ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০১:২৬ পিএম

স্টেম সেল, ফেরাল চাইল্ড, এবং রোল মডেলিং

স্টেম সেল, ফেরাল চাইল্ড, এবং রোল মডেলিং

(১)
শুক্রানু এবং ডিম্বানুর মিলনে তৈরী হয় ভ্রূণ। এই ভ্রূণের বিভাজনের ফসল আমরা। আমাদের একটি ভ্রূণকোষ বিভাজিত হয়ে তৈরী করে হাজার রকমের কোষ। যে কোষ বিভাজিত হয়ে হাজার রকমের কোষের যে কোনো একটিতে রুপান্তরিত হতে পারে, সেই কোষকে বলে "স্টেম সেল", অর্থাত এই কোষ থেকে মানব শরীরের যে কোনো কোষ তৈরী হতে পারে। ভ্রূনাবস্থায় স্টেম সেল থেকেই মানুষের শরীরের সব রকম অঙ্গ-প্রতংগ তৈরী হয়। আমাদের শরীরে যে আনুমানিক এক ট্রিলিয়ন কোষ আছে, তাদের সবাই সেই একটি ভ্রূণকোষ থেকে তৈরী। আমাদের জীবনের শুরুতে সেই একটি ভ্রূণ কোষে যে ডিএনএ, যে ক্রোমোজম, যে জিনোম ছিলো, আমাদের এক ট্রিলিয়ন কোষের প্রতিটিতে সেই একই ক্রোমোজম, ডিএনএ এবং জিনোম আছে। প্রশ্ন হলো, যদি সব কোষের মধ্যে একই ক্রোমোজম, ডিএনএ এবং জিনোম থেকে থাকে, তাহলে কিভাবে অগ্নাশয়ের কোষ ইন্সুলিন তৈরী করে, শুক্রাশয়ের কোষ শুক্রানু তৈরী করে কিন্তু ইন্সুলিন তৈরী করে না, মস্তিস্কের কোষ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরী করে কিন্তু শুক্রানু তৈরী করে না? একই জিনোম থাকা সত্বেও নিদ্রিষ্ট কোষের সুনিদ্রিষ্ট কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ হয় এপিজেনেটিক্স-এর মাধ্যমে। যখন কোনো কোষ অগ্নাশয়ের কোষে রুপান্তরিত হবে বলে নির্ধারিত হয়, তখন এই কোষের অগ্ন্যাশয়ের কাজ নয় এমন জীন গুলোকে এপিজেনেটিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়, ফলে অগ্ন্যাশয়ের কাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এমন জীনের অভিব্যক্তি বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক এমনটি ঘটে মস্তিস্কের, হৃদপিন্ডের, শুক্রাশয়ের, ডিম্বাশয়ের কোষে। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং নিয়ন্ত্রিত হয় এপিজেনেটিক্স-এর মাধ্যমে। যে জীন গুলোর অভিব্যক্তি সেই অঙ্গের কাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, সেই জীনগুলোর "প্রোমোটার রিজিয়ন" এর নিদ্রিষ্ট জায়গায় অতিরিক্ত মিথাইল গ্রূপ বসিয়ে দিয়ে সেই জীনের অভিব্যক্তি বন্ধ করে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে মিথাইলেশন বলা হয়। মিথাইলেশন, এসিটাইলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীনের অভিব্যক্তির উপর এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রনের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞানীরা এখন এই এপিজেনেটিক মার্ক বা মিথাইলেশন/এসিটাইলেশন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অগ্ন্যাশয়ের কোষ কে মস্তিস্কের কোষে পরিনত করতে পারেন, বা স্টেম সেল কে তাদের ইচ্ছেমত যেকোনো ধরনের কোষে পরিনত করতে পারেন।

(২)
আমাদের জীবনের একটা সাধারণ ঘটনা দিয়ে উপরের জটিল প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করি। ধরুন, আপনার কাছে এক টুকরো কাপড় আছে। এই কাপড়ে কোনো সেলাই দেয়া নেই এবং এই কাপড় দিয়ে আপনি যা খুশি তাই তৈরী করতে পারেন। এই কাপড়ের টুকরোটি হলো "স্টেম সেল"। এই কাপড়ের চার দিকে সেলাই দিয়ে বিছানার চাদর বানানো যায়, দুইপ্রান্ত সংযুক্ত করে দিয়ে লুঙ্গি বানানো যায়, এই কাপড় টুকরোকে বিভিন্ন রকম সেলাই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিধেয় পোশাক বানানো যায়। অর্থাৎ, এই কাপড় টুকরো হলো আমাদের জিনোম (জেনেটিক্স), এবং এই সেলাই দেয়া হলো এপিজেনেটিকস। একই কাপড় টুকরোকে শুধু ভিন্ন ভাবে সেলাই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। আবার, সেই সেলাই পরিবর্তন করে সেই কাপড় টুকরোকে লুঙ্গি থেকে বিছানার চাদর বানানো যায়। বিজ্ঞানীরা ঠিক একই ভাবে জিনোম ঠিক রেখেই এপিজেনেটিক মার্ক (সেলাই) পরিবর্তন করে এক ধরনের কোষ থেকে আরেক ধরনের কোষ বানানোর প্রচেষ্টায় নিমগ্ন। আমাদের জীনের এই এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রণ আমাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ, আমাদের শিক্ষা, আমাদের আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, ধর্ম-কর্ম-আর্থ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ দ্বারা সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

(৩)
মানুষের বাচ্চা কে যদি খুব ছোটবেলায় লোকালয় থেকে দুরে কোনো নি:সঙ্গ এলাকায় রেখে আসা যায়, তবে এই মানুষের বাচ্চা শারীরিকভাবে বড় হলেও মানুষের মত আচরণ করে না। তারা মানুষ হয়েও অন্য প্রাণীর মত আচরণ করে। অন্য প্রাণীর মত আচরণ করা মানুষের বাচ্চাকে বলা হয় "ফেরাল চাইল্ড"...আমাদের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে বাবা-মা তাদের সন্তানকে জঙ্গলে ফেলে রেখে আসার পর বনের পশুরা এই বাচ্চাকে আদর করে বড় করেছে। অনেক বছর পর দেখা গিয়েছে যে সে মানুষের মত দেখতে হলেও ব্যবহার করছে পশুদের মত, পশুদের মত করে ঘুমাচ্ছে, হাত ব্যবহার না করে শুধু মুখ দিয়ে খাচ্ছে, পশুদের মত করে ডাকছে, শব্দ করছে। সে কথা বলতে শেখেনি, চিন্তা-ভাবনা করতে শেখেনি। নিকট অতীতে ইউক্রেনের ওকসানা মালায়া-র উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। জন্মের সময় ওকসানা সম্পুর্ন সুস্থ মানবশিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু তার মদ্যপ পিতা-মাতা তাকে পরিত্যাগ করলে সে কুকুরের তত্বাবধানে বড় হয়। সাড়ে সাত বছর বয়সে যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখন সে শুধু কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করত, কুকুরের মত চার হাত-পা দিয়ে হাটতো, কুকুরের মত মাটিতে ঘুমাতো। সে মানুষের মত কোনো আচরণ-ই শেখেনি। মানুষের জিনোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করা মানুষের বাচ্চা শুধু মাত্র বেড়ে ওঠার পরিবেশের ভিন্নতার কারণে কুকুরের মত আচরণ করেছে। অর্থাত, শুধুমাত্র মানব জিনোম তাকে মানুষ বানাতে সক্ষম হয়নি, বরং তার পরিবেশ তাকে কুকুরের মত আচরণ শিখিয়েছে।

(৪)
আমরা প্রায়শই বলে থাকি যে আমাদের বাচ্চারা যাতে "মানুষের মত মানুষ" হয়। এই "মানুষের মত মানুষ" বলতে আমরা কি বুঝাই? "মানুষ এর মত মানুষ" এর সংগা কী? আমরা যদি বাচ্চাকে বিরাট সঙ্গীতশিল্পী হতে বলি, আমরা বলতে পারি যে সে যেন রুনা লায়লা-র মত হয়, খ্যাতনামা অভিনেতা হতে বললে, বলতে পারি রাজ্জাক-এর মত হতে; অসম্ভব সফল মানুষ বললে বলতে পারি বিল গেটস এর মত হতে, মুহাম্মদ ইউনুস-এর মত হতে। কিন্তু, আমরা সবাই বলি আমাদের বাচ্চারা যেন "মানুষের মত মানুষ" হয়। আমাদের কাছে কি এই "মানুষের মত মানুষের" দৃশ্যমান উদাহরণ আছে যাদের দেখে আমাদের বাচ্চারা তাদের মত হবে? ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত আদর্শ মানুষের গুনাবলী বা নবী-রসুল তাদের কাছে বিমূর্ত, অদৃশ্যমান। ফুটবলার হবার জন্য তাদের সামনে দৃশ্যমান মেসি আছে, ক্রিকেটার হবার জন্য সাকিব-মুস্তাফিজ আছে; কিন্তু "মানুষের মত মানুষ" হবার জন্য কে আছে? বাচ্চাদের শেখার জন্য প্রয়োজন রোল মডেল, জীবিত-দৃশ্যমান রোল মডেল। বাচ্চারা রোল-মডেলিং এর মাধ্যমে শিখে। রোল মডেল হতে হলে তার জন্য নিদ্রিষ্ট মানদন্ড আছে, আমাদের "মানুষের মত মানুষ" হবার মানদন্ড কি? বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি শিখে শিশু অবস্থায় তার পরিবার-পিতা-মাতা'র কাছ থেকে। আমরা না জানলেও বাচ্চারা পিতা-মাতাকেই রোল মডেল ভেবে বড় হয়, পিতা-মাতাই তাদের সবচেয়ে বড় রোল মডেল, সেরা হিরো। আমরা কি আমাদের বাচ্চাদের বলেছি যে সে যেন তার বাবার মত বা মায়ের মত মানুষ হয়? আমরা বলিনি কারণ বাচ্চার বাবা-মা "মানুষের মত মানুষ" নয়; বাচ্চার বাবা প্রচন্ড পরিশ্রমী মানুষ (কিন্তু সে অসৎ), বাচ্চার মা প্রচন্ড জ্ঞানী মানুষ কিন্তু তিনি পরচর্চায় ব্যস্ত। আমরা আমাদের বাচ্চাকে কাকে অনুসরণ করে বড় হতে বলেছি? মাদার তেরেসা কে? তিনি কি আমাদের পরিবারের কেউ? আমাদের বাচ্চারা কি তাকে দেখেছে? আমরা কি আমাদের বাচ্চাদের বাবার পরিশ্রম, মামার সততা, মায়ের নিষ্ঠা, খালুর সামাজিকতা, প্রতিবেশীর একনিষ্ঠতা, দানশীলের বদান্যতা, ইমামের ধার্মিকতার সমন্বয়ে বড় হতে বলছি? আমরা কি পাঁচ বছরের শিশুকে সবার ভালো জিনিস নিয়ে, সব ভালোত্বের এমালগাম "মানুষের মত মানুষ" হতে বলছি? আমাদের ঘরে-বাইরে-সমাজে-রাষ্ট্রে কি এমন একজন কেউ আছেন যাকে আমাদের বাচ্চাদের "মানুষের মত মানুষ" হবার রোল মডেল বানাতে পারি?

(৫)
মানুষের স্টেম সেল কে যেমন পরিবেশ নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে, এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রন প্রক্রিয়ায়, যেকোনো কোষে পরিনত করা যায়; ঠিক তেমনি প্রতিটি মানবশিশু-ই একটি স্টেম সেল। প্রতিটি শিশুকে আমরা ইচ্ছে করলে যেমন খুশি তেমন মানুষ হিসেবে বড় করতে পারি। শুধু পরিবেশ নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে, আদর্শ রোল মডেল নির্ধারণের মাধ্যমে, একজন মানবশিশু ভবিষ্যতে কেমন হবে তা নির্ধারণ করা যায়। মানব শিশু এক টুকরো কাপড়, সেলাই কেমন হবে তা দিয়েই নির্ধারিত হবে এই কাপড় টুকরোর ব্যবহার। মানব শিশুকে পশুর সাথে রেখে বড় করলে যেমন সে পশুর মত আচরণ করে, তেমনি অমানুষের পরিবারে-পরিবেশে-সমাজে-রাষ্ট্রে বড় করলে সে অমানুষের মত আচরণ করে। আমাদের চারিপাশে লক্ষ-কোটি সফল মানুষ, শিক্ষিত মানুষ, ধনী মানুষ, এবং জ্ঞানী মানুষ আছে। কিন্তু, আমাদের চারিদিকে রোল-মডেল হবার জন্য "মানুষের মত মানুষ" কেউ নেই, এজন্য আমরা কেউ-ই "মানুষের মত মানুষ" হই না। আমরা শিক্ষিত হই, সফল হই, ধনী হই, জ্ঞানী হই, কিন্তু মানুষ হই না- আমরা সবাই মূলত এই সমাজের "ফেরাল চাইল্ড"

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত