ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


জমজ শিশুর একটি ভিতরে রেখেই সেলাই : কী ছিল আসল ঘটনা?

দুদিন যাবৎ টিভি খুল্লেই একটা নিউজ বেশ বড় করে দেখতে পাচ্ছি, 'জমজ শিশুর একটি ভিতরে রেখেই সেলাই করে অপারেশন শেষ করেন ডাক্তার।' সাথে পুরো টিভির স্ক্রিন জুড়ে সেই অভিযুক্ত ডাক্তারের ছবি। রেড মার্কার দিয়ে গোল করা।

গায়ে কাঁটা দেয়া নিউজ। খোদা, একি কলি কাল! আমরা সাধারন জনগন কই যাবো! এদিকে মিডিয়ায় চাউর এমআরপি নাকি তরতর করে বাড়ছে! বাজার কাটতি নিউজ। অনেকদিন বিরতির পর। চ্যানেলগুলো কিছুক্ষন পর পর শীর্ষ নিউজ হিসাবে দিচ্ছে। ভাবটা এমন, দু একটা এমন নিউজ না হলে চলে ম্যান! রেটিং একশতে দুইশ। জোস! 
এ নিয়ে আপনাদের অনুভূতি শুনব। তার আগে চলুন একটা গল্প শুনে আসি-

আদিবার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে করতে করতে একটু দেরীই হয়ে গেছে। ত্রিশের পরে মা হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এটা ও শুনেছে। তাই বিয়ের পরপর আর দেরি করতে চায় নি। আদিবার বরও ওর আকুতি দেখে মায়ায় আচ্ছন্ন হয়। ভাবে একটা বেবি হলে মন্দ হয়না। সো বিয়ের পর থেকেই একটা বেবি ডলের জন্য ওদের প্রতিক্ষা। জনম জনম ধরেই এই প্রতিক্ষায় থাকে প্রাণীকুল। টিকিয়ে রাখে সভ্যতা।

তিন তিনটা বছরের ক্লান্তিকর চেষ্টার পর সুবাতাস বয় ওদের অন্দর জুড়ে! কাঁপা কাঁপা হাতে অনাগত প্রাণ ভোমরার জন্য স্বর্গ রচনা করে বাবা মা। স্বপ্নরা বড় হয়। আকাশ ছুঁতে চায়। কিন্তু সে স্বপ্ন হুড়মুড় করে ভেংগে পরতে সময় লাগে না এক বিন্দু। আদিবার বাচ্চা এসেছে ঠিকই কিন্তু সে বাচ্চা জরায়ুতে নাই। টিউবেও নাই।

টিউবে বাচ্চা আসাকে বলি এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি।
ভয়াবহ কন্ডিশন! এটা নিয়ে রোগী কথনে লিখেছি আগে। টিউব ফেঁটে গেলে রোগী বাঁচাতে ইমার্জেন্সি অপারেশন করা লাগে। না হলে মৃত্যু অনিবার্য। 
যা বলছিলাম, আদিবার বাচ্চা তাহলে কোথায় গেলো! অনেক সার্চ করে, পরীক্ষা নিরীক্ষার পর পাওয়া গেলো পাঁজি বাচ্চা জরায়ুকে বাদ দিয়ে, টিউব পেরিয়ে অন্য বাড়িতে চলে গেছে। অর্থাৎ নাড়ি ভুড়ির পিছনে ওমেন্টাম নামক এক ঝুঁপড়ি আছে যার কাজ নাড়িভুড়িকে সুরক্ষা দেওয়া, সেখানে দোলনা বানিয়ে দোল খাচ্ছে।

খা বাপ যত ইচ্ছা। তা তুই বাঁচবি কিভাবে, খাবার কোথায় পাবি? 
বেচারা তখন পরে বিপদে। আসলেই তো। জরায়ুজ যে রক্ত তার জন্য বরাদ্দকৃত ছিল তাতো সেখানে নেই। ফলে একটা সময় খাবারের অভাবে মৃত্যু বরন করে ভ্রুন। পৃথিবীর রং রুপ দেখার আগেই।

আর লাখে কিংবা দশ লাখে একজন এমনি বেয়াড়া যে মায়ের নাড়িভুড়ির রক্ত মাংস ঝোঁকের মতো চুষে চুষে বেঁচে থাকে। একদম পরিপূর্ণ মানুষের বাচ্চা হয়ে। সে যেহেতু জরায়ুজ না, সে জন্য জন্মের সময় মায়ের জন্মপথ খুঁজে পায় না বের হওয়ার জন্য। কাজেই বের হতে অনেক চেষ্টা করে করে কিন্তু পারেনা। ফলে উথাল পাথাল ব্যাথা নিয়ে মা হাসপাতালে ভর্তি হয়। ততোক্ষণে মা অলরেডি অর্ধেক মৃত্যুপথে।

পুরো প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে একবারও ডাক্তার দেখায়নি, পরীক্ষা নিরীক্ষা তো বাদ। তার উপর লোকাল দাই দিয়ে দুদিনের চেষ্টা। দুএকটা পরীক্ষার কাগজ যদি থেকেও থাকে তাড়াহুড়োয় সেটাও নিয়ে আসার সময় পায়নি, না হয় ভুলে যায় আনতে। গাছ বাঁচলে ফল ধরবেই থিওরী মেনে সরাসরি ওটি রুমে ঢুকাতে হয়। সেকেন্ডের মূল্য এখানে বড় বেশি দামি। পেট খুলে দেখা গেলো জরায়ুতে বাচ্চা নেই! ডাক্তার দরদর করে ঘামতে থাকেন! কোথায় গেলো? আঁতিপাতি খুঁজে অবশেষে নিয়ে আসেন কাংক্ষিত ধনকে। কিন্তু তার আগেই সে পারি জমিয়েছে ওপাড়ে। আহারে মা তোমার চাঁদের কণা মনেই থেকে গেলো, বুকে এলো না । আহারে ডাক্তার! সোনার টুকরোটুকরোকে মায়ের বুকে তুলে দেয়ার অপার্থিব আনন্দ তুমি পেলে না। উল্টো পেলে অপবাদ।

এই পর্যন্ত পড়ে আপনাদের অনুভূতি এবং প্রশ্ন আমি আশা করছি। তার আগে একে একে আমি আপনাদর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।

* এই প্রেগন্যান্সি কে কি বলে?
হেটারোজেনাস প্রেগন্যান্সি অথবা এবডোমিনাল প্রেগন্যান্সি।

* শতকরা কয়জনের হয়? 
শতকরা না, লাখে একজন দুজনের হয়।

* কিভাবে ডায়াগনোসিস হয়?
বাচ্চাকাচ্চা পেটে আসার প্রথম তিন চার মাসের মধ্যে আল্ট্রা করলে। শেষের দিকে আল্ট্রাতে আলাদা করে জরায়ুর ভিতর না বাহির অতটা ভালো বুঝা যায় না। অথবা এমআরআই করলে। প্রেগন্যান্ট রোগীদের সাধারনত এমআরআই করা হয়না কারণ এই পরীক্ষায় নয় হাজার টাকার মতো লাগে। যেখানে রোগীরা নয়মাসে একবার ডাক্তার মুখো হতে পারেনা, সেখানে এই পরীক্ষা তো দূর কী বাত! তাই ম্যাক্সিমাম ই ধরা পড়ে সিজারের সময়।

* ফেট কি? 
প্রতি বিশজনের ঊনিশজন বাচ্চাই মারা যায় খাবারের অভাবে। একজন হয়তো ডেলিভারি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আর এই বাচ্চা বেঁচে থাকলেও অনেক সমস্যা হয় পরবর্তিতে। আর মায়ের যে কী সমস্যা হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু এইটুকু বলি, মায়ের জীবন বাঁচাতে গর্ভফুলটা ভেতরেই রেখে আসতে হয় কখনো কখনো।

গল্পটাতো পড়লেন। এই জ্ঞান মাথায় নিয়ে এখন আসি লেখার প্রথম অংশে। দেখি সেদিন আসলে কী ঘটেছিলো-

নিউজে উল্লেখিত রোগীর সিজার অপারেশন হয়। ফুলানো বেলুন ফেঁটে গেলে যেমন আকার ধারন করে, তেমনিভাবে সিজারিয়ান বাচ্চা বের করার সাথে সাথে জরায়ুটা তেমনতর হয়। যার ভিতরে বাচ্চা তো দুরে থাক আর কিছুই থাকা সম্ভব হয় না। ফাঁটা বেলুনের মতো জরায়ুর কাটা জায়গা পরম মমতায় ধরে ধরে সেলাই করে দিয়ে আসা হয়। কাজেই বাচ্চা জরায়ুতে রেখে সেলাই করে দেয়া হয়েছে কথাটা বিজ্ঞান সম্মত না।

* তাহলে আরেকটা বাচ্চার কথা আসল কেন? 
আসলে প্রকৃতির কী অপার লীলা!!

এই মহিলার একই সাথে একটি বাচ্চা জরায়ুতে এবং একটি বাচ্চা জরায়ুর বাইরে এসেছে! এটার ইন্সিডেন্স সারাবিশ্বে হয়তো কোটিতে একটা হবে। যাহোক ডাক্তার জরায়ুতে একটা বাচ্চা পেয়েছে, একটা ডেলিভারি করেছে। আরেকটা মায়ের নাড়িভুঁড়ি পেঁচিয়ে টিউমারের আকার ধারন করেছে, যা ওই ডাক্তারের দ্বারা অপসারন করা সম্ভব হয়নি। ইনফ্যাক্ট সিজারের সাথে আমরা অন্য কোন টিউমার অপারেশন করতে চাইওনা। এতে রক্তক্ষরনে মায়ের জীবন সংকটাপন্ন হওয়ার চান্স থাকে।

অপারেশনের পর উপরোক্ত রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়েছিলো। রোগী যায়নি। এখানে আমি বলব পর্যাপ্ত কাউন্সিলিং হয়নি কিংবা রোগীপক্ষ ভয়াবহতা বুঝতে সক্ষম হয়নি।

কাউন্সিলিং এর দায় আমি নিয়েই একটা প্রশ্ন আমি করতে চাই। মিডিয়ার কী একটিবার উচিৎ ছিলো না, প্রকৃত ঘটনা কী সেটা জেনে নিউজ করা? টেকনিক্যাল বিষয়গুলো অন্তত এক্সপার্টস দিয়ে তো যাচাই করাই যায়। নাকি গরম খবরই শেষ কথা? আমরা ভেবে দেখছি কি? এতে কার কতো ক্ষতি আর কার কতটুকু লাভ?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর