ঢাকা      সোমবার ১৮, জুন ২০১৮ - ৪, আষাঢ়, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী

লেকচারার, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ


উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে গিয়ে মনে হয় পিছে কিছু একটা ছুটে যাচ্ছে!

আমার এক পরিচিত বড় ভাইয়ের প্রেমিকা তার মেডিকেল কলেজে এক্সামিনার হয়ে এসেছিলেন। ভাই এখনও লেকচারার। দুপুর থেকে প্রায় মাঝ রাত অবধি একটা ক্লিনিকের ছাদে একা একা বসেছিলেন। বুড়ো বয়সে মন ভেঙ্গে গেলে যা হয় আরকি।

ভাইয়ের দোষ নেই। অধরা সোনার হরিন ডিগ্রি আর টাকার পিছে ছুটেছেন, এখনও ছুটছেন। ডিগ্রি অধরা, টাকাও হয় নি ডিগ্রিও হয় নি; ভালবাসাটাও নেই।
... ... ... 
ইন্টারনির সময় যখন বড় ভাইদের সাথে ক্যারিয়ার-চাকরি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতাম এক সিনিয়ার ভাই একদিন খেপে গিয়ে বললেন, “তুই খালি টাকা-ডিগ্রির পিছে দৌড়াবি। অঢেল টাকা কামাবি তা জন্য পিজির লাইব্রেরিতে চোখ-কান গুঁজে পড়ে থাকবি আর দেখবি তোর বউ ঠিক তোর পাশেই রমনা পার্কে বসে আরেকজনের সাথে পরকিয়া করছে। তুই তখন তোর ডিগ্রী আর টাকা নিয়ে মুড়ি খাইস। শুন খালি ডিগ্রী আর চাকরির কথা বাদ দে, বাপ-মা আছে না? বউ হবে না? তাদের নিয়েও একটু চিন্তা করিস”

কথাগুলা শুনে কেমন জানি লেগেছিল। পরে শুনলাম ওইটা ভাইয়ের নিজের বাস্তব জীবন! 
... ... ... 
এক ম্যাডাম ছিলেন। কোর্সে থাকার সময় বিভাগীয় প্রধানের খামখেয়ালী আর রোষানলে থাকার জন্য পাশ করতে পারছিলেন না। প্রতিদিনের অপমানের সহ্য করতে না পারার কারনে পারিবারিক জীবনও হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। একদিন ম্যাডামের ছোট মেয়ে এসে বললেন, “মা গত কয়েক মাসেও তুমি আমাদের মাথায় হাত রাখ না নাই। ঠিক মত কথাও বল নাই। যাই বলছ খালি বকা দিছ। তোমার চাকরি (ডিগ্রী) করার দরকার নাই। আমাদের সাথে ভালো থাক।”

ম্যাডাম সেই দিন ঝর ঝর করে কেঁদেছিলেন মেয়ে ধরে। ঠিক করেছিলেন কোর্স ছেড়ে দিবেন যদি পাশ করতে না পারেন। যাক ছাড়ার দরকার পড়ে নি; পাশ করেছিলেন ঠিক পরের বারই। 
... ... ... 
আমি আপনাকে সবকিছু চেড়ে দিয়ে ডা. এড্রিক বেকার কিংবা মাদাম তেরেসা হতে বলছি না।
ডাক্তার সাহেব একটু চিন্তা করবেন, একদিন সকালে উঠে দেখলেন রেজাল্ট শিটে আপনার নামের পাশে গোল্ড মেডালিস্ট লিখা অথছ এই খুশির সংবাদটি শুনানোর মত আপনার কেউ নেই; দেখবেন খুশিটা কেমন জানি অর্থহীন।

অঢলে টাকার মালিক আপনি; প্যারিসের সব থেকে সুন্দর কফি শপে প্রিয়জন ছাড়া একা বসে খাওয়া কফিটাকেও বিস্বাদ মনে হবে। রেস্তোরাঁয় কম ভলিউমের রোমান্টিক গানকে শব্দ দূষণ মনে হবে।

আপনি যেই সফলতার পিছে ছুটছেন সেই সফলতার মাপকাঠি আপনি নিজেও জানেন না। আপনার পদধুলি হয়ত একদিন এমন শিখরে যাবে যেখানে হয়ত আপনার স্বপ্নও পৌছায়নি।
কিন্তু সেই উচ্চ শিখরে পৌছাতে গিয়ে পিছে মনে হয় পিছে কিছু একটা ছুটে জাচ্ছে!

আমার কাছে মনে হয় জীবনে সফলতার কোন মাপকাঠি নেই। অর্থ, ডিগ্রি, সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতা কোনটাই আমার কাছে সফলতার মাপকাঠি না।

আমারা কাছে সফল ব্যক্তি সেই, যে মানুষটা মনুষ্যত্বের বিচারে একজন মানুষ হিসেবে, ধর্মীয় বিচারে একজন ধার্মিক হিসেবে, দেশের কাছে একজন নাগরিক হিসেবে, বাবা-মায়ের কাছে সন্তান হিসেবে, ভাইয়ের কাছে বোন হিসেবে, স্ত্রীর কাছে স্বামী হিসেবে, সন্তানের কাছে বাবা/মা হিসেবে কতটুকু সফল; দিন শেষে ওই হিসেব গুলোই আসল, বাকি সব হিসেব গৌন...... না হয় নকল। 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমি তাদের বেদনাটা টের পাই

আমি তাদের বেদনাটা টের পাই

কেউ যখন ডাক্তারি পড়তে যায় ধরে নেওয়া যায় পেশাটার প্রতি তার একটা…

ট্রান্সফিউশন মেডিসিনে নতুন দিগন্ত

ট্রান্সফিউশন মেডিসিনে নতুন দিগন্ত

ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের ডায়াগনোসিস সেক্টরে একসময় যাদের পদচারণা ছিল তাদের মধ্যে আমাদের অনেক…

জীবন-মৃত্যু

জীবন-মৃত্যু

ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে রাস্তায় হাঁটছে ডা. তমাল। উৎসুক জনতা…

অ্যানেস্থেসিয়ায় মৃত্যুতে চিকিৎসকদের দোষ কেন?

অ্যানেস্থেসিয়ায় মৃত্যুতে চিকিৎসকদের দোষ কেন?

একজন সচেতন মানুষ মাত্রই এটা বুঝেন যে, অ্যানেস্থেসিয়া বা অজ্ঞান অবস্থাটা মৃত্যুর…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর