ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


শেবাচিমের গোল্ডেন জুবিলী আর কোটি টাকার স্বপ্ন

প্রেক্ষাপট:
***********
আমি কখনো পিজির লাইব্রেরিতে পড়তে যাইনি। পাশ করার তেরো মাস পরে বিদেশে এসেছি পড়াশুনা করার জন্য। বিদেশের মেডিকেল লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করার পর একবার দেশে যেয়ে পিজির লাইব্রেরিতে যেয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এখানে চেয়ারের মালিকানা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। অনবরত পাশের রাস্তায় গাড়ির হর্ণের শব্দ। ক্যান্টিন-লাইব্রেরীর অবস্থাও তথৈবচ। বিদেশের তুলনায় এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে পড়াশুনা করে আমাদের যে সাফল্য, তা আলাদিনের চেরাগের চেয়েও আশ্চর্যজনক। সেদিন আমেরিকার এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গেলাম। সাত তলা লাইব্রেরি। গোলমাল-কোলাহল-শব্দের মাত্রার উপর ভিত্তি করে এই সাত তলাকে ভাগ করা হয়েছে। যারা গ্রুপ স্টাডি করবে, পড়ার সময় শব্দ করবে, তাদের জন্য এক তলা, যারা গ্রুপ স্টাডি করবে কিন্তু বেশি শব্দ করবে না- তাদের জন্য দোতলা, যারা নিঃশব্দে পড়বে, তাদের জন্য তিনতলা, যারা একা একা গভীর মনযোগে পড়বে- তাদের জন্য চারতলা, যারা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাবে, তাদের জন্য সাততলা। কি কান্ড কারবার- শুধু এক লাইব্রেরিতেই! আর আমরা?
*
দাক্ষিণ্য:
********
খতম তারাবীহ পড়ি স্থানীয় একটি মসজিদে। সুন্দর এবং বিশাল মসজিদ। সাতাশ রোজা-র রাত। এশা-র নামাজের পরে ইমাম বললেন, তারাবীহ শুরু হওয়ার আগে পনের মিনিট মসজিদের জন্য চাঁদা তোলা হবে। তিনি পাঁচ মিনিট বক্তব্য রাখলেন। বললেন, তাদের এক লক্ষ ডলার প্রয়োজন। এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে বললেন, তিনি পঁচিশ হাজার ডলার দিবেন। তীব্র তাকবীরের মধ্যে দ্বিতীয় একজন দাঁড়িয়ে বললেন যে তিনিও পঁচিশ হাজার ডলার দিবেন। তাকবীর হচ্ছে। দোতলার পিছন থেকে লোক মারফত এক মহিলা বলে পাঠালেন, তিনি তার সমস্ত সোনা-গহনা দান করে দিবেন যার আনুমানিক মূল্য ত্রিশ হাজার ডলার। এড্রেনালিনের প্রভাব ইরেক্টর পাইলি মাংসপেশিতে অনুভব করছি আমি। এ-কি কান্ড! টাকা দেয়ার জন্য মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। আমি কোনো টাকা নিয়ে যাইনি, দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার সামথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ভালো অংকের পরিমান দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলাম। পনের মিনিটের ক্যাম্পেইনে এক লক্ষ সত্তর হাজার ডলার উঠে গেল। সাধারণ মানুষের দাক্ষিণ্য দেখে আমি তারাবীহ-র নামাজে মনোযোগ দিতে পারলাম না। 

শেবাচিমের গোল্ডেন জুবিলী:
******************************
শোনা যাচ্ছে আগামী বছরের অক্টবরে আমাদের শেবাচিমের গোল্ডেন জুবিলী পালিত হবে। প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পরিবার-পরিজন-বন্ধু-বান্ধব নিয়ে প্রমোদে দিনটি কাটাবেন। ভাগ্যক্রমে শেবাচিমের সিলভার জুবিলী দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা এসে অনেক অনুষ্ঠান করলেন, ফুটবল খেললেন, আড্ডা-গল্প করলেন, স্মৃতি রোমন্থন করলেন। এক পর্যায়ে বলা হলো, তাদের অনুষ্ঠানের খাবার তৎকালীন শেবাচিমে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া হবে না! অবশেষে, আমাদের সিনিয়র ভাইদের হস্তক্ষেপে আমাদের প্লেটে খাবার জুটেছিল। আচ্ছা, কি হয় এই জুবিলী করে? আমাদের কি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু করার প্রয়োজন আছে? কোনো অঙ্গীকার? যে প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট দিয়ে আজ আমি আপনি নিজেদের ডাক্তার বলি?

কোটি টাকার স্বপ্ন:
******************
আপনাদের একটা স্বপ্নের কথা বলি। এক কোটি টাকার স্বপ্ন। আমরা চাইলে গোল্ডেন জুবিলীর আগেই প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে এক কোটি টাকা ডোনেশন তুলতে পারি। এই টাকা স্বতঃর্স্ফূর্ত ভাবে সংগ্রহ করা হবে। কাউকে কোনো চাপ দেয়া হবে না। এখান থেকে পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা যদি মনে করেন যে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের কোনো দ্বায়বদ্ধতা, কোনো অঙ্গীকার আছে, তারাই এই স্বপ্নের অংশীদার হবেন। কি হবে এই টাকা দিয়ে? এক কোটি টাকা দিয়ে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে। এই এক কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট থাকবে- কেউ কখনো তুলতে পারবে না এই মূলধন। এর থেকে অর্জিত টাকার বার্ষিক পরিমান হবে, আনুমানিক ৫-৭ লক্ষ টাকা। সেই টাকা খরচ করা যাবে- ছাত্রদের একাডেমিক উন্নয়নের জন্য। অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ-সম্মানিত শিক্ষক-স্থানীয় প্রাক্তন ছাত্রীছাত্রদের সমন্বয়ে একটি কমিটি এই টাকা খরচের দেখভাল করবেন। আপনারা যারা প্রতি বছর ২০ নভেম্বর শেবাচিম দিবসে যাবেন, তারাও যেয়ে এই টাকা দিয়ে কি হয় তা জানতে পারবেন। 

কে দেবে এই টাকা?
*********************
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্ভে করলে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ৩০-৪০% লোক সার্ভে-তে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠানের বাইরে হলে মাত্র ১০-১৫% মানুষ। আমার ধারণা, শেবাচিমের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকে ১০-১৫% মানুষ এমন একটা উদ্যোগে অংশীদার হতে রাজি হবেন। এ পর্যন্ত শেবাচিমের চল্লিশটি ব্যাচ গ্রাজুয়েশন করেছে ধরে হিসেবে করলে, আনুমানিক প্রায় পাঁচ হাজার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী আছেন। পাঁচ হাজারের ১৫% মানে হলো ৭৫০ জন।

এবার হিসেব করে বলি:

(ক) যদি সামর্থ্যবান শেবাচিমের প্রবাসী প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকে মাত্র ১২৫ জন, জনপ্রতি ১ হাজার মার্কিন ডলার দেন, তাতেই হয়ে যাবে এক কোটি টাকা।

(খ) যদি প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মাত্র ১৫%, মানে ৭৫০ জন, যদি জনপ্রতি এককালীন মাত্র ১৩,৩০০ টাকা দেন, তাতেই এক কোটি টাকা।

(গ) কিন্তু, বাস্তবিকপক্ষে যেটা হবে, তা হলো সবার সমন্বিত অংশগ্রহণে এক কোটি টাকা উঠে যাবে, গোল্ডেন জুবিলীর আগেই।

কি হবে এই টাকা দিয়ে?
*************************
সেটা আলোচনা সাপেক্ষ, কিন্তু টাকা তোলা শর্ত সাপেক্ষ নয়। এক কোটি টাকা তুলতে পারলে, তা দিয়ে আপনাদের আলোচনা সাপেক্ষে অনেক কিছুই করা যাবে। অনলাইন লাইব্রেরি, লাইব্রেরিতে কম্পিউটার-প্রিন্টার, ডিজিটাল অডিও-ভিজুয়াল সিস্টেম, প্রয়োজনে মেধাভিত্তিক বৃত্তি, প্রয়োজনভিত্তিক বৃত্তি- অনেক কিছুই করা যায়। শেবাচিমের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া যাবে আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষাসামগ্রী। ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক কিছু করা সম্ভব কিন্তু তা সাস্টেইনএবল নয়, টেকসই কিছু করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবেই করতে হবে।

কোনো উদ্যোগই সমালোচনার উর্ধে নয়। সমালোচনা চলতে চলতেই এক কোটি টাকা উঠে যাবে শেবাচিমের জন্য, আপনাদের গোল্ডেন জুবিলীর আগেই, ইনশাআল্লাহ। আমি আগামী জানুয়ারী মাসে শেবাচিমের স্যারদের সাথে দেখা করবো- স্যারদের পরামর্শের জন্য। এরপর থেকে আমরা শুরু করবো এই যাত্রা, কোটি টাকার স্বপ্নের যাত্রা, ইনশাল্লাহ।

[হতাশাবাদীদের থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। আপনি মনে করলে আপনার বন্ধুদের সাথে পোস্টটি শেয়ার করতে পারেন। টাকা তোলার আগে আমরা হেডকাউন্ট করবো দাতাদের। তারপর কিভাবে টাকা সংগ্রহ এবং সঞ্চয় করা হবে, সে সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। সেই মসজিদে দেখা সাধারণ মানুষের দাক্ষিণ্য আমার মত আপনাদের অনেককেই অবাক করবে এবার !]

(বি:দ্র : ছবিটি অনলাইন থেকে নেয়া)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডা. আব্দুল করিম (ছদ্মনাম)। প্রেসক্রিপশনে নামের পাশে এমবিবিএস শব্দটি নেই। আছে কিছু…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস