ডা. এম এ কাশেম

ডা. এম এ কাশেম

পরিচালক, সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।


০৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:৩৬ পিএম
ডা. এম এ কাশেম-এর স্মৃতিচারণ

এম আর খান স্যার বলতেন, পেশার মান বজায় রাখা অনেক জরুরি

এম আর খান স্যার বলতেন, পেশার মান বজায় রাখা অনেক জরুরি

উপমহাদেশের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর এই দিনে তিনি আমাদেরকে এতিম বানিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। একজন কিংবদন্তীর জীবনাবসানে আজ শুধুই মনে পড়ছে স্যারকে, যার পাশে থেকে কাজ শিখেছি সেবার মাধ্যমে কীভাবে মানুষের ভালোবাসা আদায় করা যায়। বার্ধক্যকে জয় করে তিনি ছিলেন চিরতরুণ। রূপকথার মতো ছিলো তার বাল্যকাল, গল্পের মতই ছিলো তাঁর জীবন। এম আর খান স্যারের সঙ্গে আমার আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আজ ভাবতেই কষ্ট লাগছে যে, আমাদের অভিভাবকতুল্য সেই মানুষটি আজ নেই!

জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান স্যার বৃটেনে যার আন্ডারে কাজ করতেন তার নাম ছিলো ডা. ডিকসন। তিনি একদিন স্যারকে বললেন, ‘খান তুমি কি এ দেশে থাকবে? ইউ উইল বি কনসালটেন্ট লাইক মি।’ স্যার বললেন, ‘আমরা কালো চামড়ার মানুষ। কে চাকরি দেবে আমাদের? ডা. ডিকসন রিপ্লাই দিলেন, ‘আই শ্যাল সি দ্যাট ইউ গেট দি চান্স।’ স্যার বললেন, ‘না, আমি এ দেশে থাকব না। কারণ আমার মতো লোক আপনার এখানে হাজারজন আছে। কিন্তু আমার মতো লোক আমার দেশে খুব কম।’ স্যার চলে এলেন দেশে। অথচ বৃটেনে বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী হবার সুযোগ তার ছিলো। 

চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশকে পাল্টে দিয়েছেন। প্রাইভেট সেক্টরে দেশের প্রথম হাসপাতাল তার হাত দিয়েই গড়া। ঘটনাবহুল জীবন ছিলো স্যারের। স্যারের স্মৃতিচারনে তিনি একটা ঘটনার কথা বলেছেন। তখনো তিনি রিটায়ার্ড করেননি। একদিন রাত ২টার সময় দরজা ধাক্কাচ্ছে কে যেন একজন। চিৎকার করছে, বাচ্চা অসুস্থ, দেখতে হবে। এম আর খান স্যার গেট খুলে দেখেন চিত্রনায়িকা শাবানা ছেলেকে নিয়ে বাইরে বসে আছেন। তিনি শাবানার ছেলেকে দেখলেন। শ্বাসকষ্টসহ আরো সমস্যা ছিলো। বললেন, ‘আমি তো ওষুধ লিখে দেব। কিন্তু এত রাতে ওষুধ পাবেন কোথায়?’ শাবানা বললেন, ‘এ রকম আপনাকে যেমন ধাক্কা দিয়ে জাগিয়েছি, সে রকম আরেক দোকানে জাগিয়ে নেব।’ এরপর লাজফার্মা থেকে ওষুধ নিয়ে বাড়ি গেলেন। তখন স্যারের মনে হলো, একটা হাসপাতাল দরকার, যেখানে অসময়ে মানুষ সেবা পায়। 

স্যারের মিসেসের সহপাঠী ছিলেন ‘লিলি’ আপাা। কলাবাগানে তাদের বাড়ি ছিলো। কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়ালের ছাত্রী ছিলেন তারা দুজন। লিলি আপা বাথরুমে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। নিয়ে যাওয়া হলো পিজিতে। তখন নিউরোলজি বিভাগ চালু হয়নি। তারা বললো, ঢাকা মেডিক্যালে যাও। সেখান থেকে তারাও পাঠাল পিজিতে। এই করতে করতে পথেই লিলি আপা মারা গেল। লিলি আপার ছেলে সাইফুল ছিলেন স্যারের ছাত্র। তার বাবা একদিন দু:খ করে বললেন, ‘দেখুন খান সাহেব, মানুষ মারা যাবে আফসোস নেই। কিন্তু চিকিৎসা দিতে পারলাম না। মনে অশান্তি রয়ে গেল!’ স্যারের স্মৃতিচারনে লিখেছেন, ‘তখন আমি আমার তিন কমরেডকে নিয়ে বসলাম। ডা. কাশেমকে ডাকলাম, ডা. রফিককে ডাকলাম, ডা. সিদ্দিককে ডাকলাম। রফিক আমার সঙ্গে রোগী দেখত এখানেই। পাশেই বিল্ডিং ছিল। বললাম,  চল, আমরা হাসপাতাল বানাই। এরপর তৈরি হলো নিবেদিতা।’

১৯৯১-৯২ সালের ঘটনা। আমার এক বন্ধু ছিলো তার নাম হারুন। তিনি এখন বেঁচে নেই। মারা গেছেন। হারুন একদিন আমাকে বললো, ‘২১ কাঠার মতো একটা জমি বিক্রি হবে ধানমন্ডিতে। তোমরা যদি কেনো তাহলে জায়গাটা তোমাকে দেখাবো।’ এসে দেখি দোতলা একটা বাড়ী। মালিক দুই মায়ের ১৫ সন্তান। এরপর ভুমি অফিসে গিয়ে দেখি নিষ্কন্টক। এরপর জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের কাছে গিয়ে বললাম, ‘মামা, একটা হাসপাতাল করবো।’ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কীসের হাসপাতাল?’ আমি বললাম, ‘একটা স্পেশালাইজড্ হাসপাতাল করবো। আপনি আমার সঙ্গে থাকেন।’ কিন্তু উনি থাকতে চাইলেন না। কারণ ততদিনে চট্টগ্রামে ইউএসটিসি নিয়ে উনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।  

এরপর জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারের নিকট আমার প্রস্তাবটি পেশ করলাম। তিনি সানন্দে রাজী হয়ে গেলেন। সঙ্গে থাকলেন অধ্যাপক মতিউর রহমান। আমার দুই বন্ধু রফিক ও সিদ্দীককেও সঙ্গে নিলাম। আমরা শিল্প ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ৬ তলা বিল্ডিং করে ফেললাম। এরপর টাকা শেষ। এম আর খান স্যার বললেন, ‘আর লোন নিও না, পরিচালক নাও।’ 

১৯৯৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলো। ১৯৯৯ সালে সকল সুযোগ সুবিধা সহ চালু হলো দেশের প্রথম বেসরকারী সিস্টেমিক হাসপাতাল ‘সেন্ট্রাল হাসপাতাল’। এখন ৩০০ বেডের এই হাসপাতালে ২২ জন পরিচালক। শুধু কার্ডিয়াক সাইট ছাড়া আর সব চিকিৎসা দেয়া হয় এখানে। এই হাসপাতালটিতে স্যারের অবদান অপরিসীম। 

এম আর খানের মতো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। উনি যে ধরনের মানসিকতা নিয়ে রোগীর পাশে দাড়াতেন এমন মানুষ জগতে বিরল। এই মানুষটাকে কোনদিন রাগ করতে দেখিনি। তিনি ছিলেন অনেক বেশি ধৈর্য্য ও সহনশীল। সামর্থ না থাকলে অনেকে রোগীর চিকিৎসা বিনামূল্যেই করে দিতেন। আমাকে বলতেন, ‘কাশেম। গরীবদের জন্য দাও, তাদের জন্য কিছু করো। এতো টাকা দিয়ে কী করবো আমরা?’ বলা যায়, স্যারের মানসিকতার জন্য আমরাও কিছুটা উদার হবার চেষ্টা করি। এখন সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা পারিবারিক পরিবেশেই সেবা পাচ্ছে। সেই পরিবেশটা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। যে কোন লোক মেডিক্যাল হেল্প চাইলে আমরা যতটুক পারি সহায়তা করার চেষ্টা করি। আমরা চাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবতার সেবা করে যেতে। এই দিক্ষাটা স্যারের কাছ থেকেই পেয়েছি।

এম আর খান একাত্তর সালে জীবন বাজি রেখে এদেশের মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যার সেই কালো রাতে তার বাড়ীতেও হানা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে গিয়েছিলেন হয়তো দেশকে তিনি কিছু দিয়ে যাবেন বলেই। আগামী ১শ বছরেও এদেশে একজন এম আর খান তৈরি হবে কিনা সন্দেহ আছে। শিশুদের জন্য আলাদা শিশু চিকিৎসক দরকার, তাদের টিকা দেয়া দরকার এই ভাবনাটা তার মাথাতেই এসেছিলো। আজ দেশের সব হাসপাতালে শিশু বিভাগ হয়েছে, শিশুদের জন্য দেশে হাজার হাজার চিকিৎসক তৈরি হয়েছে।

এম আর খান স্যারকে কখনো রাগ করতে দেখিনি, সদা হাস্যোজ্জল থাকতেন। শিশুবন্ধু হিসেবে সুপরিচিত এই মানুষটি ছিলেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধার একজন ব্যক্তি। 

রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে পর্যন্ত তার রোগী। শিশু দরদী এই মানুষটির বলতেন, ‘চিকিৎসা একটা মহৎ পেশা। এই মহৎ পেশায় যাঁরা আসেন, সৃষ্টিকর্তা তাঁদের এই পেশায় আসার সুযোগ দিয়েছেন বলেই আসতে পারেন। এখানে সবাই ভক্তি করে, দোয়া করে, আবার পয়সাও দেয়। এ রকম পেশা কয়টা আছে? আবার উল্টোটাও হয়। গোলমালে পড়লে পিট্টিও খেতে হয়।’

তাঁর কথা, সব সময় মানুষের বন্ধু হিসেবে কাজ করতে হবে। আমরা চিকিৎসকরা যদি ভাবি, রোগীটি আমার আত্মীয়, তবেই অনেক কিছুর সমাধান হয়ে যাবে। তাছাড়া এই পেশার মান বজায় রাখা অনেক জরুরি।’

জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান স্যার শুধু একজন চিকিৎসকই নন, নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। আমাদের সবার অভিভাবক ছিলেন তিনি। উনার সঙ্গে তুলনা করার মতো মানুষ দেখি না। 
স্যারের চলে যাওয়া মানে একজন অসাধারণ মানুষের প্রস্থান। চিকিৎসা জগতে এক বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি, বড়ো ধরনের শুণ্যতা। আজ এম আর খান স্যারের অভাব সব সময় অনূভব করি। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসীব করুন। 

লেখক : পরিচালক, সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স