২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:২৪ এএম

রেজিস্ট্রেশন পেতে যাচ্ছে দেশে উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’

রেজিস্ট্রেশন পেতে যাচ্ছে দেশে উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’

এবার বাংলাদেশেও অনুমোদন পেতে হচ্ছে দেশীয় দুই গবেষকের উদ্ভাবিত হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ওষুধ  ‘ন্যাসভ্যাক’। এটাই হবে দেশে উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধের রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্তি। উল্লেখ্য, জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর ওষুধটি উদ্ভাবনের জন্য মৌলিক গবেষণা সম্পন্ন করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন-আল-মাহতাব ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,  ইতোমধ্যে ওষুধের রেসিপি অনুমোদন হয়ে গেছে। এখন ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির অনুমোদন পেলেই তা বাজারে আনবে দেশের ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিকন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দুই কোটি ৪০ লাখ লোক ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।

এরই মধ্যে কিউবার ওষুধ প্রশাসন ন্যাসভ্যাককে অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি বেলারুশ, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া ও এঙ্গোলাতেও হেপাটাইটিস বি’র চিকিত্সায় ন্যাসভ্যাক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ন্যাসভাকের উদ্ভাবক অধ্যাপক ডা. মামুন-আল-মাহতাব। 

তিনি জানান, এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। আর লিভারের প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সায় আরোগ্য লাভের হার শতভাগ।  

‘ন্যাসভ্যাক’ অদূর ভবিষতে ক্যান্সার গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি ক্রনিক ইনফেকশনের চিকিত্সাও কার্যকর বলে জানান তিনি। 

হেমাটোলজিস্টদের মতে, বর্তমানে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত মারাত্মক রোগীদের চিকিৎসায় যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয় সেগুলোর পূর্ণ কোর্সের খরচ পড়ে সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। আবার কিউবায় উৎপাদিত ন্যাসভ্যাক ব্যবহার করলে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু দেশে ন্যাসভ্যাক উৎপাদন করা হলে এর দাম পড়বে দুই লাখ টাকার মতো। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটির নিবন্ধন পাওয়া গেলে সিভিয়ার হেপাটাইটিস-বি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে। নিবন্ধন নিয়ে দেশের একটি কোম্পানি এটি উৎপাদন করবে।।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক আকবর ২৫ বছর ধরে হেপাটাইটিস বি চিকিত্সায় নতুন চিকিত্সা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, হেপাটাইটিস বি’র বিরুদ্ধে মানুষের নিজের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়ে ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করা। এ উদ্দেশে ডা. আকবর প্রথমে ইঁদুরের ওপর গবেষণা করেন। পরে জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে হেপাটাইটিস বি রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করেন। পরবর্তী সময়ে আরো গবেষণার জন্য ডা. মাহতাব বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর ডেটাবেস তৈরি করেন।

২০০৯ সালে বাংলাদেশে ১৮ জন ক্রনিক হেপাটাটিস ‘বি’ রোগীর ওপর ‘ন্যাসভ্যাক’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় দফা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়। এতে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়ায় ২০১১ সালে পুনরায় ১৫১ জন রোগীর ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়। তৃতীয় দফায় এই ১৫১ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীকে দুই দলে ভাগ করে তাদেরকে যথাক্রমে ‘ন্যাসভ্যাক’ ও পেগাইলেটেড ইন্টারফেরনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা হয়। ট্রায়ালটিতে সর্বমোট ৭৫ জন রোগীকে মোট ১৫ বার ‘ন্যাসভ্যাক’ আর অন্য ৭৬ জন রোগীকে মোট ৪৮ বার পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন প্রয়োগ করা হয়।

ডা. মাহতাব বলেন, ‘এ পরীক্ষায় দেখা যায় ন্যাসভ্যাক পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন-এর চেয়ে অধিক কার্যকর।’ তিনি বলেন, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এর চূড়ান্ত পর্যায়ের ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে তোলার মতো কোনো ওষুধ নেই। চিকিত্সকরা এ রোগের চিকিত্সার জন্য প্রচলিত চিকিত্সা পদ্ধতির আশ্রয় নেন। যাতে এসব রোগী ধীরে ধীরে সংক্রমণ থেকে আরোগ্য লাভ করে এবং লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত না হয়।

ডা. মাহতাব বলেন, এমনকি এ ধরনের চিকিত্সাও দীর্ঘদিন কোনো রোগীর ওপর প্রয়োগ করলে তার নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে ন্যাসভ্যাক-এর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে এটি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, ন্যাসভ্যাক কেবলমাত্র হেপাটাইটিস বি’র চিকিত্সার জন্যই কার্যকর নয়, যে কোনো ক্রনিক ইনফেকশনের জন্যও এটি কার্যকর।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত