ঢাকা      শনিবার ২০, অক্টোবর ২০১৮ - ৪, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব

১৯৯১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালিত হবে। ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালনের আরও একটি কারণ হল, এই দিনে ফ্রেডরিক ব্যান্টিং জন্মগ্রহণ করেন- যিনি তার সহযোগী চার্লস বেল্টকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যাপক ম্যাকয়িডের গবেষণাগারে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণের মহৌষধ ইনসুলিন আবিষ্কার করেন। এই দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিশ্বে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যবরণ করে। আইডিএফের (ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশন) তথ্য মতে, দেশে মোট ৭১ লাখ শনাক্তকৃত ডায়াবেটিক রোগী। এছাড়া আরও প্রায় ৭১ লাখ (মোট প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ) মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে বসবাস করছে, যারা এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি।

ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি মহামারী রোগ হিসেবে চিহ্নিত এবং এটি সারা জীবনের রোগ। নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক। ডায়াবেটিসের এতসব জটিলতার কথা চিন্তা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি বছরের মতো এবারও একটি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছরের স্লোগান হচ্ছে, ‘Women and Diabetes our light to healthy future’ যা বাংলায় করা হয়েছে, ‘সব গর্ভধারণ হোক পরিকল্পিত।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ডায়াবেটিক ফেডারেশনের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি, আর এখন সেটা দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটিতে। সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগী বাড়ছে এবং ১০ জনের মধ্যে ১ জন নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

এবারের প্রতিপাদ্য থেকে এটা স্পষ্ট- নারীদের ডায়াবেটিসের ওপর এবার বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণে যেমন ডায়াবেটিস বাড়ছে, তেমনি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের অর্ধেকেরও বেশি পরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে কোনো শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে।

উল্লেখ্য, এবছর আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন যখন নারীদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ওপর গুরুত্বারোপ করতে যাচ্ছে, তার আগেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা দিতে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশে ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবাকেন্দ্র’ খোলা হয়েছে, যেখানে নির্ধারিত সময়ে বিনামূল্যে গর্ভধারণ-পূর্ব পরামর্শ এবং স্বল্পমূল্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রসবকালীন নারী ও শিশুমৃত্যুর হার যেমন হ্রাস করা সম্ভব হবে, তেমনি নারীসহ আগামী প্রজন্মকেও ডায়াবেটিসের ভয়াবহ প্রকোপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

প্রশ্ন হল, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (জিডিএম) কী? সাধারণত গর্ভধারণের পর যদি রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তবে সে অবস্থাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলে। এ সময় ডায়াবেটিস খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা মা এবং গর্ভস্থ শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বেগের বিষয় হল, বর্তমান বিশ্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ১-২৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মহিলাদের মধ্যে এ হার ২৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ৬-১৪ শতাংশ। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের পরবর্তী গর্ভধারণের সময় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়।

উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও ডায়াবেটিস রোগী বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০৩ সালে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগী ছিল ১৯ কোটি। আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশে ২০০৩ সালে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ এবং ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার কারণগুলো হচ্ছে-

১. কায়িক পরিশ্রম না করা
২. মোটা বা স্থূলকায় হয়ে যাওয়া
৩. অতিমাত্রায় ফাস্টফুড খাওয়া ও কোমল পানীয় (সফট ড্রিংকস) পান করা
৪. অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকা
৫. ধূমপান করা ও তামাক খাওয়া
৬. গর্ভকালীন বিভিন্ন সমস্যা

যাদের বাবা-মা অথবা রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে এবং যাদের বয়স ৪৫ বছরের বেশি তাদের ডায়াবেটিস সম্বন্ধে অধিকতর সতর্ক থাকা দরকার। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সুতরাং প্রতিদিন যেমন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ডায়াবেটিস রোগীদের নানা ধরনের জটিলতা। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে ডায়াবেটিসকে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা যে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তা হল- দৈনন্দিন জীবনে আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা কম এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ না করা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে প্রতি বছর অসংখ্য মহিলা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ে শিশু জন্ম দিচ্ছেন। এর ফলে নবজাতকের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে সুরক্ষার জন্য গর্ভধারণের আগেই নারীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং ডায়াবেটিস না হলে তা নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারবেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে যদি তিনটি ‘D’ অর্থাৎ Diet, Drug, Discipline (পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও ব্যায়াম) নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন। এর ফলে ডায়াবেটিস রোগীরা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী হওয়া ছাড়াও সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনকভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারবেন।

সূত্র: যুগান্তর

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

বউয়ের জন্য আমার পুলাডার আজ এই অবস্থা!

বউয়ের জন্য আমার পুলাডার আজ এই অবস্থা!

বউয়ের হাওয়া ভাল না, বিয়ের তিনমাস না যেতেই স্বামী অসুস্থ! মন্টু মিয়ার…

মাথা ব্যথার সাথে বমি মারাত্মক রোগের লক্ষণ!

মাথা ব্যথার সাথে বমি মারাত্মক রোগের লক্ষণ!

একজন ভদ্রলোক (বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি) আমাদের ওয়ার্ডে ভর্তি পেটে ব্যথা এবং…

প্রি মিনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম

প্রি মিনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম

আচ্ছা! প্রি মিনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম নিয়ে একটু কথা বলি। প্রায় আশিভাগ মেয়েই এই…

ত্বকের সমস্যা অতিরিক্ত গ্লুকোজের লক্ষণ প্রকাশ করতে পারে

ত্বকের সমস্যা অতিরিক্ত গ্লুকোজের লক্ষণ প্রকাশ করতে পারে

অ্যাকানথোসিস নিগরিকান্সে আক্রান্ত হলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ত্বকের রঙ সাধারণত কৃষ্ণকায় কালো…

ডায়াবেটিক রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা করে গ্লুকোমিটার

ডায়াবেটিক রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা করে গ্লুকোমিটার

কয়েকদিন আগে এডমিশন নাইট ডিউটিতে একজন রোগী আসলো অজ্ঞান অবস্থায়। রোগী পার্টি…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর