ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. মোবাশ্বের আহমেদ নোমান

ডা. মোবাশ্বের আহমেদ নোমান

অ্যাসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার, সার্জারি, 

রংপুর আর্মি মেডিকেল কলেজ। 


০৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:২৭

এন্টিবায়োটিক সন্ত্রাস : বাঁচতে চাইলে জানতে হবে

এন্টিবায়োটিক সন্ত্রাস : বাঁচতে চাইলে জানতে হবে

আমি তখন নাক কান গলা ডিপার্টমেন্টে ডিউটিরত। এক মেয়েকে নিয়ে একদল লোক এসে ঢুকল। ডিউটি ডাক্তারের ছোট রুমটা ভর্তি। মেয়েটা গোঙ্গানি সুরে শব্দ করছে মুখ দিয়ে লালা ঝড়ছে। হ্যাংগিং বা ফাঁসিতে ঝুলেছিল মেয়েটা।মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। দ্রুত তার প্রাইমারী কেয়ার নিয়ে রেস্পেক্টিভ স্যারকে কল দিলাম। স্যার এসে দায়িত্ব নিলেন। আমার ডিউটি টাইম শেষ। আরেকজন ডিউটি ডাক্তার এসে গেছে। আমি মেয়ের মা ও বাবাকে পাশের রুমে ডেকে নিয়ে কারন জিজ্ঞাসা করলাম। আমি ভেবেছিলাম প্রেমঘটিত কোন ব্যাপার যেহেতু মেয়ের বয়স ১৭ বছর। মা কাঁদতে কাঁদতে বলল বাবা আমি বা তোমার চাচা জীবনেও মেয়েকে গালি দেই নাই হাত উঠানো তো দুরের কথা। আজ তার উপর একটু রাগ হয়েছিলাম এতেই সে গলায় ফাঁসি দেয়!

আমি শুনে পুরোই অবাক। মনে পড়ল ক্লাশ টেন এ ঊঠেও ছোট বোনকে মারার জন্যে মায়ের হাতে মার খেয়েছি। কই ফাঁসি বা অন্য কিছু তো মাথায়ই আসেনি! আর মায়ের বকুনি তো হেসেই উড়িয়ে দিতাম। দিনে কতবার খেতাম 
আসলেই ব্যাপারটা এমন আপনি যদি ছোটবেলা থেকে নিয়মিত কারণে অকারণে বকুনি খান তবে বড় হয়ে আপনি বকুনি খেলে হাসিই পাবে কারণ আপনি বকুনি রেজিষ্ট্যান্ট! মানে বকুনি আপনার চামড়ার ভিতর ঢুকে না মাথার এন্টেনার উপর দিয়ে যায়। 

এখন আপনি জীবনেও বাবা মায়ের বকুনি খাননি আদরে আহলাদে বড় হয়েছেন হঠাৎ একদিন কোন কারণে আপনার মা বাড়ির সবার সামনে আপনাকে বকুনি দিল, রাতে আপনি লাজে দুঃখে অপমানে ফাঁসিতে ঝুললেন। মানে আপনি বকুনি সেনসিটিভ। অর্থাৎ বকুনি আপনার গায়ে খুব লেগেছে। অথবা সংসার জীবনে আপনি জীবনেও স্বামীর হাতে মার খাননি আজ ১০ বছর পর কি এক কথায় আপনার স্বামী গায়ে হাত তুলেছে। আপনি দুঃখে বাপের বাড়ি চলে গেলেন। কারণ আপনি মাইর সেনসিটিভ।

আমার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের একটা ফোঁড়া হয়েছে। পাশের একজন কোয়াক (হাতুড়ে) তার সেই ফোঁড়া গলিয়ে প্রেস্ক্রিপশন করে দিছে । ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেলে চাচা এসে বলল, বাবা দৈনিক ৩০০ টাকার ঔষধ খেতে হচ্ছে। আর তো পারি না ! দেখি প্রেসক্রিপশনে তিনটা দুইটা এন্টিবায়োটিক একটা ইনজেকশন সেফট্রোন দৈনিক এক গ্রাম আইভি আর একটা ওফ্লক্সাসিন। সেফট্রোন এর দামই সম্ভবত ২০০ টাকা! চাচা যখন টাকার কথা ভাবছে, আমি ভাবছি ভবিষ্যতের কথা এক অজানা সন্ত্রাসের কথা। এন্টিবায়োটিক সন্ত্রাস। এই যে কারণে অকারণে কোয়াকরা বা ফার্মেসিগুলো এই এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে, ওর যদি কোন বড় অপারেশন করা হয়। আর ডাক্তাররা সেফট্রোন ইনজেকশন দেয়। তখন দেখা যাবে কোন কাজই হচ্ছে না। তখন কি হবে ? কেন কাজ হবে না বুঝেছেন? কারণ সে আগে থেকেই সেফট্রোন মিসইউজের ফলে সেফট্রোন রেজিষ্ট্যান্ট! সেফট্রোনকে ব্যাক্টেরিয়া হেসেই উড়িয়ে দিবে। মায়ের কত বকুনি খেলাম টাইপের। যদি সেনসিটিভ হত সেফট্রোনকে দেখা মাত্রই রাগে দুঃখে ফাঁসিতে ঝুলত ব্যাক্টেরিয়াগুলো। 

আপনি পেনিসিলিন এন্টিবায়োটিক এর নাম শুনেছেন, ওরাসিন কে নামে বহুল ব্যবহৃত ছিল ১ টাকা দাম। কিন্তু এভাবে মিসিইউজের ফলে আমরা পেনিসিলিন রেজিষ্ট্যান্ট! এখন সামান্য জ্বর হলেই ৪০ টাকা দামের এজিথ্রোমাইসিন খেতে হয়। বর্তমান সেফট্রোন (সেফট্রায়াক্সোন) বা লেটেস্ট জেনারেশনের ২০০ টাকার গুলো মিসইউজ করলে এগুলো রেজিষ্ট্যান্ট হলে কি হবে? তা এন্টিবায়োটিক সেনসিটিভিটির সামপ্রতিক রিপোর্টগুলো চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যেখানে দেখা যায় মেরোপেনেম ছাড়া সব রেজিষ্ট্যান্ট! মেরোপেনেম এর দাম জানেন? ১০০০ টাকার কাছাকাছি পার ডোজ !

কোয়াকরা যদি দুইদিন পর মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভদের পাল্লায় পড়ে মেরোপেনেম ও প্রেসক্রাইব করা শুরু করে আর এটাও আপনার রেজিষ্ট্যান্ট হয়ে যায়। আপনি সামান্য জ্বরেও কার্যকরী বা সেনসিটিভ এন্টিবায়োটিকের অভাবে মারা যাবেন! এত এন্টিবায়োটিক থাকলেও আপনার মৃত্যু হবে বেশী এন্টিবায়োটিক ইউজের ফলে সেনসিটিভ এন্টিবায়োটিকের অভাবে ।

আরেকটা সত্যি কথা এদেশের মত বিশ্বের কোন সভ্য দেশে এন্টিবায়োটিক ঔষধের দোকানে মুড়িমুড়কির মত বিক্রি হয় না বা কোয়াকরাও এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করে না ।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত