ডা. সাখাওয়াত হোসেন বাবু

ডা. সাখাওয়াত হোসেন বাবু

কার্ডিওলজিস্ট, বারডেম। 

এমবিবিএস (২০তম ব্যাচ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


২২ অক্টোবর, ২০১৭ ১২:১৬ পিএম

কি বিচিত্র আমরা

কি বিচিত্র আমরা

ঘটনা ১:
তিন মাস আগে আমেরিকা ফেরত রোগী বুক ব্যাথা নিয়ে আজ চেম্বার এ আসলে আমি তাকে একটা ECG করতে বলি। উত্তরে তিনি জানান" কিছুদিন আগে আমেরিকায় ECG করেছি, ECG করা লাগবে না। ডাক্তার সাহেব treatment দিয়ে দেন"। বুঝিয়ে বলার পরেও যখন রাজি হচ্ছিলো না তখন ভদ্রমহিলাকে বললাম "আপনি নিশ্চয়ই আমেরিকার ডাক্তারদের চেয়ে আমাদের উপর অনেক বেশী ভরসা করেন, নইলে অইখানে চেকআপ এর নামে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরীক্ষা করে পরে ঔষধ খান, আর এখানে বুক ব্যাথায়ও কোনো পরীক্ষা ছাড়া ঔষধ খেতে চান। কি অদ্ভুত মানসিকতা আমাদের!

ঘটনা ২:
এক Diabetic, postmenopausal women কিছুদিন পর পর এক গাদা সমস্যা নিয়ে চেম্বার আসেন। প্রতিবারই তার সমস্যাগুলোর যথাসম্ভব সমাধান দেয়া হয়। কিছু কিছু সমস্যার জন্য respective doctor কে রেফার করলে উনি যেতে ব্যাপক আপত্তি করে। বিভিন্ন অজুহাতে আবার কোনো investigation ও করতে চায় না। সেদিন এমনিভাবে প্রায় চারমাস পর উনি একবস্তা কাগজ নিয়ে এসে হাজির। বাইরে আমার রোগীর প্রচন্ড ভীড়। উনি গম্ভীর মুখে বললেন "ডাক্তার সাহেব, এগুলা দেখেন। আমার চক্ষু তো চরক গাছ। এরিই মাঝে সে India তে গিয়ে প্রায় ৭০,০০০/- টাকার investigations করাইছে। MRI of Brain & whole spine, ETT, ECHO, BMD, All cancer markers, সহ যাবতীয় test. 90/% reports নরমাল ছিলো। শুধু Proctoscopy বাদ রাখছে। অইটা করলে বরং আমি খুশী হইতাম। কারণ মহিলার Piles আছে। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, কতটাকা খরচ হয়েছে। উনি বললেন, থাকা খাওয়াসহ প্রায় দুই লাখ টাকা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনার সমস্যার সমাধান হইছে ? বললেন, কই কিছুই তো হলো না। শুধু শুধুই গেলাম। আমি বললাম, "গত ছয় মাসে ব্লাড সুগার ছাড়া আর কোনো test করেছেন কিনা আমার জানা নাই। আপ্নারা এখানে দুইশত টাকা খরচ করতে দশবার চিন্তা করেন আর পাশের দেশে দুই লাখ টাকা খরচ করতে দিধা করেন না। আপনাদের আসলেই দেশপ্রেম এর খুবই অভাব।

ঘটনা ৩:
আমার চেম্বার এটেন্ডেন্ট এসে বললো "স্যার একটা স্বাসকষ্টের রোগী এসেছে, সিরিয়াল দেয় নাই। একটু আগে দেখে দিবেন। আমি বললাম "নিয়ে এসো"। দেখলাম pt.এর acute on chronic LVF. আমি একটা urgent ECG ও chest Xray করে ভালো করে বুঝিয়ে urgent hospitalization লিখে পাঠিয়ে দিলাম। ওমা দুইদিন পর উনার ছেলেরা এসে জানালেন, উনি বাসায় মারা গেছেন। হাসপাতালে সেদিন উনাকে ভর্তি করা হয়নি, কারণ উনি কিছুদিনের মধ্যে নাকি ইন্ডিয়া যাবেন। সেখানেই পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে উনি চিকিৎসা করবেন। সেদিন এর এতো শ্রম আমার সবিই বৃথা গেলো।

ঘটনা ৪: 
চেম্বারে রোগীর প্রচন্ড ভীড়। আমি একের পর এক রোগী দেখে যাচ্ছি। শেষের দিকের বেশ কয়েকজন স্বচ্ছল রোগীর লোক আমাকে ভিজিট কম দিতে চাইলো। আমি আপত্তি করাতে বলে "আজকে তো অনেক রোগী, আজকে একটু কম দিলাম।" আমি শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলাম "কেনো, আজকে আমি কি আপনাকে সময় কম দিয়েছি?"

ঘটনা ৫:

রোগীরাই যেন রোগী দের সম্মান দেখাতে চায় না। নিয়ম ভাঙাই যেন নেশা। যেমন কোনো রোগী যদি VIP হয়, কিংবা ডাক্তারের কোনো পরিচিতকেও হয় তখন সেই রোগী সব নিয়ম ভেঙে ক্ষমতা বলে সবার আগে দেখাতে চায়। আগে দেখে দেয়ার জন্য বাইরে থেকে বার বার ফোন দিতে থাকে। অথচ উনার আগে হয়তো অনেক বয়স্ক অসুস্থ মুরুব্বী বসে আছেন, দেখানোর জন্য। একটু মায়াও হয়না ওই সব ক্ষমতাবান রোগীদের। কিন্তু উনারাই আবার সিনেমা হলে, buffet খাবারে, ব্যাং এ, Airport কিংবা Bus terminal কতইনা শুশৃংখলভাবে অপেক্ষা করেন। আর যত ব্যস্ততা সব শুরু হয় ডক্তারের চেম্বার এ এসে। মাঝে মাঝে নিজেরা খুবিই বিব্রত বোধ করি।

আরো অজস্র ঘটনা আছে, বলে শেষ করা যাবেনা। আমাদের দেশপ্রেম এখনো অনেক কম। আর ডক্তারদের অসম্মান করা কিংবা তাদের উপদেশমত না চলাটা যেন অনেকের মজ্জাগত সমস্যা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত