ডা. মিথিলা ফেরদৌস

ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


২৮ অক্টোবর, ২০১৭ ১০:৪৩ পিএম

ডাক্তারদের গালি দেয়ার আগে আসল ঘটনাটি জানুন

ডাক্তারদের গালি দেয়ার আগে আসল ঘটনাটি জানুন

আমাকে দাদী, নানী বাদে রুগী, রুগীর লোকেরা মোটামুটি সব সম্বোধন করেছে। মা ডাক টা বেশি মধুর লাগে। কেউ এমন ডাকলে বিগলিত হই। আমার প্রিয় রুগী হচ্ছে যারা হতদরিদ্র, যারা তথাকথিত শিক্ষিত না তারা। এরা খুব সরল হয়। এরা যাই ডাকুক তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনা। আসলে এত রুগী দেখতে হয় কে কি ডাকল সেইটা নিয়া চিন্তা করারও সময় পাইনা।

সেদিন শুধু এক অতি স্মার্ট মেয়েকে খুব ঠান্ডা মাথায় বলতে বাধ্য হইছি। সে আমাকে আন্টি আন্টি করতেছিল, বললাম-

: কি পড়েন?

: এবার মাস্টার্স দিবো।

: আমার ছেলে ক্লাশ ওয়ানে পড়ে, আপনার বয়স কি তার সমান হবে?

মেয়েটা একটু বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। বুঝি কিছু মানুষের টেন্ডেন্সি অন্যকে ছোট করে মজা পাওয়া। বিশেষ করে সেইজন ডাক্তার হইলে তো কথাই নাই। কইলাম,

: এতে যদি আপনার বয়স কম হয়ে যায়, তাতে যদি আপনার ভাল লাগে, তাহলে অবশ্যই আন্টি ডাকবেন। তবে আন্টি ডাক টা আমার কাছে একটু ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে, আপনি বেটার খালা ডাকুন। তারপর চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিলাম।

এইসব তথাকথিত শিক্ষিত মেয়েরা ডাক্তারদের ছোট করে ভিতরে ভিতরে না পাওয়ার বেদনাকে প্রশমিত করে।

প্রতিদিন কয়েকজন রুগী মারমুখি থাকে, একজন সেদিন বলে আমি ডিফেন্সের লোক। আমি তাকে একটাই ঔষধ দিয়েছি। সেইটা তাকে হাসপাতাল থেকেই দিতে হবে। আমি হাসপাতালে সাপ্লাই ঔষধ এর লিস্ট বের করে দেখালাম। বললাম- 

: না থাকলে কই থেকে দিবো বলেন?

সে বলে-

: আমি এই দেশের নাগরিক।

: বাকিরা কী ইন্ডিয়া, পাকিস্তান থেকে আসছে?

আমার সামনে হাসপাতালের টিকিট ছিঁড়ে বলল-

: আমি আপনাকে দেখে নিবো।

এদের মধ্যেই কেউ কেউ ডাক্তার নিয়ে উলটা পালটা গল্প বানায়, যা বিভিন্ন পত্রিকা অত্যন্ত আনন্দের সাথেই গ্রহন করে। তারা আসল ঘটনা জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই আরও তার সাথে রঙ লাগিয়ে লিখে ফেলে, সেটা আবার ডাক্তার বিদ্বেষীরা সহজ পাচ্য হিসেবে গ্রহণ করে ফেসবুকে বিশাল স্ট্যাটাস দিয়া গায়ের জ্বালা জুড়ায়। এমনিতে এইসব স্ট্যাটাস দানকারীরা সাংবাদিকদের সহ্য করতে না পারলেও, ডাক্তারদের বিপক্ষের কথা আনন্দের সাথেই গ্রহন করে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া, আপা ডাক নিয়ে আসলেই কি ঘটেছিল আমি জানিনা, তবে আপা ডাককে কেন্দ্র করে কোন ডাক্তার এমন ঘটনা ঘটাতে পারে আমার বিশ্বাস হয়না।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র একজনের কমেন্ট দেখলাম, 'এই কুত্তার বাচ্চারা (ডাক্তার) সুযোগ পাইলেই পেট কাটে'। উনি কিসের বাচ্চা আমি জানিনা। তবে কোন ভদ্রলোকের বাচ্চা এই ভাষায় কথা বলার কথা না। আর ডাক্তাররা পেট কাটা বন্ধ করলে আপনাদের কি অবস্থা হবে, কেউ ভেবে দেখেছেন?

‘ইন্টেস্টিনাল অবস্টাক্সান’ (নাড়ি কোন কারনে বন্ধ হয়ে গেলে) একটা ব্যাপার আছে, যাতে বলা আছে সুর্য উদয় থেকে সুর্যাস্তের মধ্যে যদি পেট কাটা না হয়, রুগীকে বাঁচানো সম্ভব না। অবসট্রাক্টেড লেবার মানে বাচ্চা আটকায় গেলে, যদি সিজার না করা হয়, বাচ্চা বাঁচানো সম্ভব না। এমন অসংখ্য কারনে ডাক্তাররা রুগির স্বার্থেই পেট কাটতে বাধ্য হয়।

সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সব সার্জনরা মিলে ঠিক করেছিল আর অপারেসান করবেনা। খুব ভাল ডিসিশন ছিল।

কয়েকজনের স্ট্যাটাসে দেখলাম, ডাক্তারদের ছোটলোকের বাচ্চা বলে গালাগালি করছে, সেইসব বড়লোকের বাচ্চাদের বলতে চাই, অন্যকে গালি দেয়ার আগে আসল ঘটনা জেনে নিন। এমনিতেই তো আপনারা পত্রিকাওয়ালা দের বিশ্বাস করেন না। এই ঘটনা পত্রিকায় পড়ে হঠাৎ তাদের যুধিষ্ঠির ভাবার কারণ কি?

সবচেয়ে ভাল হয় এইসব কুত্তার বাচ্চা, ছোটলোকের বাচ্চাদের চিকিৎসা না নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের এঞ্জেলদের চিকিৎসা নিন, আপনাদের যুধিষ্ঠির পত্রিকাওয়ালারাও, সেটাই চাচ্ছে। তাতে ডাক্তারদের কোনই ক্ষতি হবেনা।আমরা আমাদের নিরীহ রুগীদের সেবা দিয়েই শান্তিতে থাকতে পারবো।

মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত