আয়েশা আলম প্রান্তী

আয়েশা আলম প্রান্তী

শিক্ষার্থী, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ


৩১ অক্টোবর, ২০১৭ ০৮:৫৯ এএম

কিউরিসের মানবিক পথচলা

কিউরিসের মানবিক পথচলা

“অ তে অন্তর আ তে আলো, অন্তরে অন্তরে আলো দ্বীপ জ্বালো”- এভাবেই আলোর বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে কিউরিস নামের একটি সংগঠন। কিউরেটিভ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেটিভ ইনিশিয়েটিভ ফর সোসাইটি সংক্ষেপে কিউরিস। অসহায়, দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এবং পথশিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া এ সংগঠনের অন্যতম প্রধান কাজ।

“আমি যখন সাকিবকে দেখি তাখন ওর পায়ে ব্যান্ডেজ। ঠিকমতো হাঁটতে পারেনা। ওকে নিয়ে ডাক্তারের রুমে ঢুকলাম। সাথে ছিল কিউরিসের অন্য দুই ভলান্টিয়ার ডাঃ পরশ ও বন্ধু ফাইয়াজ। সাকিবকে দেখার পরে ডাক্তার বললো পায়ের অবস্থা খারাপ। পায়ের ক্ষততে পচন ধরেছে, অপারেশন না করলে পা কেঁটে ফেলতে হবে” এভাবেই সাকিবকে নিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিল কিউরিসের অন্যতম সদস্য অপু সাহা।

সাকিবকে কিউরিস মিরপুরের ডেলটা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। ১৮ দিন চিকিৎসা চলার পর সাকিবের অপারেশন ও স্কিন গ্রাফটিং হয়। অপারেশনের পর সাকিবকে রাখা হয় আরেক ভলান্টিয়ার স্বর্ণার বাসায়। সেখানে এক মাস থাকার পর সাকিব পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে শাহবাগ ফিরে যায়। অপারেশন ও চিকিৎসার সকল ব্যয় কিউরিস বহন করে। এখনও শাহবাগে গেলে সাকিবের দেখা পাওয়া যায়। গান শোনাতে বললে ‘বকুল ফুল বকুল ফুল' গানটি গেয়ে উঠবে মনের আনন্দে। সাকিবের মুখে এখন হাসি ফোটে, দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে শাহবাগ।

 

“শান্তি শুরু হয় হাসির মধ্য দিয়ে” বলেছেন মাদার তেরেসা। মানুষের মুখে হাসি ফোটানের উদ্দেশ্যে কিউরিস কাজ করছে বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে। তার মধ্যে অন্যতম হলো “এক টাকার ডাক্তার” প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে কিউরিস এদেশের চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা। ভলান্টিয়ার রিফাত জানালেন কিউরিস এ পর্যন্ত ৪৫টির অধিক হেলথ ক্যাম্প করেছে। সদরঘাট, কমলাপুর, শাহবাগ, আগারগাঁও, সাভার ও তেগগাঁও বস্তিতে প্রতিমাসে একবার করে পথশিশুদের চেকআপ ও চিকিৎসা দেয় কিউরিস। এছাড়াও বরিশালের মূলাদি, সিলেট, কুষ্টিয়াসহ ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায়ই হেলথ ক্যাম্প করেছে কিউরিস। মেয়েদের মাসিককালিন স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে কিউরিসের সচেতনতামূলক কর্মসূচী “বয়ঃসন্ধির সন্ধিবিচ্ছেদ”।

কিউরিসের চেয়ারম্যান শ্রাবণী আহমেদ জুঁই বলেন, “সিলেটের হরিপুর সরকারি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শুরু হয়ে কর্মসূচীটি এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলছে”। এ কর্মসূচীর সকল দায়িত্ব কিউরিসের মেয়ে ভলান্টিয়ারদের। “মেয়েদের মাসিক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি এদেশের মেয়েরা মাসিক নিয়ে কি পরিমাণ কুসংস্কারে ভোগে। তারা এ বিষয়ে না পাচ্ছে সঠিক কোন শিক্ষা, না পাচ্ছে সঠিক কোন গাইড লাইন” এ কর্মসূচীর সাথে যুক্ত সামান্তা সাবেদ বলছিল কথাগুলো। সোনিয়া, ফাতেমা, তামান্না, শুভ্র, রুশো মৌ, রিনি, রিশা, ফ্লাভি, হাসিব, অর্ণা, তুষার, ফাহিম, মনিরা সহ কিউরিসের সকল ভলান্টিয়ারদের একটাই কথা, “পথশিশু ও অসহায় মানুষের সাথে কাজ করতে তাদের অনেক শান্তি লাগে”।

এদিকে কিউরিসের ফিন্যান্স ডিরেক্টর জেনি ইসলাম বলেন, “সদস্যদের দেয়া টাকা এবং মানুষের সাহায্যে চলছে এই সংগঠন। কোন স্পন্সর না থাকায় মাঝে মাঝে বিভিন্ন কাজে বিপাকে পরতে হয়” শিশুদের দাঁতের যত্ন ও সুরক্ষা নিয়েও কাজ করছে কিউরিস। কিউরিসের এ দিকটি দেখছে দেশ টিভির উপস্থাপিকা ডেন্টিষ্ট সিফাত রহমান ও ডেন্টিষ্ট চারু। কিউরিসের ভলান্টিয়ার হিসাবে এখানে আছে ডেন্টালের তৃণা, বুশরা, নিয়াজ, লিজা, বিলকিস, রেদোয়ান, মিথিলা, মুনসহ আরো অনেকে। ১৪ জন কার্যকরী সদস্যসহ মাত্র দেড় বছরে কিউরিসের ভলান্টিয়ার সংখ্যা এখন ৭০। যারা বিভিন্ন মেডিকেলে অধ্যয়নরত রয়েছে।

 

“সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদে ২০১৫ সালের জুন মাসে এই সংগঠনটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করি। এরপর একই বছরের ২৬শে ডিসেম্বর আগারগাঁও বস্তিতে হেলথ ক্যাম্পের মধ্য দিয়ে কিউরিসের যাত্রা শুরু হয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাও মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। অথচ দেখা যায় যে অসহায় মানুষদের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করার মানুষ খুব কম” বলছিলেন কিউরিসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডাঃ তানভীর ইসলাম। হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে লন্ডনে যান মাস্টার্স করতে। ফার্মাকোলজীতে মাস্টার্স করে ফিরে আসেন দেশে। তিনি এখন মিরপুরের ডেলটা মেডিকেল কলেজে ফার্মাকোলজীর লেকচারার হিসাবে কর্মরত আছেন। কিছুদিন আগে কিউরিসের হয়ে “স্পার্ক বাংলাদেশের” এক্সিলারেটর প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। কিউরিসের জন্য “Spark Bangladesh Entrepreneuer Of the Year” অ্যাওয়ার্ড নিয়ে তবেই বাড়ি ফেরেন। এছাড়া আরো একটি ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পায় কিউরিস।

মা, ভাই, স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র রিয়ানকে নিয়ে ছোট্ট সংসার তার। অবসর পেলেই ছেলে রিয়ানের সাথে খুঁনসুটিতে মেতে ওঠেন। নিঃস্বার্থ পরোপকারি এই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন একদিন কিউরিসের নামে হাসপাতাল হবে। যে হাসপাতালে এদেশের সকল অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাবে। তার সাথে যখন কথা হচ্ছিল তখন তিনি মহাব্যস্ত। সিলেটের সুনামগঞ্জের বন্যা কবলিত হাওর এলাকার অসহায় মানুষদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাবেন। চলছে তার প্রস্তুতি।

এদেশের একটি মানুষও যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায় সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে কিউরিসের এ প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বললেন, “আমরা মানুষের কাছে মানবতার আলো পৌঁছে দেয়ার কাজ করছি। এদেশের মানুষকে একটা কথাই বলতে চাই, সময় পেলেই মানুষকে সাহায্য করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেখবেন মানবতায় কি শান্তি। সো লেট দেয়ার বি লাইট”। এদেশের প্রতিটি মানুষ যদি তার নিজ নিজ জায়গা থেকে অপর একটি অসহায় মানুষকে সাহায্য করে তাহলে এদেশ একদিন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে। কিউরিসের জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত