়ে নীরুকে হত্যা করে সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র শুরু করে। মুক্তমানব মাধ্যমে তা ফাঁস হয়ে যায় এতে নীরু ১৯ জন সিনেটর সহ মোট ৪১ জনকে মৃত্যু দন্ডে দন্ডিত করেন যার মধ্যে বিখ্যাত কবি লুকাস ও ছিল।

৬৬ সালের শেষের দিকে নীরু ১৫ মাসের লম্বা সফরে গ্রীস চলে যান। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন, অংকন ক্রিড়া ঘোড়দৌড় ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। গ্রীসের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য কয়েকটি জেলাকে সার্বভৌমত্ব দান করেন। ফেব্রুয়ারী '৬৮ নীরু প্রতিযোগিতায় জেতা ১৮০৮টি প্রথম পুরস্কার সাথে নিয়ে রোমে ফিরে আসেন । নীরুর অবর্তমানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দেয় যা তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন। প্রিটোরিয়ান গার্ড বাহিনী ও সিনেট তার বিপক্ষে চলে যায়।

৬৮ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে সিনেটে নীরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে তাকে গণবিরোধী সম্রাট হিসাবে দোষী সাব্যস্ত করে এবং হিস্পানিয়ার গভর্নর গেলবা কে পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা করে । নিজের বন্দী হওয়া ও শাস্তি কার্যকর অত্যাসন্ন জেনে ৯ই জুন গলায় ছুরি বসিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন । মৃত্যুকালে তার শেষ কথা ছিল " What an artist die on me".

নীরুর মৃত্যুর পর সিনেটর, গণ্যমান্য ও উচু ধনী শ্রেণীর লোকজন স্বাগত জানালেও নিম্ন শ্রেণীর মানুষ, দাস, মুক্ত মানব, শিল্পী ও থিয়েটার কর্মী সহ অনেকের মাঝেই নেমে এসেছিল হতাশা । সেনাবাহিনী ছিল দ্বিধাগ্রস্ত, একদিকে নীরুর প্রতি আনুগত্য আর অন্যদিকে আর্থিক ভাবে লাভবান হবার প্রলোভন, তাই তারা দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছিল। নীরুর নাম বিভিন্ন মনুমেন্ট থেকে মুছে ফেলা হয়, অনেক ভাস্কর্য চুরমার করা হয় এবং এর বেশীর ভাগই ছিল নীরু বিরোধীদের ব্যাক্তিগত প্রতিহিংসার জের। নীরুপ্রেমী সাধারণ জনগণ বিশেষ করে ইস্টার্ন সাম্রাজ্যে নীরুর মৃত্যুকে বিশ্বাস করত না, অনেকদিন ধরেই তাদের বিশ্বাস ছিল নীরু একদিন স্বরুপে ফিরে আসবেই ।

নীরুর মৃত্যুর পর রোমে চরম বিশৃঙ্খলা অরাজকতার সৃষ্টি হয়, শুরু হয় গৃহযুদ্ধ । সিংহাসনে আরোহণ করে কেহই বেশী দিন টিকে থাকতে পারেনি। এক বছরেই চারজন সিংহাসনে আরোহণ করেছে যথাক্রমে গেলবা, অথো, ভিটেলিয়াস ও ভেসপাসিয়ান। সেজন্য ৬৯ সালে "Year of four emporer" হিসাবে খ্যাত।

প্রিটোরিয়ান বাহিনীর সমর্থনে রোমে ঢুকে গেলবা প্রথমেই নীরুর সকল পৃর্নগঠন কর্মসূচী বন্ধ করে দেন যেখানে অনেক গণ্যমান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গের স্বার্থ জড়িত ছিল। বহু সিনেটর ও সম্ভ্রান্ত বংশীয় লোকদের বিনা বিচারে হত্যা করেন। রোমে যারা গেলবাকে সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি তাদের সবাইকে যথেষ্ট জরিমানা দিতে হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রিটোরিয়ান বাহিনীকে তাদের প্রাপ্য প্রতিদান দিতে অস্বীকার করেন। সাধারণ জনগণও গেলবার এহেন কর্মকাণ্ডে তার বিপক্ষে চলে যায়। ৬৯ সালের ১লা জানুয়ারী সেনাবাহিনীর জার্মান লিজিয়ন গেলবার আনুগত্য স্বীকার করেনি, শপথ গ্রহণ না করে পরদিনই তাদের গর্ভনর ভিটেলিয়াসকে সম্রাট ঘোষণা করে। সে সুযোগে উচ্চ বংশীয় উচ্চাভিলাষী লুসিটানিয়ার গভর্নর মারকাস সালভিয়াস অথো ( পপাইয়া সাবিনার দ্বিতীয় স্বামী) প্রিটোরিয়ান বাহিনীকে প্রচুর অর্থ ঘুষ দিয়ে তার পক্ষে নিয়ে যান এবং প্রিটোরিয়ান গার্ডরা গেলবাকে রোমান ফোরামে হত্যা করে। 

সেই দিনই সিনেটে অথোকে সম্রাট ঘোষণা করে । যদিও অথো কিছুটা লোভী ও উচ্চাভিলাষী ছিল তবুও তার নিষ্ঠুরতা বা প্রতারণার কোন অভিযোগ ছিল না। ক্ষমতায় বসে অথো সকলের সমর্থন তার পক্ষে নেয়ার জন্য নীরুর ভাস্কর্য পূনস্থাপন করেন এবং তার সকল মুক্ত মানব ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্ব স্ব স্থানে পূর্নবহাল করেন। নগরীতে শাস্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে জার্মান লিজিয়ন ও তার আশেপাশের সকল বাহিনী ভিটেলিয়াসকে সম্রাট ঘোষণা করে রোম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাত এড়াতে অথো ভিটেলিয়াস এর কাছে সম্রাজ্য ভাগাভাগি ও তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব সহ সমঝোতা পাঠান যা ভিটেলিয়াস প্রত্যাখ্যান করেন। বেড্রিয়াকামের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অথো পলায়ন কিংবা প্রতিআক্রমন না করে আত্মহননের পথ বেছে নেন ।

চলবে-------

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ

অসহায় আত্মসমর্পণ

অসহায় আত্মসমর্পণ

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:১৬

ওষুধের দোকানদার

ওষুধের দোকানদার

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২১:৪৫

১৭২ বছরে এনেসথেসিয়া

১৭২ বছরে এনেসথেসিয়া

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৪:৪৮


গুটিবসন্তের উপকথা (শেষ পর্ব)

গুটিবসন্তের উপকথা (শেষ পর্ব)

০৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৬:৫৪


গুটিবসন্তের উপকথা (পর্ব-২)

গুটিবসন্তের উপকথা (পর্ব-২)

০৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৩:১৪

গুটিবসন্তের উপকথা (পর্ব-১)

গুটিবসন্তের উপকথা (পর্ব-১)

০৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১২:৫৯











শিশু কিশোরদের পাইলস

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:৩২

স্যালুট টু ইউ ডক্টর

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:৪১
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর