ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-১৭: রেফারেন্স লেটার

সাধারণত এপ্লিকেশানের জন্য আপনাকে ৩টি রেফারেন্স লেটার সাবমিট করতে হবে ভালোভাবে বললে কথাটা হবে ‘সাবমিট করাতে হবে’। একটু বুঝিয়ে বলছি।

আপনি যেখানে এপ্লাই করছেন তারা তো আপনাকে চেনে না। আপনার সাবমিট করা কাগজপত্র দেখে তারা আপনার সম্পর্কে একটা বেসিক ধারনা পায় – আপনি অসাম ব্রিলিয়ান্ট, আপনি প্রচুর প্রচুর রিসার্চ করেছেন (ভাগ্যিস নোবেল কমিটি আপনার সন্ধান পায়নি – তাহলে মানব জাতির ভাগ্যে বিরাট ক্রাইসিস লেগে যেতো!), আপনার মত অভিজ্ঞ রিসার্চার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ২-১ জন থাকতে পারে - তবে না থাকার সম্ভাবনাই বেশী, আপনি পাবলিক হেলথকে ভালোবাসেন টাইটানিকের মত – আপনি ঐ ভারী ভালোবাসা নিয়ে ডুবে যাবেন কিন্তু পাবলিক হেলথ বেঁচে রইবে ঐ পাটাতনের উপরে – ইত্যাদি ইত্যাদি চাপাবাজির এপ্লিকেশান শেষ করেছেন। কিন্তু শেষ হইয়াও হইতেছে না শেষ।

এবারে উহারা জানতে চাইবেন আপনার প্রফেসর আপনার সম্পর্কে কি ভাবছেন তাহা। এই সেরেছে!

এই প্রফেসর মহীরুহকে তো সারাজীবন এভয়েড করেছি, করিডোরের মাথায় দেখলে দৌড়ে বিল্ডিং ছেড়ে পালিয়ে বাসায় এসে ঘুম দিয়েছি, কোন ঈদে কখনো শুভেচ্ছা জানিয়ে এসএমএস করিনি, তার জন্মদিন কবে জানি না, ভাইভার আগে কখনও দেখা করিনি, ভাইভা বোর্ডে প্রথমবারের মত পরস্পর পরস্পরকে সামনাসামনি দেখে উনার মত আমিও কম বিস্মিত হইনি! এই রাশভারী লোকের কাছ থেকে রেফারেন্স লেটার নিতে হবে! এবার হয়েছে কাজ।

এপ্লিকেশানের জন্য যে ৩টি রেফারেন্স লেটার লাগবে তার মধ্যে ২টি হতে হবে একাডেমিক ফ্যাকাল্টির কাছ থেকে, ১টি হতে হবে চাকুরীস্থল হতে। প্রোগ্রাম ভেদে এই রিকয়ারমেন্ট ভেরী করবে, তাই প্রতি ডিপার্টমেন্টে এপ্লাই করার আগে ব্যাপারগুলো ভালোভাবে জেনে নেবেন।

আইডিয়াল প্রসেসটি হলো - প্রফেসর নিজে আপনার জন্য রেফারেন্স লেটার লিখবেন, লিখে সেটি প্রিন্ট করবেন, তাতে সই করবেন, সেটি স্ক্যান করবেন, পিডিএফ ফাইলটি ইমেইলে এটাচ করবেন, আপনি যে ইমেইলে রেফারেন্স রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছেন সে লিংকে গিয়ে আপনাকে এসেস বা মূল্যায়ন করবেন ইত্যাদি। এবং এই কাজটি তিনি করবেন তাঁর অফিসিয়াল ইমেইল আইডি থেকে। অর্থাৎ, @ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা @নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় টাইপের ইমেইল আইডি থেকে দেবেন, @জিমেইল/ইয়াহু আইডি থেকে নয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারন অধিকাংশ স্কুলেই প্রাতিষ্ঠানিক/প্রফেশনাল ইমেইল আইডি ছাড়া রেফারেন্স এক্সেপ্ট করবে না।

এখন মূল টুইস্ট হলো – অনেক বাংলাদেশী প্রফেসর, বিশেষ করে মেডিকেল সেক্টরের প্রফেসরদের প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল আইডি থাকেনা। থাকলেও অনেকে সেটি ব্যবহার করেন না, এমন কী পাসওয়ার্ডটাও ভুলে বসে আছেন– ইত্যাদি নানান কাহিনী। তবে আশার কথা হলো পাবলিক হেলথের প্রফেসরেরা এসব ব্যাপারে অনেক প্রফেশনাল – তাই আশা করা যায় আপনি যেখানে এমপিএইচ করেছেন – সে ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদের অবশ্যই এ ধরনের প্রফেশনালিজম থাকবে। তাই এখান থেকেই আপনার রেফারেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় একজন ফ্যাকাল্টি বাছাই করুন। এমন ফ্যাকাল্টি বাছাই করবেন – যিনি স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি। আমাদের দেশের বাস্তবতা – সবাই স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি নন। অনেক বড় বড় প্রফেসর মহীরুহ আছেন – যাদের কাছে রেফারেন্স চাইলে হয়তো দেবেন – কিন্তু দেবার আগে আপনার জীবন ঝাঁজরা করে ফেলবেন –আজ কাল এখন তখন ঘুরাতে ঘুরাতে আপনাকে ডিমেনশিয়ার রোগী বানিয়ে ফেলবেন। এমন কী যে রেফারেন্সটি তাঁর নিজের লিখার কথা – সেটি আপনাকে লিখে দিতে বলবেন। কি অদ্ভুত তাই না? নিজের সম্পর্কে নিজেই রেফারেন্স লিখবেন! আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি – এর চেয়ে ভয়াবহ ভুল আর হতে পারে না।

রেফারেন্সটিতে সাইন দেবার পর তিনি এমন একটা এটিচিউড শো করবেন যে আপনার এত বড় উপকার করেছেন, তাঁর ওভারভ্যালুড সময় থেকে আপনার মত চুনোপুঁটির জন্য পাঁচ মিনিট সময় ব্যয় করায় মানবজাতির অশেষ ক্ষতি সাধন হয়ে গেছে – তাই সারা জীবন যেন আপনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন, থাকতে বাধ্য হন – এমন নানান ধাপ উপধাপ অতিক্রম করে তারপর বহু আরাধ্য সেই রেফারেন্স লেটার তিনি ইমেইলে দেবেন। এ রকম অভিজ্ঞতা এ অধমের হয়েছে বলেই লম্বা বয়ান করলাম।

আবার এমন প্রফেসর পেয়েছি – যাকে রিকুয়েস্ট ইমেইল পাঠানোর সাথে সাথে রেসপন্স করেছেন, কষ্ট করে পুরো প্রসেসটি সম্পন্ন করেছেন, ডেডলাইনের অনেক আগেই রেফারেন্স সাবমিট করেছেন; সাবমিট করার পর ব্যক্তিগতভাবে ইমেইল করে কনফার্ম করেছেন; শুভকামনা জানিয়েছেন; একটি বারের জন্যও কমপ্লেন করেননি; বরং অধমের মত হাবাগোবা ছাত্রের জন্য এগিয়ে এসে অনেক অনেক করেছেন। এমন মানুষকে শ্রদ্ধা করবো না তো কাকে শ্রদ্ধা করবো! আল্লাহ এই মানুষদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেনই দেবেন ইনশাল্লাহ।

যাই হোক, এই রেফারেন্সগুলো সাবমিট করার একটি ডেডলাইন থাকে। আপনার কাজ হলো টাইমের অনেক আগে থেকেই প্রফেসরকে নক করা, তাঁদের কাছ থেকে রেফারেন্স লেটার উদ্ধার করা, সেটি পৌছেছে কিনা তা নিশ্চিত করা। এজন্য তাঁদেরকে বিরক্ত না করেও কাজ উদ্ধার করার মত জটিল দক্ষতাটি আপনাকে অর্জন করতে হবে। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এই পুরো প্রসেসটি সম্পন্ন করার পর আপনি একটি হ্যাটস অফ হাততালি পেতেই পারেন। তাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, নিজের বাম হাতটি নিয়ে ডান কাধের উপর রাখুন, এবার নিজেই নিজের পিঠে চাপড় মারুন। আর নিঃশব্দে চিৎকার করে বলুন – ‘সাবাশ ব্যাটা বাঘের বাচ্চা! সাব্বাশ!’

 

ডিসক্লেইমার

পূর্ববর্তী পর্ব: রোড টু পিএইচডি-১৬: SOPHAS এর মাধ্যমে অ্যাপ্লাই

পরবর্তী পর্ব: রোড টু পিএইচডি-১৮: SOP (Statement of Purpose)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর