সোমবার ২০, নভেম্বর ২০১৭ - ৬, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৪ - হিজরী

রোড টু পিএইচডি-৩০: আমেরিকার জীবন

আমেরিকায় প্রথমে নেমে এয়ারপোর্টে বাথরুমে যাবেন - প্রয়োজনীয় কাজ সারবেন – তারপর ডান হাত বাড়াবেন সামনে – যেখানে পানির পাইপটি রাখা থাকে। আপনাকে অবাক করে দিয়ে এককাহ্না শুকনো খড়খড়ে টিস্যুর রোল আপনাকে স্বাগতম জানাবে। আপনি মহা বিরক্ত হবেন।

যদি ছোট কাজ সেরে থাকেন, তবে মোটামুটি কাজ চালাতে পারবেন। যদি ভাগ্যক্রমে বড় কাজ সেরে থাকেন – তবে নিজেকে গালি দেবেন না আমেরিকা জাতিকে গালি দেবেন – সে সিদ্ধান্ত নিন। যাই সিদ্ধান্ত নিন – লাভ নেই – ঐ টিস্যুই সম্বল। কাজ সেরে মহা বিব্রত হয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসুন। আমেরিকার মুক্ত বাতাসে বুকভরে অস্বস্তি মিশ্রিত শ্বাস নিন। ওয়েলকাম টু দ্যা ল্যান্ড অব অপরচুনিটিজ।

আমেরিকার সবকিছু আপনার ভালো লাগবে – এই টয়লেটের ঝামেলাটা বাদ দিলে। সাথে এখন ওয়েট টিস্যু বা ওয়াইপস রাখি সবসময়। অফিসে আলাদা প্যাকেট এবং রিফিল কিনে রেখেছি। ব্যাগে সবসময় বক্সে ভরে ওয়েট টিস্যু রাখি। বাসায় বহুমূল্য বদনা ব্যবহার করি।

পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি – অথচ এরা টয়লেট করে পানি ব্যবহার করে না। ইয়াক ইয়াক ওয়াক ওয়াক থু! কে-ম-নে সম্ভব!! ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলি - লার্ন ফ্রম আস ইউ বার্বারিয়ান্স – ইউজ ওয়াটার আফটার টয়লেট – তোদের মর্টালিটি রেট আরও কইমা কই যাইবো হিসাব করতে পারবিনা। ইউ ডার্টি ফ্রিক পিপল!!!
আমাদের জন্য আমেরিকার দ্বিতীয় যে সমস্যা তা হলো – এখানে ছেলে মেয়ে সবাই সবার সাথে খুব ফ্রিলি হ্যান্ডশেক করে। আমার মত মানুষদের জন্য এটা খুবই বিব্রতকর। প্রথম যখন একজন নারী হাত বাড়িয়ে দিল – এমন একটা সিচুয়েশান যে আপনি নাও করতে পারবেন না – লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম।

প্রথমবার এমনটা হবার পর এক সিনিওরকে ফোন দিয়ে প্রায় কেঁদেই দেবো এমন অবস্থা – ভাই এরা খালি হাত বাড়ায় দেয়, কি করবো বলেন! সিনিওর সিচুয়েশান বুঝে কুলভাবে কিছু পরামর্শ দিলেন – মাথা ঠান্ডা হয়ে এলো।

কি করে বুঝাই যে, ওহে ললনা - তোমাকে অসম্মান করে তোমার হাত ধরতে চাইনা – বিষয়টা মোটেও তা নয়। আমার ধর্ম তোমাদেরকে অনেক অনেক মূল্যবান করেছে বলেই মূল্যবানের মূল্য নষ্ট করতে আমরা তোমাদের স্পর্শ করিনা। এটা তোমাদের জন্য আমাদের তরফ থেকে সিকিউরিটি – মোটেই অসম্মান গোছের কিছু নয়। যাই হোক – এত লম্বা লেকচার দেবার সময় কই ঐ ৫ সেকন্ডের হ্যান্ডশেকে? তবু চেষ্টা করি এভোয়েড করতে – মানুষ যা ভাবে ভাবুক – আমার পরকাল আমার কাছে।

তৃতীয় যে বিষয়টি খুব পেইন দেয় তা হলো – হালাল মাংসের অসহজলভ্যতা। এমন না যে এখানে হালাল মাংস নেই – বিষয়টি মোটেই তা নয়। হালাল মাংস আছে – সেটি ওয়ালমার্টে পাওয়া যায়না – আলাদা হালাল শপে পাওয়া যায়। আপনাকে একটু কষ্ট করে গিয়ে সেখান থেকে কিনে আনতে হবে।

এখন সমস্যা হলো – ওয়ালমার্টে আপনি সবকিছু একজায়গায় কম দামে পাচ্ছেন। হালাল শপে গিয়ে কেনাটা একটা বাড়তি কাজ, দামটাও একটু বেশী। আর মাংসের আইটেমের যত ভেরিয়েশান ওয়ালমার্টে আছে, তার প্রায় কিছুই বর্নহীন হালাল শপে নেই। তাই এটিও একটি ডিস্কারেজিং ফ্যাক্টর।

কোন বাসায় দাওয়াতে গেছেন – বাংলাদেশীর বাসায় দাওয়াত – আপনি কি হালাল হারাম চিন্তা করার সময় পাবেন? মনেই থাকে না যে এটি এখানে একটি ইস্যু হতে পারে। বারবার ভুল হয়ে যায়।
তবে কি জানেন, ইচ্ছে থাকলে, চেষ্টা থাকলে, কষ্ট হলেও, ভুল হয়ে গেলেও – হালাল খাবার সুযোগ আছে – এবং এ সুযোগটি নেয়া আমাদের জন্য দায়িত্ব। বিষয়টি অবশ্যই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার – চাপিয়ে দেয়ার কিছু নেই। যার যার জবাবদিহি তার দায়িত্ব তাই না?

আমেরিকার জীবনের বাকী সবকিছু অত্যন্ত চমৎকার। আপনার ভালো লাগবে। এখানে সবাই সময়মত কাজ করে। সাধারনত মিথ্যা কথা বলে না। এক ঘন্টায় আপনি দশ-বারোটা কাজ করে ফেলতে পারবেন – দেশে যা ছিল অলীক কল্পনা।

এখানে রাস্তাঘাট সুন্দর, পরিষ্কার। আপনার ইচ্ছে করবে না যে কোকের ক্যানটা রাস্তায় ফেলে দিই। সিস্টেম আছে – কোকের ক্যানটা ওয়ালমার্টে নিয়ে রিসাইকেল করলে আপনি টাকা ফেরত পাবেন। কেন শুধু শুধু রাস্তা ময়লা করতে যাবেন? রাস্তার পাশে ফুলগাছ, ফলগাছে ফল ঝুলছে – কেউ টানাটানি করছেনা – প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখে ভাবালুতায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। 
ট্রাফিকের আইন সবাই মেনে চলে। আমাদের দেশের রাস্তার মোড়ে যে সাদা হাত-পাওয়ালা লাঠিয়াল লোকটি অসহায়ের মত সারাদিন রোদবৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে আর রিক্সাওয়ালাদের সাথে ঝগড়া করে – ঐ লোকটি এখানে নেই। তবু রাস্তাঘাটে দিব্যি গাড়ি চলছে। অদ্ভুত দেশ এটি।

এখানে সব ধরনের বিল আপনি অনলাইনে দিয়ে দিতে পারবেন। ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে সময় নষ্ট করতে হবেনা। যে কোন সমস্যায় ইমেইল করবেন – তারা রেসপন্স করবে। সবকিছুতেই সমস্যা হতে পারে এবং হয়ও। তারপরও ওভারঅল হিসেবে এদেশে সিস্টেম থাকাটাই স্বাভাবিক, আমার দেশে সিস্টেম থাকাটা অস্বাভাবিক। এটাই মৌলিক পার্থক্য।

তবে সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক হলো – প্রবাসী বাংলাদেশীদের অসাধারন ব্যবহার। অতিথিপরায়ন জাতি হিসেবে আমাদের যে পরিচয় – সে ঐতিহ্য প্রবাসীরা ধরে রেখেছেন খুব ভালোভাবেই। নতুন কোন বাংলাদেশী এলে সবাই মিলে তাকে হেল্প করতে নেমে পড়েন। এখানে এঁরাই তো আপনার নতুন পরিবার তাইনা? পরিবারের সদস্যের মতই সবাই আপনাকে আপন করে নেবে – সখে দুখে পাশে এসে দাঁড়াবে।

এই প্রবাসী পরিবারের জন্যই দেশ ছেড়ে আসার তীব্র কষ্টগুলো কিছুটা হলেও উপশম হয়। বুকভরা বেদনা নিয়েও সবাই হাসিমুখে হাতে হাত রেখে পাশে এসে দাঁড়ায় – চোখের অশ্রু কষ্টের না আনন্দের – ভাব্বার সময় কই? চিরকালের জন্য - বাংলাদেশি আমরা ।

ডিপার্টমেন্টে আপনাকে সারাদিন খাটাখাটুনি করতে হবে - কিন্তু একটিবারের জন্যও আপনার খারাপ লাগবে না - কারন লেজুড়বৃত্তি টাইপের তৈলমর্দনের অসুস্থ প্রতিযোগীতা নেই। আপনার ভালো লাগবে।

এই ভালো লাগা প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব থাকবে। নতুন বিবাহ করলে ডেইলি আলাদিনের জাদুর পাটিতে কইরা উড়তেছেন টাইপের যে ফিলিংসটা – অনেকটা ঐ রকম হবে। আস্তে আস্তে কোপ বাড়বে। বাড়তে বাড়তে আপনাকে মোটামুটি ভেঙেচুড়ে ফেলবে। তারপর আপনারে নতুন করে গড়বে এরা। এরা হাশিমুখে খুব ভালো ভালো কথা কয়। কামের বেলায় সব টাইট একসাথে দেয়। খুব খ্রাপ জাতি। 
দিন যত যাবে, পরিস্থিতি তত জটিল হয়ে উঠবে। হানিমুন শেষে যা হয় আরকি। মানে ডিপার্টমেন্ট আপনারে এমন টাইট দিবে যে নিজের নামও ভুলে যাবেন।

নিজের নাম যেদিন ভুলে যাবেন – সেদিনের সে মুহূর্তটিকে খুব ভালোভাবে অনুভব করবেন। উত্তেজিত হবেন না। বড় করে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ুন। আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ান। তারপর পাশের টেবিলে বসে থাকা চাইনিজ হাবলুটারে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন – ‘হেই চিংকু, আমার নাম কি বলতো?’ সে আপনাকে আপনার নাম বলে দিবে।

বোঝার ভান করে খুব শান্তভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে চেয়ারে ফিরে গিয়ে পড়তে থাকুন। ইউর লাইফ হ্যাজ কাম এ ফুল সার্কেল। আপনার পার্মানেন্ট হেড ড্যামেজ হয়েছে। পিএইচডি হয়েছে আপনার। ব্রাভো মাই বয়, ব্রাভো।

এই সাথে আমাদের ৩০ পর্বের মেগাসিরিজ এরও সমাপ্তি। অনেক পাকনামী করসি। এহেন অসংখ্য অজস্র ভুলের।

ডিসক্লেইমার

পূর্ববর্তী পর্ব: রোড টু পিএইচডি-২৯: প্লেনের টিকেট কাটা এবং ইমিগ্রেশন

সমাপ্ত

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ

নন–ক্যাডারে ১৮০০ পদ শূন্য

নন–ক্যাডারে ১৮০০ পদ শূন্য

০৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:৪৯




রোড টু পিএইচডি-২৭: ভিসা কাহিনী

রোড টু পিএইচডি-২৭: ভিসা কাহিনী

২৭ অক্টোবর, ২০১৭ ১৮:৩২











High blood pressure redefined for first time in 14 years: 130 is the new high

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৪৬


New global commitment to end tuberculosis

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৩১


























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর