ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)।


১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০৪:৪৮ পিএম

উন্নত দেশের মত এপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু হলে রোগীরা বেশি সময় পাবেন

উন্নত দেশের মত এপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু হলে রোগীরা বেশি সময় পাবেন

বাংলাদেশের ডাক্তাররা সরকারী হাসপাতালের বহিঃবিভাগে গড়ে ৪৮ সেকেন্ডে রোগী দেখেন!

প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই খবরের আসলে বাস্তবতা কতটুকু?

প্রথম কথা হল, খবরটি শতভাগ সঠিক। এটি একটি গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া, যা বিখ্যাত ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল এই বছরের জুলাই মাসে গ্রহণ করে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করে।

তবে, এটি আসলে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত একটা গবেষণাপত্র থেকে ডাটা নিয়ে তৈরি নতুন রিসার্চ পেপার।

এবার আসি দেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে।

২০১৫ সালে মোট ১৭৮৬৯৭৯৫৮ বা ১৭৮.৭ মিলিয়ন রুগী দেশের সরকারী হাসপাতালের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন (DGHS ২০১৬)।

২০১৫ সালে এ দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৬১.২ মিলিয়ন (বিশ্বব্যাংক ২০১৫)।

এর মানে হল দেশের মোট যে জনসংখ্যা তার চেয়ে ১৭ মিলিয়ন বেশি মানুষ বহিঃবিভাগে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছে। অর্থাৎ কিছু মানুষ একই বছরে বেশ কয়েকবার গিয়েছেন।

সরকারী হাসপাতালগুলোতে রুগীর চাপ কেমন থাকে সেটা এ হিসেব থেকে সহজেই অনুমেয়।

দেশে মোট রেজিস্টার্ড ডাক্তার ৭৮৫৭২ জন (বিএমডিসি ২০১৬)। এর মধ্যে ১০ হাজার ডাক্তার দেশের বাহিরে চলে গেছে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে রেজিস্টার্ড ডাক্তার ৬৮৫৭২ জন।

দেশে বর্তমানে প্রতি ২০৩৯ জন মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে (DGHS ২০১৬)।

সরকারী সার্ভিসে আছে মোট ২২৩৭৪ জন ডাক্তার, অর্থাৎ প্রতি ১০০০০ হাজার লোকের জন্য সরকারী ডাক্তার ১.৪৩ জন।
এর মধ্যে বহিঃ বিভাগে রুগী দেখেন প্রায় ১০০০০ জন ডাক্তার।

সরকারী সার্ভিস আটটা থেকে দুটো পর্যন্ত মোট ছয় ঘণ্টা হলে এবং শুক্রবার ও অন্য ছুটির দিন বাদ দিলে বছরে ৩০০ দিন ছয় ঘণ্টা করে হলে একেকজন ডাক্তারের মোট সার্ভিস হয় বছরে সর্বোচ্চ্য ১৮০০ ঘণ্টা।

আর ১০০০০ জন ডাক্তারের মোট সার্ভিস হয় ১৮০০০০০০০ ঘণ্টা বা ১৮০ মিলিয়ন ঘণ্টা বা ১০৮০ মিলিয়ন মিনিট।

এখানে মোট রুগীর সংখ্যা ১৭৮.৭ মিলিয়ন হলে, সব ডাক্তার যদি তাদের কর্ম ঘণ্টার সবটুকু সেকেন্ডই রুগীকে দেয়, অর্থাৎ মেশিনের মত বিরতিহীন এক নাগাড়ে কাজ করে, তবে তারা সর্বোচ্চ্য একজন রুগীকে সময় দিতে পারবে ৬.০৪ মিনিট বা ৩৬০ সেকেন্ড। এর বেশি কোনভাবেই সম্ভব না।

তবে থিওরিটিক্যালি এই ৬ মিনিট সম্ভব হলেও, প্র্যাক্টিক্যালি এই ৬ মিনিট দেওয়াও সম্ভব নয়।

এবার আসি ৪৮ সেকেন্ডের ব্যাখ্যা। সংবাদে এসেছে ডাক্তার রুগীকে সময় দেয় ৪৮ সেকেন্ড। তবে সেটা আসলে ডাক্তাররা দেয় না, দেয় মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা। প্রথম আলোর শিশির মোড়ল সেটা এড়িয়ে গেছে অপসাংবাদিকতা করতে গিয়ে।

মূল গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, ডাক্তাররা একজন রুগীকে দেয় গড়ে ৫৪ সেকেন্ড, যেটা ১৯৯৪ সালের ডাটা থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুযায়ী।

১৯৯২ সালে দেশে প্রতি ৫২৪২ জন লোকের জন্য একজন ডাক্তার ছিল। বর্তমানে প্রতি ২০৩৯ জন মানুষের জন্য একজন ডাক্তার অর্থাৎ এখনকার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি লোকের জন্য সে সময় একজন ডাক্তার ছিল। তাহলে ১৯৯৪ সালে যদি একজন ডাক্তার ৫৪ সেকেন্ড সময় দেয়, সেই হিসেবে এখন সেটা দেড়গুণ বেশি হওয়ার কথা। অর্থাৎ রুগী প্রতি ৮১ সেকেন্ড সময় দেওয়ার কথা।

২৫ বছরে ডাক্তারদের স্কিল বৃদ্ধি ও সার্ভিস প্রদানকে বীজগাণিতিক হারে বাড়িয়ে এডজাস্ট করলে এটা হয় ১৫০ সেকেন্ড।

আবার সর্বোচ্চ্য সার্ভিস দিলে একজন ডাক্তার একজন রুগীকে সর্বোচ্চ্য ৩৬০ সেকেন্ড সময় দিতে পারবে।

তাহলে বাকি ২১০ সেকেন্ড যাচ্ছে কোথায়?

একজন রুগী যখন বহিঃ বিভাগে চিকিৎসা নিতে যায়, তাহলে ডাক্তারকে শুধু চিকিৎসা দেওয়াই নয়, আরো কিছু কাজ সরকারী নিয়মে করতে হয়।

চিকিৎসা দেওয়ার খাতায় রুগীর, নাম, বয়স, লিঙ্গ ও সম্ভাব্য রোগের নাম এন্ট্রি করতে হয়। এরপর রুগীর কমপ্লেইনগুলো নোট করতে হয়। এরপর ওষুধ লিখতে হয়। ওষুধের নাম এক জায়গায় না, দু জায়গায় লিখতে হয়। একটা প্রেসক্রিপশনে, আরেকটা শর্ট স্লিপে। এসবে চলে যায় ২১০ সেকেন্ড।

বাকি ১৫০ সেকেন্ড চলে যায় রুগীকে পরীক্ষা করা ও চিকিৎসা প্ল্যান ঠিক করতে। অর্থাৎ একজন ডাক্তার চাইলেও এর চেয়ে বেশি সময় রুগীকে দিতে পারবে না।

দিনকে যেমন ২৪ ঘণ্টার বেশি করা সম্ভব নয়, তেমনি দেশে যে পরিমাণ ডাক্তার আছে, তাদের দিয়ে রুগী দেখা ও অন্যান্য কাজ মিলে রুগী প্রতি একশ পঞ্চাশ সেকেন্ডের বেশি সার্ভিস দেওয়ানো সম্ভব না।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, উন্নত দেশে ডাক্তাররা রুগীদের এতো সময় (গড়ে ১২-১৫ মিনিট) দেয় কি করে?

উন্নত দেশে বহিঃবিভাগে সেবা নিতে হলে এপয়েন্টমেন্ট করে নিতে হয় আগে। ডাক্তাররা একদিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ রুগীর বেশি দেখে না। ফলে সিরিয়াল দিলে দুই মাস, তিন মাস পর একজন রুগীর সিরিয়াল পরে। দুই মাস পরে যখন কারো সিরিয়াল আসবে, তখন গিয়ে ডাক্তার তাকে দেখবে।

এইজন্য তারা একজন রুগীকে বেশি সময় নিয়ে ভালোভাবে দেখতে পারে। তবে জরুরী মরণাপন্ন রুগী হলে অবশ্য সেটা ভিন্ন ব্যাপার, তখন সাথে সাথে দেখবে।

কিন্তু আমাদের দেশে এই সিস্টেম নেই। যার যখন ইচ্ছে বহিঃবিভাগে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। একজন ডাক্তার প্রতিদিন একশর বেশি রুগী দেখছে বহিঃ বিভাগে। ফলে, চাইলেও রুগীদের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আর যদি উন্নত দেশের মত এপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয় এদেশে, তবে হয়তো রুগীদের আমরাও ১২০-১৫ মিনিট ধরতে দেখতে পারব, কিন্তু এদেশে জনসংখ্যার প্রেক্ষিতে একেজন রুগীর সিরিয়াল পড়বে যেদিন সিরিয়াল দিবে তার ছয় মাস পর।

আমি ব্রিটিশ জার্নালের ঐ গবেষণা প্রবন্ধটি পড়েছি। গবেষণায় তারা ডাক্তারদের সময় দেওয়াকে যতটা না হাইলাইট করেছে, তার চেয়ে তারা বের করেছে যে যেসব দেশে স্বাস্থ্যখাতে সরকারী বাজেট কম, সেসব দেশের লোকেরা চিকিৎসার জন্য সময় কম পায়।

এজন্য গবেষণার শেষে সরকারের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে সমস্যা সমাধানে।

আসলে, আমাদের দেশের এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে দুটো দিকে এখন গুরুত্ব দিতে হবে।

১. বেশি করে সরকারী ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া।

২. স্বাস্থ্যখাতে বাজেট আরো বেশি করে বাড়ানো।

প্রথম আলোর উচিত ছিল তাদের লেখায় এই গুরুত্বপুর্ন দুটো দিক তুলে ধরা। কিন্তু বিশেষ কারণবশত বরাবরের মতই তারা সবকিছু ডাক্তারদের উপর চাপিয়ে রিপোর্টিং সেরেছে।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত