ডা. শরীফুল আলম রুবেল

ডা. শরীফুল আলম রুবেল

ডিপ্লোমা ইন ফরেনসিক মেডিসিন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ (আন্ডার বিএসএমএমইউ)। 


০৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:৩২ এএম

সিওমেক মর্গের সেই মিলনের মুখে লাশ কাটার গল্প

সিওমেক মর্গের সেই মিলনের মুখে লাশ কাটার গল্প

মিলন, আগে-পাছে কোন নাম জানা নাই। ৪ ফুট ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ছোটখাটো মানুষ। কানে কম শুনেন। 'S' সাইজের শার্ট আর সর্ট প্যান্টে মরচুয়ারী দৌড়ে বেড়ান। আমাদের মেডিকেলের মরচুয়ারী-এ্যাসিসটেন্ট, সহজ বাংলায় "ডোম" বলে আপনারা ডাকেন। 

আমার পরিচয় গত ১ বছর ধরে। পোস্ট-গ্রাজুয়েসন কোর্সের বাধ্যতামূলক ১৫০টা ময়না-তদন্তের জন্য মর্গে প্রায়ই যেতে হয়। আর প্রতিবারই এই বিনয়ী, স্মিতহাস্য, কানে কম শুনা ছোটখাট মানুষটাকে দেখি অসাধারণ নৈপুণ্যে, মৃতদেহে সর্বোচ্চ সম্মান ও যত্নের সাথে প্রয়োজনীয় কাটা-ছেড়াঁয় ডাক্তারকে সহায়তা করেন।

আমি জিজ্ঞেস করি: কত বছর ধরে আছেন ?
হাসিমুখে মিলনের জবাব: জানিনা সার, ১৯৯৪ থেকে আছি, ১০-১৫ (!!!) বছর অইব। এর আগে ঢাকা মর্গে ছিলাম।

আমি বলি: কতটা পোস্ট-মর্টেম করলেন এ যাবৎ; আর কতদিন করবেন? 
হাসিমুখে মিলনের জবাব: ডেইলি ২/৩ টা করি সার, শ-পাঁচেক (!!!) হইব করছি। আর আল্লা যতদিন বাঁচায় কাজ করব। ইটা আমার দায়িত্ব সার, মানুষে আইনর বিচার পাইব, ভালা লাগে করতে।

আমি আগ্রহ নিয়ে বলি: মৃতদেহ কাটতে কষ্ট লাগে না ? 
হাসিমুখে মিলনের জবাব: জ্বী না সার, এখন অলবাস হই গেছে। ঢাকাতে তো ডেডবডির সাথে ঘুমাইতাম, ৩/৪ টা বডির মাঝে অল্প জায়গা পাইলে শুয়ে পড়তাম। কোনদিন তো জায়গাও মিলত না, সার।

আমি ঠাট্টাচ্ছলে বলি: তাহলে তো তুমি দুআ কর, ডেইলি মানুষ মরুক, আর পোস্ট-মর্টেম হোক?
জিহবা-কামড়ে, সলজ্জ মিলনের জবাব: জ্বী না, জ্বী না। আল্লা সবরে হায়াত দেউক সার। মানুষ বাচৌক। কারও ক্ষতি অউক না সার। মরলে সবার লস সার।

আমি হেসে বলি: মায়ানমারে তোমাকে পাঠিয়ে দেই, ১০০-২০০ পোস্টমর্টেম ডেইলি পাবে। 
আশ্চর্য মিলনের জবাব: ইই কিতা খইন সার। অত্ত মানুস মররা নি ? এরা কুনতা বুঝে না সার। মরলে তো লস সার। মানুসর ক্ষতি করিয়া লাভ নাই, সার।

আমি গল্পচ্ছলে বলি: অটপসি করতে কখনও খারাপ লাগে না ?
বিব্রত মিলনের জবাব: লাগে তো সার, লাগে। ছোট-কম বয়েসী বাচ্চা, সার। এরা দুনিয়ার কিছুই দেখল না, তাঁদের পোস-মটেম ও খষটো লাগে। আর সার, মেডিকেলের ইস্টুডেন্ট-এর পোস-মটেম ও খারাপ লাগে। তাঁরা অখান ও কেলাস করিয়া বড় সার অইতা, মরলে তো লস সার।

 

আমি মৃদুসুরে বলি: বিকৃত বডি করতে তো একটু অসুবিধা হবার কথা ?
বিনীত মিলনের জবাব: আল্লা মাফ খরুক সার। পচাঁ-গলা-ফুলা সব মানুস অউ সমান, সার। সবরে একরকম দেখি, আমরা সম্মান না খরলে, সরম সার।

আমি আবার বলি: তুমি কই থাক, মিয়া ? ডাক্তারকে এখন সাংবাদিক-মিডিয়া মিলে; মানুষের শত্রু বানিয়ে দিছে ।
রাগত মিলনের জবাব: এরা কুনতা বুঝে না সার। নিজর লস করের। আপনি বিদেশ যাইনগি সার। এরা সম্মান দিত জানেনা, সার।

আমি বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে বলি: ডাক্তারদের জন্যে দুআ করেন? পরে কেউ (ডাক্তার হয়ে) খবর নেয়?
হাসিমুখে মিলনের জবাব: দুআ করি সার। আফনেরা সব বড় ডাক্তার অউক্কা। আপনেরা সময় পাইন না সার, তাই আর খবর লইন না। আমি বিষুদবারে 'দরগা-মাজার' এ সবার লাগি দুআ করি, সার।

আমি প্রতিবারই দেখি, প্রতিটা মৃতদেহ এলে প্রথমেই পরম মমতায়, সহজ-সরল, কানে কম শুনা এ মানুষটা মৃত ব্যক্তির মুখ দেখেন (তখন কী ভাবেন আল্লাই জানেন)। ভারী মৃতদেহ একাই বহনের শক্তি রাখে যে মানুষটা, ছুরি হাতে যে পাক্কা প্রফেশনাল, যে অল্প-সময়ে কেটে-ছিঁড়ে পোস্ট-মর্টেম শেষ করে, যে মৃতদের ভাষা শুনে এবং বুঝে বলে দাবী করে। 

সেই মানুষই আবার দুআ করেন,
"সব মানুষ বাচৌক সার, মারামারি খরলে লস। কম-বয়সীরা বড় অইয়া ভালা মানুষ অউক; মানুষ বুঝে না সার। খালি বেটাগিরি আর মারামারি।"

আমি আর কথা না বাড়িয়ে; ইন্জিন গরম বাইকে গিয়ার ফেলে, চালাতে শুরু করি। যেতে যেতে ভাবি, মর্গে মৃতদের সাথে সময় কাটানো এই অল্প-শিক্ষিত মানুষের বিবেক-জ্ঞান-বুদ্ধি-মূল্যবোধ; আপনার-আমার অনেকের চেয়ে ও অনেক উন্নত। আমরা তো তাঁর মতো চিন্তাই করি না যে,
"""সব মানুষ বাচৌক সার, মারামারি খরলে লস।"""

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না