ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০২:১১ পিএম

শেবাচিম দিবস এবং আলোকিত আগামী

শেবাচিম দিবস এবং আলোকিত আগামী

(১)
বছর দুয়েক হলো একটা নতুন আয়োজন লক্ষ্য করছি। নভেম্বর ২০ তারিখে শেবাচিম দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। যিনি বা যারা এই উদ্যোগ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন, নি:সন্দেহে এটি একটি স্মরণীয় উদ্যোগ, একটি মহতী উদ্যোগ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে, শেবাচিম পরিবারের সকল সন্তানেরা একে অপরকে চিনতে পারবে, নিজের শিকড়ের সন্ধানে ফিরে যাবে প্রতিবছর। যে মহান প্রতিষ্ঠান আমাদের এই মহান পেশার জন্য শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের পেশাগত ভিত্তি তৈরী করে দিয়েছে, প্রতিবছর সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিরে যাবার উদ্যোগ এবং এর আনুষ্ঠানিকতা আমাদের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দ্বায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্ষপূর্তির দিনে বিশেষ টি-শার্ট এবং বিশেষ ক্যাপ পরিধান করার মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করার সাথে সাথে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের দ্বায়বদ্ধতার প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট।

(২)
পৃথিবীর সব দেশেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠন আছে, আল্যামনাই আছে। এই সংগঠন বা এই সংগঠনের সদ্যস্যরা যখন সামর্থবান হন, তারা এই সব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য ভূমিকা পালন করেন। কেউ লাইব্রেরি তৈরী করে দেন, কেউ নতুন ক্লাসরুম তৈরী করে দেন, কেউ কম্পিউটার কিনে দেন, কেউ ডিজিটাল মিডিয়ার সংস্থান করেন। এমন কি কেউ কেউ বৃত্তিরও প্রচলন করেন। নিজেদের আনন্দ-ফুর্তি করার পাশাপাশি বিদেশে এই দ্বায়বদ্ধতার বিষয়টিকে খুব গুরুত্ত্ব দিয়ে দেখা হয়। এজন্য গেটস ফাউন্ডেশন আছে, ক্লিনটন ফাউন্ডেশন আছে- এমন আরো হাজার হাজার সংগঠন আছে যারা সমাজের প্রতি তাদের দ্বায়বদ্ধতার মানসিকতা থেকে সমাজের জন্য অনেক কিছু করেন। আমাদের দেশে এই দ্বায়বদ্ধতার বিষয়টি উপেক্ষিত, আমরা নিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু দেয়ার বিষয়টি ভীষণভাবে উপেক্ষিত।

(৩)
প্রতিবছর নভেম্বর-এর বিশ তারিখ শেবাচিম দিবস পালনের অংশ হিসেবে আমরা এমন একটা উদ্যোগ নিতে পারি। এটি একটি স্বেচ্ছা উদ্যোগ। কোনো জবরদস্তি নেই। শেবাচিম পরিবারের সন্তানেরা দেশে-বিদেশে যেখানে আছে, তারা ক্ষমতামত যার পক্ষে যা সম্ভব তা দিয়ে একটা ফান্ড তৈরী করতে পারে। ধরুন, সারা বছরে এমন উদ্যোগে যদি পাঁচ লক্ষ টাকা ওঠে, তা দিয়ে শেবাচিমের লাইব্রেরিতে দশটি ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনে দেয়া যায়, কেউ চাইলে শেবাচিম লাইব্রেরির জন্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন সাবস্ক্রিপশনের বার্ষিক টাকা দিয়ে দিতে পারেন। এই টাকা দিয়ে এক বছর লাইব্রেরিতে বই কিনে দেয়া যেতে পারে। কোনো বছর ইউএসএমএলই বা প্লাব বা এমন ধরণের পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক বই কিনে দেয়া যেতে পারে। মেধাবী কিন্তু গরিব, এমন কাউকে বৃত্তি দেয়া যেতে পারে। অনেক বড় কিছু হতে হবে এমন কথা নেই, তবে ছোট পরিসরে হলেও শুরু করা যেতে পারে।

(৪)
একটা উদাহরণ দেই। বাংলাদেশে বন্যা হলো এবার। আমাকে কেউ কেউ বললেন যে আমরা আমেরিকায় বসবাসরত শেবাচিমের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা কিছু করতে পারি কি না। আমাকে দুই একজন উদ্যোগ নিতে বললেন। সাহস করে সবাইকে বললাম এগিয়ে আসার জন্য। আমাকে অবাক করে দিয়ে, এমন মানুষ আছেন যার সাথে আমার দশ বছরে কথা হয় নি, সে তাৎক্ষণিক ২০,০০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন। শেবাচিমের জুনিয়র ডাক্তার,যার আমেরিকায় তেমন কোন আয় নেই, সেও একশত ডলার পাঠিয়ে দিলো। এভাবে, সীমিত উদ্যোগে এক মাসে চার লক্ষ টাকা তুলে ফেললাম। সেই টাকা শামীম ভাইয়ের সহযোগিতায় আর্মি মেডিক্যাল কোরের মাধ্যমে বন্যা দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হলাম আমরা। এই উদ্যোগ থেকে আমি দুটি জিনিস শিখেছি: অনেকেই অনেক কিছু করতে চান, কিন্তু উদ্যোগ নেবার মত সময় বা ঝুটঝামেলা তারা নিতে চান না, তারা চান বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য কেউ উদ্যোগ নিলে তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ রাজনীতি এবং দুষ্টনীতির প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হবে। কারো কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত সুবিধালাভের জন্য এই উদ্যোগকে ব্যবহার করা যাবে না।

(৫)
শেবাচিম পরিবারের প্রবাসী সদস্যরা ইচ্ছে থাকলেও হয়তো এই দিনে আপনাদের সাথে যোগ দিতে পারবে না। কিন্তু, এমন একটি উদ্যোগ নিলে, আমি নিশ্চিত যে শেবাচিম পরিবারের সব সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করবে। আমি একটা কাল্পনিক হিসেব করে দেখাই। মনে করুন, আমরা একেকজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে চাইলাম। এক হাজার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এই টাকা দিলেই ১০০০ গুন ৫০০= ৫,০০,০০০ অর্থাৎ পাঁচ লক্ষ টাকার জোগাড় হয়ে যাবে। প্রবাসীদের মধ্যে যারা সক্ষম, আমি নিশ্চিত, তারা এর চেয়েও অনেক বেশি দিতে পারবেন। এমন একটা উদ্যোগ নেয়ার কথা সম্মানিত আয়োজকরা ভেবে দেখতে পারেন। আমাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি আছে। আমরা যদি এই "ফিরিয়ে দেয়ার" সংস্কৃতি চালু না করি, তাহলে সাদা গেঞ্জি আর ক্যাপ পরা আমাদের নিজেদের ভালোলাগার স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না। আমাদের দ্বায়িত্ববোধের বিষয়টি ধীরে ধীরে সামনে নিয়ে আসা দরকার। ইটস টাইম টু পে ব্যাক।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত