ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-২১: মাস্টার্সের থিসিস হলো মূল চাবি

আমেরিকায় পাবলিক হেলথে পিএইচডি অ্যাপ্লিকেশানের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো একটি মাস্টার্স ডিগ্রি। এই ঝামেলাটা কেন করলো তারা? এত কষ্ট করে ডাক্তারি পাশ করলাম - এতেও হবে না? আবার এখন ভার্সিটিতে গিয়ে মাস্টার্স করতে হবে? এ আবার কেমন কথা!

হুম, যুক্তি খারাপ না। সঠিকভাবে দেখলে এই মাস্টার্স থাকার দাবিটা মোটেও উপেক্ষা করার মত নয়।

পৃথিবীর অনেক দেশের মত আমাদের দেশেও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বিডিএস/এমবিবিএস কারিকুলামে কোন রিসার্চ কম্পোনেন্ট নেই। কিন্তু পিএইচডি করতে চাইলে রিসার্চ রিলেটেড কিছু বেসিক আইডিয়া বা দক্ষতা অবশ্যই থাকা চাই।

আমি নিজেও জানতাম না এবং পরবর্তীতে দেখেছি যে অনেকেই জানেন না যে, মাস্টার্স প্রোগ্রামে একটি রিসার্চ এলিমেন্ট থাকে। এই রিসার্চের অংশ হিসেবে আপনাকে প্রথমে কিছু বেসিক কোর্স করতে হবে। যেমন - রিসার্চ মেথোডোলজি, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স ইত্যাদি।

তারপর যে টপিকের উপর থিসিস করতে চান তার উপর একটি রিসার্চ প্রপোজাল দাঁড় করাতে হবে। এই প্রপোজালটি সব ফ্যাকাল্টির সামনে ডিফেন্ড করে পাশ করাতে হবে।

তারপর মূল রিসার্চটি করতে হবে। সেখান থেকে যে রেজাল্ট পেলেন সেটি নিয়ে ফাইনাল ডিজার্টেশান তৈরি করে সেটিও ডিফেন্স করতে হবে। এতটুকু পর্যন্ত পাশ করলে তবেই আপনি ডিগ্রি পাবেন। অর্থাৎ, মাস্টার্স ডিগ্রি মানে কেবলই কিছু কোর্স করা নয়। এর সাথে রিসার্চ নামক বস্তুটির কিছু গন্ধও আছে।

এখানেই মূল টুইস্ট। মাস্টার্সে যে টপিকে আপনি থিসিস করবেন – ধরে নেয়া যায় যে তার উপর আপনার খুব ভালো না হলেও মোটামুটি দখল তৈরি হয়েছে বা নিদেনপক্ষে দখল তৈরি হচ্ছে। আরও ধরে নেয়া যায় যে যেহেতু আপনি মাস্টার্সে এই টপিকটি নিয়ে কাজ করেছেন, তাই ভবিষ্যতেও এটি বা এ রিলেটেড কিছু নিয়ে কাজ করতে আপনি আগ্রহী হবেন।

পিএইচডি অ্যাপ্লিকেশানের সময় এ পয়েন্টটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আপনি যে ডিপার্টমেন্টে অ্যাপ্লাই করেছেন, সেখানকার ফ্যাকাল্টিদের রিসার্চ ইন্টারেস্ট কী, তা ওয়েবসাইটে দেখে নিবেন।

আপনার অ্যাপ্লিকেশান নিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় তাঁরা আপনার এই থিসিসের টপিকের সাথে তাঁদের ফ্যাকাল্টির রিসার্চ ইন্টারেস্টকে মেলানোর চেষ্টা করবেন। কোন ফ্যাকাল্টির রিলেটেড প্রজেক্টে ফান্ডিং আছে কি না তা যাচাই করবেন।

আমার মতে মাস্টার্সের এই থিসিসটি তখন হয়ে দাঁড়াবে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। আপনি যদি বুঝে শুনে ভালোভাবে থিসিসটি করে থাকেন তবে স্কাইপ ইন্টারভিউ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে আপনার কথার মাধ্যমেই ঐ টপিকের উপর দখলের প্রমাণ অটোমেটিক চলে আসবে।

আর যদি কোনরকমে ডিগ্রি কমপ্লিট করার জন্য খুব সহজ কোন টপিক নিয়ে থিসিস করেন এবং বেশিরভাগ সময় অন্যের উপর দিয়ে কাজ চালিয়ে নেন, তবে আপনার আচরণেই সেটির ছাপ থাকবে। আপনার অ্যাপ্লিকেশানের রেজাল্ট কেমন হবে তাও আপনি আন্দাজ করে নিতে পারেন।

তার মানে এই নয় যে আপনাকে যুগান্তকারী কোন টপিকে কাজ করতে হবে। মৌলিক কিছু একটা আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিতে হবে। সেটি করতে পারলে তো অবশ্যই ভালো। এর ফল আপনি পাবেন আইভি লীগের কোন ইউনিতে পড়তে গিয়ে।

বাট ব্যাক টু আমাদের মতো আমজনতা। মাস্টার্সের থিসিসের টপিক ঠিক করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন টপিকটি খুব গতানুগতিক না হয় এবং ঐ টপিকের উপর বাইরে ফান্ড আছে কিনা তাও বুঝে নিয়ে কাজ করতে হবে।

যেমন - বর্তমানে এইডস, টিবি ইত্যাদি ইনফেকশাস ডিজিজের উপর প্রচুর ফান্ড আছে বাইরে। এছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ, হেলথ ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি বিষয়ের উপরও অনেক কাজ হচ্ছে। আপনার থিসিসি যদি ‘বাজারে চলছে’ এরকম কোন একটা টপিকে হয় তাহলে আপনার পিএইচডিতে চান্স পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তাই কষ্ট করে হলেও, সময় বেশি লাগলেও মাস্টার্সের থিসিসটি ভালোভাবে শেষ করুন।

আমাদের দেশের কারিকুলামে রিসার্চ না থাকায় অনেক বেসিক বিষয় আমরা জানিনা। এখানে পিএইচডি করতে এসে প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে এটা ফেস করতে হচ্ছে। সামান্য কিছু টার্মিনোলজি, কিছু রিসার্চ টুলস ছাত্রজীবন থেকে আমাদের হাতে থাকলে বিষয়গুলো এত কঠিন হতো না। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে সহজ বিষয়গুলোকেই কঠিন করে দিয়েছে এটি মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে।

রিসার্চের সাথে স্ট্যাটিস্টক্স ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যারা অংক পছন্দ করি না বলে মেডিকেলে পড়েছি তাঁদের জন্য এটা আবার নতুন ধরনের পেইন। তবে সাহস করে আপনাদেরকে ভরসা দিতে পারি - বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স বিষয়টি একবার বুঝে নিতে পারলে খুব চমৎকার। একেবারে খাপে খাপ মিলে যায়।

কোন একটা রোগের ঘটনা কীভাবে ঘটছে, কী কী কারণ এর পেছনে দায়ী এ প্রসেসটাকে সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিদেশিরা খুব খুশী হয়। আমার কাছে এটার নামই বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স।

এখানে পিএইচডি লেভেলের স্টুডেন্টরাও লুকায় লুকায় ‘পি ভ্যালু কী’ টাইপের বেসিক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ঘুরে। কান পাতলে ডিপার্টমেন্টের করিডোরে এ ধরনের ফিসফাস অহরহই শোনা যায়। কোন অধমের মাথায় এগুলা ঘুরে আর কে ফিসফাস করে তা আশা করি পাঠকমাত্রই বুঝিয়া লইয়াছেন।

যাই হোক, সব কথার শেষ কথা – একটা মাস্টার্স প্রোগ্রামে এনরোল করুন দ্রুত। এসব ছাইপাশ লেখা পড়ে নষ্ট করার মতো সময় আপনার হাতে নেই। যান, তাড়াতাড়ি গিয়ে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করুন, স্যাম্পল সাইজ হিসেব করুন, ডাটা কালেকশান করুন, ডাটা অ্যানালাইসিস………

 

ডিসক্লেইমার

 

পূর্ববর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি-২০: CV

পরবর্তী পর্ব : পর্ব-২২: অভিজ্ঞতা: রিসার্চ করেছেন কখনো?

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস