ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১৩ ঘন্টা আগে
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

শিক্ষার্থী, বিএসএমএমইউ


০১ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৫২

পেট স্ক্যান কিভাবে ক্যান্সার ট্র্যাক করে?

পেট স্ক্যান কিভাবে ক্যান্সার ট্র্যাক করে?

অনেকদিন পূর্বে একটি মুভি দেখেছিলাম। নায়ক সেই লেভেলের ব্রিলিয়ান্ট। এক জীবনে হেন কোন পেশা নাই যা সে করেনি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল'ইয়ার এমনকি পাইলট। বুঝতেই পারছেন, এই ব্রিলিয়ান্সি হচ্ছে স্রেফ বাটপারি ও প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল কোন পুলিশ, গোয়েন্দা তার পিছনে লেগে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। পারবে কিভাবে? মুহুর্তেই যে নাম, পেশা চেইঞ্জ করে পুরোদস্তুর ভিন্ন লোক হয়ে যেতে পারে তাকে ধরা কার সাধ্য! সেই নায়ক অবশেষে যে পেশাকে বেছে নেয় সেটি হল নকল টাকা সাপ্লাই দেয়া। নকল টাকা ট্র্যাক করবার ডিভাইস আছে, যেটা দিয়ে স্ক্যান করলে নকল টাকা ধরা পড়ে। কিন্তু সেই নায়কের তৈরি নকল টাকা কোনভাবেই কোন ডিভাইস দিয়ে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়না।

তার এই নকল টাকার জন্য পুলিশ, গোয়েন্দা সব বিভাগে সাড়া পড়ে যায়। রীতিমত গবেষণা শুরু হয়ে গেল। কীভাবে এই নকল টাকা বানানো হয়?  আসল টাকার সাথে ওর এই নকল টাকার এত সূক্ষাতিসূক্ষ মিল যে সেটা কোন ডিভাইস ট্র্যাক করতে পারছেনা। আর পর্দার আড়াল থেকে তো নায়ক নকল টাকা সাপ্লাই দিয়েই যাচ্ছে। শপিং মল, ব্যাংক একাউন্ট সব জায়গায় নকল টাকা। অবশেষে যখন গবেষণা থেকে নিজেরা কোন অনুসিদ্ধান্তে আসতে পারলনা এবং নায়কের বিরুদ্ধেও কোন প্রমাণ যোগাড় করতে পারলনা তখন গোয়েন্দা বিভাগের প্রধাণ নায়ককে একটি চমকপ্রদ অফার দিলেন। কি সেই অফার? শেষমেষ নায়ককে  দূর্নীতি দমন বিভাগের বিশেষ দায়িত্ব অর্পন করা হল।

এখানে একটা মজার ব্যাপার হল, নায়ক দোষী হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু তার দূর্নীতির বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ যোগাড় করা যাচ্ছেনা তাই তাকেই দূর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হল। যে উচ্চ লেভেলের দূর্নীতি নায়ক সারাজীবন করে এসেছে, কিন্তু কোনটাতেই সে ধরা খায়নি। সেই নায়ক যদি হয় দূর্নীতি দমন বিভাগের প্রধাণ তাহলে অবস্থাটা কেমন হবে?

নায়ক এখন মন-প্রাণ উজাড় করে দূর্নীতি ট্রাক করে যাচ্ছে। ইনফ্যাক্ট সমাজে যে লেভেলের দূর্নীতি হয় তা তার কাছে স্রেফ দুধ-ভাত। যেহেতু অনেক হাই প্রোফাইল দূর্নীতিবাজ পদবী সে নিজেই একসময় বিলং করত।

পেট স্ক্যান নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে আমার স্রেফ এই মুভিটার কথায় মনে হয়েছে। রেডিয়েশান খুব ক্ষতিকারক আমাদের শরীরের জন্য। ক্যান্সারের অন্যতম একটি কারণ হল রেডিয়েশান। তাহলে পেট স্ক্যান সেই রেডিয়েশান দিয়ে কিভাবে ক্যান্সার ট্রাক করে?

পেট স্ক্যান হল মুভির ওই দূর্দান্ত, প্রতিভাবান নায়কের মত। রেডিয়েশান তো আরো অন্যান্য অনেক কিছুতেই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সবাই তো আর ক্যান্সার ট্রাক করতে পারছেনা। পেট স্ক্যান এই রেডিয়েশানের সাথে গ্লুকোজ মেটাবলিজমের একটা যোগসূত্র দাড় করিয়ে শরীরে আনাচে কানাচে লুকায়িত থাকা ক্যান্সার কোষকে ট্রাক করে ফেলছে। পেট মেশিন হল সেই দূর্দান্ত নায়ক যা 18F FDG এর মাধ্যমে সব ক্যান্সারকে খুব সহজেই সনাক্ত করতে পারে।

পেট মানে হল পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফী। খুব কাঠ খোট্টা একটা মেশিন। আর FDG হল গ্লুকোজের সৎ ভাই। যেখানে গ্লুকোজ মেটাবলিজম বেশি হয় সেখানে FDG মেটাবলিজমও বেশি হয়। তবে হাবভাব একই রকম হলেও পুরোপুরি গ্লুকোজের মত না। ক্যান্সার কোষে গ্লুকোজ মেটাবলিজম অন্যান্য সাধারণ কোষের তুলনায় অত্যধিক বেশি পরিমানে হয়। পেট মেশিন মূলত এই গ্লুকোজ মেটাবলিজমকে ট্রেস করে। শরীরে 18F FDG ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে দেয়া হলে পেট মেশিন FDG কে অনুসরণ করতে থাকে। যেহেতু FDG গ্লুকোজের সৎ ভাই তাই যেখানে গ্লুকোজ বেশি মেটাবলিজম হয় সেখানে FDG  ও বেশি বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু গ্লুকোজের মত FDG মেটাবলিজমের সব পথে চলাফেরা করতে পারেনা। একটি বিশেষ জায়গায় আটকা পড়ে যায়। ক্যান্সার কোষের যে বিশেষ জায়গায় FDG আটকা পড়ে যায় সেই জায়গাকেই মূলত পেট মেশিন ট্রেস করে ফেলে।

এই যে এত দুর্দান্ত কাজ পেট মেশিন করে ফেলছে, সে কিন্তু একা আসলে এই কাজ করতে পারতনা যদিনা তার কাজিন সিটি মেশিন তার সাথে না থাকত।  সিটি মেশিন যদি পেট মেশিনের সাথে না থাকে তাহলে কি হবে?

পেট মেশিন মেটাবলিক কার্যাবলীকে ট্রেস করে। মলিকুলার ইমেজিং কে সম্ভব করেছে এই পেট স্ক্যান। কিন্তু এনাটমিকাল বা শরীরের কোথায় মেটাবলিজম হচ্ছে এই তথ্য পেট মেশিন খুব পরিস্কারভাবে দিতে পারেনা।

ধরেন কারো পিত্তথলিতে ক্যান্সার। যদি শুধু পেট মেশিনে স্ক্যান করা হয় তাহলে দেখা যাবে সেখানে FDG আপটেক বেশি হচ্ছে। কিন্তু জায়গাটা এত অস্বচ্ছ যে খুব কনফিউজিং লাগবে জায়গাটা কি পিত্তথলি নাকি লিভারের কোন অংশ! এই কনফিউশানকে দূর করতে পেট মেশিনের সাথে সিটি মেশিন ফিউজড করে দেয়া হয়। অতপর এই পেট-সিটি ফিউশান ইমেজিং স্ক্যান কোন কনফিউশান ছাড়ায় বলে দিতে পারে শরীরের এক্সাক্টলি কোথায় FDG বেশি বেশি আপটেক হচ্ছে।

সিটি মেশিন মূলত এনাটমি ট্রেস করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এখন অনেকেই ভাবতে পারেন, সিটি মেশিনের সাহায্যই যদি লাগবে তাইলে আর এত্ত টাকা খরচ করে পেট স্ক্যান করার দরকার কি? এটার জবাব নিম্নে দিচ্ছি:

১. পুরা শরীর বা হোল বডি সিটি স্ক্যান করা বাস্তবসম্মত  না, কিন্তু হোল বডি পেট-সিটি স্ক্যান রুটিনলি করা হয়।

২. সিটি স্ক্যান মূলত এনাটমিকাল লোকেশান দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়। যতক্ষন পর্যন্ত এনাটমিকাল কোন পরিবর্তন না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সিটি স্ক্যানে সব কিছু স্বাভাবিক দেখাবে। ক্যান্সার কোষ শরীরের মধ্যে থাকলেও শরীরের এনাটমি ঠিক থাকলে সিটি স্ক্যানে কিছুই ধরা পড়বেনা। অন্যদিকে পেট স্ক্যান মেটাবলিক ইমেজিং করতেছে। এনাটমি ঠিক থাকলেও অস্বাভাবিক মেটাবলিজমকে সে ট্রেস করে ফেলতেছে। তাই ক্যান্সার কোষ শরীরে অন্য কোথাও ছড়িয়ে যাবার পূর্বে কিংবা ক্যান্সার কোষ শরীরের গঠন বা এনাটমি পরিবর্তন করার পূর্বেই পেট স্ক্যান বলে দিতে পারছে কোথায় কোথায় ক্যান্সার কোষের জীবাণু রয়েছে।

৩. শুধু মাত্র সিটি স্ক্যান করলে শরীরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় করতে হবে। আর এতে যে রেডিয়েশান ডোজ দেয়া হয় সেটা পেট-সিটি স্ক্যানের ডোজ থেকে অনেক বেশি। তাই অতিরিক্ত রেডিয়েশান  থেকে অল্প রেডিয়েশান অধিকতর উপযোগী।

৪. মলিকুলার ইমেজিং পেট স্ক্যান ছাড়া কোনভাবেই সিটি স্ক্যান কিংবা এম.আর.আই দিয়েও সম্ভব না।

ব্রেস্ট, ব্রেইন, ফুসফুস, লিভার, পিত্তথলি, লিম্ফোমা ইত্যাদি ক্যান্সারে পেট স্ক্যান আজ একটি অনন্য নাম। শুধু ক্যান্সার নির্ণয়েই পেট স্ক্যানের ভূমিকা শেষ নয়। চিকিৎসা দেয়ার পর ক্যান্সারের রেসপন্স কেমন, ক্যান্সার স্টেজিং, রি-স্টেজিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে পেট স্ক্যানের সরব উপস্থিতি আজ সর্বজনবিদিত।

আচ্ছা শুধু ক্যান্সার বিষয়েই কি পেট স্ক্যান দক্ষ? নাকি আরো কিছু আছে? সেটা নিয়ে অন্য আরেকদিন আলোচনা চলবে।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত