সোমবার ২০, নভেম্বর ২০১৭ - ৫, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৪ - হিজরী



যোবায়ের মাহমুদ

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। 


অযথা এন্টিবায়োটিক ব্যবহারকে না বলুন

ব্যবহারের পর যে কোন পাত্র ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখাটা একদম স্বাভাবিক একটি কাজ। স্বাভাবিক ভদ্রতা। তাই না?
ভুল করে কেউ কাজটি যদি প্রায়ই না করে, আমরা তাকে ভুলোমনা বলি, খেয়ালী বলি।
এখন আপনাকে যদি একজন ভুলোমনা বিজ্ঞানীর নাম বলতে বলা হয়, আপনি কার নাম বলবেন?

জানি, আপনি মাথা চুলকে ভাবার চেষ্টা করছেন, কাকে রেখে কাকে বলি! সব বিজ্ঞানীই তো মোটামুটি ভুলোমনা। যে লোক ভুলোমনা না, সে তো বিজ্ঞানী হবারই যোগ্য না!

এমনি একজন ভুলোমনা বিজ্ঞানীর নাম ড. আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। নামটা পরিচিত লাগছে, তাই না? কেন লাগবে না,বলুন?

সেই ছোটবেলা থেকে যতবার ব্যাকটেরিয়ার নাম পড়েছেন, এই ভদ্রলোকের নামে তো একবার না একবার চোখ বুলাতেই হয়েছে!

১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ড. ফ্লেমিং টাইফয়েড জীবাণুর সম্ভাব্য প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। স্টাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর পেট্রিডিশগুলো তিনি একদিন পরিষ্কার করতে ভুলে গেলেন। ওভাবেই পড়ে রইলো ব্যবহৃত পেট্রিডিশ। কে জানতো এই ভুলই এক অসাধারণ আবিষ্কারের সূচনা করবে! 

বেশ কিছুদিন পর তিনি পেট্রি ডিশগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। ডিশের ব্যাকটেরিয়াগুলোর চারপাশে ছত্রাক জন্মানোর কারণে ব্যাকটেরিয়াগুলো বড় হতে পারছে না!

পরীক্ষা করে দেখা গেলো, খুব সাধারণ এক ধরণের ছত্রাক পেনিসিলিয়াম নিঃসৃত পেনিসিলিন এর জন্য দায়ী।

এবার শুরু হলো পেনিসিলিনের গঠন বোঝার চেষ্টা। কয়েক বছরের অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের ফলে পরবর্তীতে আরও দুজন বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ফ্লোরে এবং আর্নেস্ট বরিসের সাথে সামগ্রিক প্রচেষ্টায় তিনি এ কাজে সফলও হন। এসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ড. ফ্লেমিং এর সহযোগীদ্বয় পাড়ি জমান আমেরিকায়।

যুদ্ধ চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। 

সৈনিকেরা প্রতিনিয়তই নিহত হচ্ছে, আহত হচ্ছে। তাদের মারাত্মক ক্ষতগুলোতে চিকিৎসার অভাবে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হচ্ছে। আহত সে সৈনিকদের তাবু থেকে থেকে থেকে ভেসে আসছে আর্ত-চিৎকার, অসহায় আর্তনাদ। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন পেনিসিলিন ব্যবহার করবেন। আগেই ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছিল। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত পেনিসিলিন প্রয়োগে এত চমৎকার ফলাফল পাওয়া গেল যে, ১৯৪২ সালের জানুয়ারী থেকে মে, এই পাঁচ মাসে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন তৈরী করে আমেরিকার ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানীগুলো। এবং পেনিসিলিনের এই সফল প্রয়োগে মিত্র বাহিনীতে সৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা কমে এলো বহুলাংশে। বলা হয়, এ যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয়ের অন্যতম হাতিয়ার ছিলো পেনিসিলিন।

যুদ্ধ শেষে ড. ফ্লেমিংএর খ্যাতির মুকুটে জমা হতে থাকে একের পর এক স্বর্ণপালক। ১৯৪৩সালে রয়্যাল সোসাইটি অফ বায়োলজির ফেলো, ১৯৪৪ সালে নাইটহুড এবং ১৯৪৫ এ তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন। ১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন 'পেনিসিলিন ম্যান'।

এরপর একের পর এক নতুন নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়েছে প্রয়োজনের তাকিদে। যেকোন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে মানুষের মারা যাবার ঘটনা এখন নেই বললেই চলে। এন্টিব্যাকটেরিয়াল এসব ঔষধ মূলত পাচটি পদ্ধতিতে কাজ করে।

১. সেল ওয়াল সিনথেসিস ইনহিবিশন

২. প্রোটিন সিনথেসিস ইনহিবিশন

৩. সেল মেমব্রেন অলটারেশন

৪. নিউক্লিক এসিড সিনথেসিস ইনহিবিশন

৫. এন্টিমেটাবলিক অ্যাক্টিভিটি

আমরা যখন এন্টিবায়োটিক খাই বা ইন্ট্রাভেনাসলি এন্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করাই, তখন এ পাঁচটি পদ্ধতির যেকোন একটি পদ্ধতিতে তা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে এবং ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু ঘটায়।

কিন্তু নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিকের বদলে ব্যাকটেরিয়া যদি ভিন্ন এন্টিবায়োটিক পায় অথবা নির্দিষ্ট ডোজের (পরিমান) বদলে কম ডোজ পায়, সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া নিজেই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তার জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট একটা প্রজাতির জন্ম দিবে, অর্থাৎ সহজ কথায় আপনি এন্টিবায়োটিক খাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ব্যাকটেরিয়া মরছে না!

কি ভয়ানক অবস্থা, একটি বারও কি ভেবেছেন?

আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে একটা সময় আসবে যখন আমরা অসুস্থ হবো, কিন্তু সুস্থতার নামটাও মুখে আনতে পারবো না। বরং ওই অসুস্থতাতে ভুগে ভুগেই আমরা পৌছে যাবো কবরে, শেষ ঠিকানায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৫ সাল থেকে নভেম্বরের ১৩-১৯ তারিখ এই সাতদিনকে অর্থাৎ নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহটিকে বিশ্বব্যাপী এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ বলে ঘোষণা করেছে, এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে আমাদেরকে সচেতন করে তুলতে। যথেচ্ছা এন্টিবায়োটিক ব্যবহারকে না বলতে।

আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা এই মহাদুর্যোগের সামনে আমাদের করণীয় তাহলে কি? আমরা কি ধুকে ধুকে মরে যাবো?
আমাদের অস্তিত্ব এত সহজেই বিলীন হয়ে যাবে?

প্রিয় পাঠক, আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি, এ দুর্যোগের ঘনঘটা দূর হয়ে যাবে, যদি আমরা কয়েকটা শপথ নিতে পারি -

১. রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক শুরু করবো না।

২. এন্টিবায়োটিক শুরু করলে অবশ্যই ফুল কোর্স শেষ করবো।

৩. গর্ভাবস্থায় এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন করবো।

৪. কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবো। 

৫. ফার্মেসীওয়ালার কথায় কিংবা অন্যকারো ব্যবস্থাপত্র দেখে আমরা এন্টিবায়োটিক খাবো না।

আমরা যদি সচেতন হই, আমরা যদি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারি শূণ্যের কোঠায়, তাহলেই আমাদের আগামী দিনগুলো নিরাপদ হবে।
আগামী প্রজন্ম থাকবে নিরাপদে।

"আজিকে দুটো কাল তিনটে আমরা যদি ভাই
এন্টিবা-য়ো-টিক্ খেয়ে যাই ইচ্ছে মতন তাই
গা ম্যাজমেজে কাশি খুশখুশ
একটু জ্বরে হয়েই বেহুশ
আত্মরক্ষার অস্ত্র হবে উল্টো ক্ষতির কারণ
অযথা তাই এন্টিবা-য়ো-টিক্ ব্যবহার বারণ!"

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ

ডা. হোসনে আরা ও সিজারিয়ান প্রসঙ্গ

ডা. হোসনে আরা ও সিজারিয়ান প্রসঙ্গ

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১০:০১















High blood pressure redefined for first time in 14 years: 130 is the new high

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৪৬


New global commitment to end tuberculosis

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৩১


























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর