ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-১৯: WES ভেরিফিকেশন

অ্যাপ্লিকেশান প্রসেসে WES Verificationটি ডাক্তারদের জন্য অতিরিক্ত স্টেপ এবং এটি করতেই হবে। তাই এড়িয়ে যাবার সুযোগ খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন না।

WES Verification বিষয়টি কী একটু বোঝার চেষ্টা করি। মেডিকেলে আমাদের রেজাল্ট দেয়া হয় মার্কসে তাই না? আমেরিকানরা এই মার্কসের রেজাল্টটিকে গ্রেডে বুঝতে চায়। অর্থাৎ মার্কসের রেজাল্টটিকে গ্রেডে কনভার্ট করা প্রয়োজন।
 
এখন এই কনভার্ট করার কাজটি কারা করে থাকে? আপনি যে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন তারা কি এটা করতে পারে? উত্তরটি হলো – না। অর্থাৎ আপনার ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ – ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় এই গ্রেডে কনভার্শনের কাজটি করতে পারে না এবং করবে না। করলেও তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে কোন লাভ নেই।
 
মার্কসের রেজাল্টকে গ্রেডে কনভার্ট করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ২টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে। একটি হলো World Education Services (WES), অন্যটি Educational Credentials Evaluators (ECE). আমেরিকায় পাবলিক হেলথে এপ্লাই করতে চাইলে আপনাকে WES Verification করতে হবে, অন্য কোন কনভার্শন কাজে আসবে না। তাই WES এর ওয়েবসাইটটি ভালোভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করে তারপর ডকুমেন্ট প্রস্তুতির কাজে নেমে পড়ুন।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য এই প্রসেসের ধাপগুলো নীচে বর্ণনা করার চেষ্টা করছি -
 
১। ফাইনাল প্রফের রেজাল্ট হবার পর মার্কশিট পাবার পর কাজ শুরু করুন।
 
২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বিল্ডিঙে ৩ তলায় ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় যান। গিয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের তালিকা দেখে আসুন।
 
৩। ফার্স্ট প্রফ থেকে শুরু করে ফাইনাল প্রফ পর্যন্ত সকল প্রফের সকল মার্কশিট নিন, ফটোকপি করুন।
 
৪। প্রভিশনাল সার্টিফিকেট তোলার ব্যবস্থা করুন। সম্ভব হলে ফাইনাল সার্টিফিকেট তুলে নিন। এজন্য কনভোকেশান এটেন্ড করার একটি বাধ্যবাধকতা আছে।
 
৫। আপনার ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট কত তারিখে দিয়েছে তার সার্টিফিকেট তোলার একটা ফর্ম আছে। পূরণ করে ফি দিয়ে জমা দিন – ১ সপ্তাহ পর তুলে নিন।
 
৬। ট্রান্সক্রিপ্ট শাখা থেকে ফর্ম তুলে, টাকা জমা দিয়ে, সব ডকুমেন্টের ফটোকপিসহ ট্রান্সক্রিপ্টের অ্যাপ্লিকেশান জমা দিন। নির্দিষ্ট ডেটে গিয়ে সব ডকুমেন্ট তুলে ফেলুন।
 
৭। ট্রান্সক্রিপ্ট এবং সার্টিফিকেটের কপি সত্যায়িত করার জন্য পুনরায় ফর্ম নিতে হবে, ফি জমা দিতে হবে। অরিজিনাল কপি হাতে পাবার পর আপনার প্রয়োজনমতো যে কয় সেট সত্যায়িত করতে চান , সে সংখ্যক ফটোকপি করে ফর্ম পূরন করবেন। প্রতি পেজের জন্য ফি দিতে হবে। তাই সবকিছু রেডি হলে ট্রান্সক্রিপ্ট শাখা থেকে টাকার এমাউন্টসহ সিগনেচার নিয়ে পুনরায় টিএসসিতে জনতা ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে আবার ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় এসে জমা দেবেন। টাকা জমা দেবার রসিদটি রেখে দেবেন, তাতে লিখা ডেটে গিয়ে সত্যায়িত কপির সেটগুলো তুলে আনবেন। খেয়াল রাখবেন যেন প্রতি পৃষ্ঠায় সীল, সিগনেচার এবং ডেট থাকে।
 
৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীল এবং রেজিস্টারের সিগনেচারসহ খাম – প্রতিটির মূল্য প্রায় ৪০০ টাকা (বা বেশি) – আপনার প্রয়োজনমতো কিনতে হবে। এজন্যও ফর্ম পূরণ করে টাকার অ্যামাউন্ট লিখে নিয়ে গিয়ে টিএসসি জনতা ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হবে। বুদ্ধিমানের মত ট্রান্সক্রিপ্ট সত্যায়িত করার সময় একসাথে খামের অর্ডার করে ফেলবেন – বারবার ঘুরতে হবে না। খামের পেছনের ফ্ল্যাপের উপর রেজিস্টারের সীল, সিগনেচার থাকবে।
 
৯। ইতিমধ্যে WES এর ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রোফাইল খুলে ফর্ম পূরণ করতে থাকুন। পূরণ করতে সময় লাগবে, অনেক ইনফরমেশন আপনার কাছে থাকবে না, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
 
১০। ফর্ম পূরণ হলে ফি জমা দিতে হবে। নিজের বা পরিচিত কারো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট করার ক্রেডিট কার্ড থাকলে সেটি ব্যবহার করে ফি জমা দিন।
 
১১। ফি জমা দেবার পর আপনাকে একটি রেফারেন্স নাম্বার দিবে।
 
১২। WES এর ওয়েবসাইটে একটি ফর্ম আছে রেফারেন্স নাম্বারসহ সে ফর্মটি পূরণ করে ফেলুন। ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট, ডিগ্রি পাবার তারিখের সার্টিফিকেটের সত্যায়িত ফটোকপি সহ ফর্মটি নিয়ে পুনরায় রেজিস্টার বিল্ডিঙের ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় যান।
 
১৩। ওখানে WES ভেরিফিকেশান করতে এসেছেন বললে উনারা আপনার ফর্মের একটি অংশ পূরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারের সীল-সিগনেচার সহ ফেরত দেবেন। এজন্য কিছু সময় লাগবে – ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবেন। এ ধাপে কোন ফি লাগবে না।
 
১৪। সাইন করা ফর্মটি হাতে পেলে ফর্মটি সহ আপনার সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্টের ফটোকপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খামটিতে ভরে ভালো করে আঠা লাগিয়ে ফেলুন। এবার খামের উপর WES এর ওয়েবসাইটে দেয়া ঠিকানা লিখুন।
 
১৫। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে খামটি WES এর কাছে পাঠিয়ে দিন।
 
১৬। মোটামুটি ১ সপ্তাহ পর আপনার প্রোফাইলে দেখবেন একটি নতুন মেসেজ এসেছে। তাতে লিখা থাকবে যে আপনার পাঠানো ডকুমেন্ট তারা পেয়েছে। কিন্তু তা সঠিক কিনা তা ভেরিফাই করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তারা ইমেল পাঠিয়েছে। এখন আপনার দায়িত্ব হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে তাদেরকে এই ইমেইলের উত্তর দিতে বলা।
 
১৭। এই ইমেইল পাবার পর ইমেইলের প্রিন্ট নিয়ে পুনরায় রেজিস্টার বিল্ডিঙের ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় যান। ওরা আপনাকে পাশেই আরেকটি রুমে পাঠাবে। ওখানে গিয়ে ইমেইলটি দেখালে উনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেইল চেক করে আপনার রেফারেন্স নাম্বারের ইমেইলটি বের করে প্রিন্ট করে আনবেন। এই ইমেইলের উপর একটি সীল মেরে তাতে প্রয়োজনীয় টাকার এমাউন্ট লিখে দেবেন।
 
১৮। রেজিস্টার বিল্ডিঙের নীচ তলায় সোনালী ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে রসিদ নিয়ে আবার ঐ ভদ্রলোকের কাছে যাবেন। উনি আপনাকে একটা ডেট বলে দেবেন। ঐ ডেটের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপনার ডকুমেন্ট ভেরিফাই হবার প্রসেস শেষ হলে উনারা WES কে পজেটিভ রেসপন্স দিয়ে ইমেইল করবেন।
 
১৯। এ সময় প্রতিদিন আপনার WES Account চেক করতে থাকুন। সাধারনত ১ সপ্তাহ পর অ্যাকাউন্টে আবার পরিবর্তন দেখতে পাবেন। তখন লিখা থাকবে যে আপনার রেজাল্টকে গ্রেডে কনভার্শনের কাজ চলছে।
 
২০। কয়েকদিন পর একাউন্টে দেখতে পাবেন যে আপনার ভেরিফিকেশান শেষ হয়েছে। এক কপি হার্ডকপি আপনার ঠিকানায় কুরিয়ার করেছে WES. আপনার অ্যাকাউন্ট থেকেও আপনি কনভার্ট করা রেজাল্ট দেখতে পাবেন।
 
২১। আমার জানামতে – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা – সরকারি ডেন্টাল এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা – কনভার্শনের পর 4.00/4.00 পেয়ে থাকে। মেডিকেল জীবনে যত খুশি সাপ্লি খেলেও প্রবলেম নেই। ফেল্টুশ স্টুডেন্ট হিসেবে এই রেজাল্ট হাতে পেয়ে আমি যুগপৎ বিব্রত এবং পুলকিত হয়েছিলাম।
 
২২। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন রাজশাহী, চট্টগ্রাম, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট এবং বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের স্টুডেন্টদের গ্রেড কেমন হয় এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পেয়েছি – তাই এ বিষয়ে ক্লিয়ার কিছু জানি না।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বিল্ডিঙের ৩ তলায় ট্রান্সক্রিপ্ট শাখা অবস্থিত। এই শাখায় যেভাবে এফিশিয়েন্টলি কাজ হয় তা অন্য কোথাও হয় বলে জানা নেই। তাই এ শাখার অফিসার এবং স্টাফদের সাথে অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা বলবেন।
 
সেখানে গেলে অন্তত ২০-৩০ জন মানুষকে দেখতে পাবেন যারা আপনার মত একই কাজে এসেছে। এতো কাগজপত্র সামলানো, বারবার গিয়ে ব্যাংকে টাকা দিয়ে আসা - পুরো প্রসেসটি অত্যন্ত ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর। মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন – এক কথায় স্বীকার করি। কিন্তু একটিই মন্ত্র ধৈর্য।
 
কাজটি আপনার, আপনাকেই সেখান থেকে কাজটি উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হবে। তাই পুরো প্রসেসটি ভালোভাবে বুঝে আস্তে আস্তে কাজ করুন। সকাল সকাল চলে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনীয় টাকার অ্যামাউন্ট হিসেব করে সাথে নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পুরো দিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এমন প্রিপারেশান নিয়ে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। ঠান্ডা মাথায় হিসেব করে স্টাফদের সাথে কথা বলাটা বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহর কাছে ধৈর্য ধরার শক্তি চেয়ে সাহায্য চাওয়া, কাজগুলো সহজভাবে হয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ।
 
আল্লাহ আপনার সহায় হউন।
 
 
 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর