ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, জুলাই ২০১৮ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



স্বপ্নসারথি রাফি

শিক্ষার্থী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। 


গুটিবসন্তের উপকথা (শেষ পর্ব)

জাপানে গুটিবসন্তের জন্য দায়ী করা হতো 'অনরুয়ো' নামক এক অশুভ আত্মাকে, যে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পৃথিবীতে নেমে আসতো। এছাড়া শিনতো ধর্মে এ রোগের জন্য যে অশুভ শক্তিকে (শিনতো ধর্মে এ ধরণের অশুভ শক্তিকে বলা হয় 'কেমি') দায়ী করা হতো, তা হলো 'সুমিয়োশি সানজিন'। এটি মূলত তিনজন অপশক্তির সম্মিলিত রূপ। তারা হলো সুকুসুসু নোওনো মিকোতো, নাকাসুসু নোওনো মিকোতো ও ইউয়াসুসু নোওনো মিকোতো, যারা মূলত সমুদ্র দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিল। আর গুটিবসন্ত যেহেতু সমুদ্রপথেই জাপানে বিস্তারলাভ করে, তাই তাদেরকেই এ ভার নিতে হয়। শিনজেই হাকিরো তামেতোমো (১১৩৯-১১৭০) ছিলেন জাপানের ওশিমা দ্বীপের একজন বিখ্যাত সামুরাই তীরন্দাজ। প্রচলিত আছে তিনি সে দ্বীপের গুটিবসন্তের জন্য দায়ী একজন দৈত্যকে পরাস্থ করেছিলেন। এজন্য জাপানে গুটিবসন্ত আক্রান্ত রোগীদের ঘরে তাঁর ছবি ঝোলানো থাকত। 'Red treatment' এর ধারণাও আসে সেখান থেকেই। এছাড়া তারা দেবতাকে তুষ্ট করতে রোগীর সামনে 'সানশিন' নামক বিশেষ বাদ্যযন্ত্র বাজাত এবং 'সিংহনৃত্য' পরিবেশন করতো। ওকিনাওয়া দ্বীপে প্রচলিত 'Ryukyu' ভাষায় কিছু 'Ryuka' বা বন্দনাশ্লোকের নিদর্শন পাওয়া যায়, যেগুলো গুটিবসন্ত রোগীর রোগ নিরাময়ে পঠিত হতো।

আফ্রিকার ইয়োরুবা ধর্মে গুটিবসন্তের দেবতা হলো সপোনা (Sopona/ Shapona)। তারা বিশ্বাস করতো, তার অসন্তুষ্টিতে পৃথিবীতে নেমে আসে মহামারী। সেসময় সপোনার নাম উচ্চারণ ছিল নিষিদ্ধ। তাই মানুষ তাকে ডাকতো 'ওমোলু' বা 'বাবালু আয়ে' নামে। সপোনার মূর্তিতে দেখা যায় তিনি লাল, কালো আর সাদা রঙে সজ্জিত, খড়ের জামা ও টুপি পরিহিত। কিছু সংস্কৃতিতে তার হাতে থাকে জাজারা নামে বিশেষ ঝাড়ু, গলায় থাকে লাগুইদিবা নামের বিশেষ কালো নেকলেস। আমেরিকায় আফ্রিকান দাসসম্প্রদায়ের মাঝে এই দেবতা 'বাবালু আয়ে' নামে পরিচিত ছিল। আর দাহিমি ধর্মে গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা, এইডস মহামারীর দেবতা 'শাকপাতা' বা 'শাকপানা'। আফ্রো ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতিতে তাকে বলা হতো 'শাকপাতা-ওমোলু'। তার পূজার জন্য তৈরী হয়েছিল মন্দির। মানুষের ধারণা ছিল পুরোহিতরা যেহেতু সপোনার কাছাকাছি থাকে, তাই রুষ্ট হলে রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা তাদেরও আছে। আর এর অপব্যবহার সত্যিই করত পুরোহিতরা। কিছু গবেষকের মতে আফ্রিকায় গুটিবসন্ত ছড়ানোর পেছনে এই পুরোহিতদের হাত রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ১৯০৭ সালে বৃটিশ আফ্রিকায় সপোনার পূজা নিষিদ্ধ করা হয়, যদিও সমাজে এর প্রচলন থেকেই যায়।

খ্রিস্টধর্মে গুটিবসন্তের ত্রাণকর্তা হলেন ফ্রান্সের রেমিস শহরের গীর্জার বিশপ সেইন্ট নিকাসিয়াস (Saint Nicasius or Nicaise of Rheims)। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে দুটো বিবরণ পাওয়া যায়। একটা হলো, ৪০৭ খ্রিস্টাব্দে যখন ভান্দাল উপজাতির যোদ্ধারা ফ্রান্স আক্রমণ করে, তখন তাঁকে হত্যা করা হয়। সেসময় তিনি বাইবেলের Adhaesit pavimento anima mea ("My soul is attached unto dust") এই অংশ পড়ছিলেন। যখন তাঁর শিরোচ্ছেদ করা হয় এবং তাঁর মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখনো তিনি পড়েই যাচ্ছিলেন, Vivifica me Domine secundum verbum tuum ("Revive me, Lord, with your words")। এজন্য তিনি একজন cephalophore ("head-carriers") হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর প্রতিরূপে দেখা যায় তিনি তাঁর কাটা মস্তক হাতে ধারণ করে আছেন। তবে এই মিথে গুটিবসন্ত বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আরেকটা মিথ অনুসারে নিকাসিয়াস গুটিবসন্ত দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং পরে সুস্থ হন। ৪৫১ খ্রিস্টাব্দে হান সম্প্রদায় যখন ফ্রান্স আক্রমণ করে, তখন তাঁকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে তিনি গুটিবসন্তের ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর কাছে প্রার্থনার ধরণটা এরকম, "In the name of our Lord Jesus Christ, may the Lord protect these persons and may the work of these virgins ward off the smallpox. St. Nicaise had the smallpox and he asked the Lord [to preserve] whoever carried his name inscribed. O St. Nicaise! Thou illustrious bishop and martyr, pray for me, a sinner, and defend me by thy intercession from this disease. Amen."
বিজ্ঞানের উন্নতিতে মানবজাতির সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় প্রকৃতির অভিশাপ গুটিবসন্তের বিলুপ্তি হয়েছে। কিন্তু তার ক্ষতগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য মিথগুলো আজো রয়ে গেছে অনেক সংস্কৃতিতে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

ডা. সুবর্ণ শামীম আলো। একজন মেধাবী চিকিৎসক। লাখ লাখ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে…

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

রাফা। এ দুই শব্দের নামের প্রতি মেডিকেল শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের কী যে টান!…

রাফার জীবনের শেষ স্ট্যাটাসে তার বাবা!

রাফার জীবনের শেষ স্ট্যাটাসে তার বাবা!

মেডিভয়েস ডেস্ক: মেডিকেল শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক সমাজকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে…

বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া এক বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প

বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া এক বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প

বিশ্ব ফুটবল সংস্থা ফিফার বিশ্বকাপ ডোপিং নিয়ন্ত্রক দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন…

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

ডা. এসএম মলি রেজা। পেশায় চিকিৎসক এই নারী টিভি পর্দার সামনে ও পেছনে কাজ…

গৌরবের ৭৩ বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

গৌরবের ৭৩ বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মেডিভয়েস ডেস্ক: আজ ১০ জুলাই, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৭৩ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর