ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
নাজমুস সাকিন হিমেল

নাজমুস সাকিন হিমেল

শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


২০ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৪১

তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

একদিন একটি শিশুর জটিল ওপেনহার্ট সার্জারী করার সময় তাঁর বিশেষ সহকারী অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করে বলেন, ‘স্যার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফোন করে লাইনে আছেন এবং আপনার সাথে জরুরী একটা আলাপ আছে বলেছেন’। সার্জন দেখলেন এই শিশুটির অস্ত্রোপচার এ দেরী হলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা তাই তিনি নিজের সহকারীকে বললেন, ‘পিএম-কে বলো আমি ওটিতে আছি। এক ঘন্টা পর ফোন করার জন্য।’ অবশ্য এক ঘন্টা পর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আবারো ফোন করেন।

কনাডা জেলার কিন্নিগলি গ্রামের মতো ছোট্ট একটা গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষটা ছিলেন বাবা মায়ের অষ্টম সন্তান।  লন্ডনের গাইস হাসপাতালে হার্ট সার্জন হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেয়া এই মানুষটাকে বন্ধুরা বলতেন, "অপারেটিং মেশিন"। ইনি আর কেউ নন, ডক্টর দেবি শেঠি।

একদিন মমতাময়ী মাদার তেরেসা দেখেন একটি ‘ব্লু বেবি’ তিনি বেশ যত্ন করে পরীক্ষা করছেন।

বেশ কয়েক মিনিট ধরে চুপচাপ ওই দৃশ্য দেখার পর মাদার তেরেসা ডা. শেঠীকে বললেন, “আমি এখন বুঝতে পারছি কেন তুমি এখানে আছো। হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের যন্ত্রণা দূর করার জন্যই ঈশ্বর তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।”

ডা. শেঠীর ভাষায় তার জীবনে যতো প্রশংসা পেয়েছেন- এটা সবচেয়ে অনুপ্রেরণা মূলক।

শেঠী কলকাতার বিড়লা হার্ট হাসপাতালে দীর্ঘদিন চাকুরী করেছেন। একদরিদ্র রোগীর ওপেন হার্ট অপারেশনে চার্জ মওকুফ নিয়ে কর্তৃপক্ষের আচরণে তিনি ক্ষুদ্ধ হন। তাৎক্ষণিক চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু তাকে ফোন করে পশ্চিমবঙ্গ না ছাড়ার অনুরোধ করেন। পশ্চিমবঙ্গে হার্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তিনি সরকারিভাবে জমি বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। এটা নিয়ে পত্রপত্রিকায় সমালোচনার শিকার হন। কলকাতার মানুষ তার কদর না বুঝলেও তার সন্মান কমেনি কখনো।

আফ্রিকার জনৈক সার্জন কর্তৃক বিশ্বের প্রথম হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের কথা শুনে কার্ডিয়াক সার্জন হবার সিদ্ধান্ত নেন।  ১৯৯১ সালে নয় দিন বয়সি শিশু রনি’র হৃৎপিণ্ড অপারেশন করেন যা ভারতের প্রথম সফল শিশু হৃৎপিণ্ড অস্ত্রোপচার। তিনি কলকাতায় মাদার তেরেসার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

ডা. দেবী শেঠী নামক এই মহাগুনী ব্যক্তিটি ১৯৯৭খ্রীঃ এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার হাজার শিশুর সফল হার্ট সার্জারী সম্পন্ন করেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০,০০০ এর বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি করেছেন। বিনামূল্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর নামটা সবার প্রথমে থাকবে।

সম্প্রতি ভারত সরকার একটি আইন পাশ করার সিন্ধান্ত নিয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে যে কোনো সময় একজন ডক্টরকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে এরকম ব্যাপারে। দেবী শেঠি আজ আর ওটিতে দাঁড়িয়ে নেই, তিনি সমগ্র ডাক্তার সমাজের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই আইন পাশে বিরোধিতা করেছেন... আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।

একবার কোচিং এ ক্লাসে নেবার সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম ডক্টর দেবী শেঠিকে কেউ চিনে কিনা! তাদের নিরবতায় সেদিন বিস্মিত হয়েছিলাম... এ সমাজ জাস্টিন-শাহরূখ-অরিজিৎ - বা টম ক্রুজের দখলে থাকলেও অন্ধকারে আলোর মশাল হাতে শিল্পীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা দেবি শেঠির মতো কিছু মানুষকে চিনে না, জানে না।

শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তাঁর বিখ্যাত "The Starry Night" চিত্রকর্মটা একবারই এঁকেছেন... কিংবা শিল্পী ভিঞ্চির আঁকা "দ্য লাস্ট সাফার" চিত্রকর্মটা দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষের আনাগোনা দেখা যায় মিউজিয়ামে। নেপালের আপা শেরপার এ পর্যন্ত ২৩ বার এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছেন... দেবি শেঠি হয়ত শিল্পী হতে পারেন নি ভ্যানগগ-ভিঞ্চিদের মতো। অকুতোভয় শেরপাও নন তিনি... গায়ক বা অভিনেতাও নন... কিন্তু তিনি হৃদয়ের শিল্পী... হাজারো কষ্টে জর্জরিত মানুষের মনে তিনি স্রষ্টার পরে হয়েছেন ভগবান শেঠি... একটা চিত্রকর্মে নয়, বরং প্রতিদিন হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার শিল্পী হতে পেরেছেন। তাই তো তিনি প্রতিদিন ছবি আঁকেন মানুষের হৃদয়ে... যে ছবি জেনিটিক্যালি দেবী শেঠির মহত্ত্বে এবং কর্মে লাব-ডাব শব্দ করে চলে মিডিল মিডিয়াস্টিনামে।

ডক্টর শেঠি যেন তাঁর হাতের ছোঁয়ায় নিজের বলা কথাগুলো হৃদয় শিল্পীর মতো বুকে এঁকে দেন।

"Change Your Attitude Towards life.
Do not Look for Perfection in Everything in life."

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত